ঘুরে এলাম পাশের দেশ

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৪
অনেকদিনের একটা শখ পূরণ হতে যাচ্ছে আর কয়কে ঘণ্টা পরই। ইন্ডিয়ান্ডা ট্যুরে যাচ্ছি আমরা। ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।সিটি ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সময়ই জেনেছিলাম কলেজ থেকে দেশের বাইরে ট্যুরে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও বেশ কয়য়েকবার ডেন্টাল ক্যাম্পিঙে দেশের ভেতরেই নানা জায়গায় গিয়েছি, তবুও ফার্স্ট ইয়ার থেকে অপেক্ষাটা ছিল দেশের বাইরে এই ট্যুরটার জন্যই। সেই কবে থেকে কত প্ল্যান, কত উত্তেজনা এই ট্যুরকে নিয়ে! সিডি- ১৪ এর আমরা ২৫ জন শুধু একটা একটা করে দিন গুণেছি। এখনো গুণছি, তবে দিন নয়...ঘণ্টা। কখন যে রাত হবে! দিল্লী : ২২ সেপ্টেম্বর রাতে আমরা ট্রেনে উঠলাম ভারতের রাজধানী দিল্লী যেতে। দিল্লী বেশ দামি শহর। রাজধানী বলে কথা! বেশ আধুনিক রাস্তাঘাট। ট্রাম, বাস, ক্যাব, প্রাইভেট কার আর বাইকে জমজমাট। রাতটা কাটিয়ে পরদিন বের হলাম শহরের বিশেষ কয়েকটা স্পট ঘুরে দেখতে। প্রথমেই দেখা হল বিড়লা মন্দির, যার আরেক নাম লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দির। দেখলাম ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল। ভারতের প্রথম ও আজ পর্যন্ত একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী, প্রায়ত ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর বাসভবনটিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে মিউজিয়াম হিসেবে। এখানে প্রদর্শিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু নিউস পেপারের কাটিং আর বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে ভাল লাগলো। দুপুরের খাবারটা সেরে নিলাম ইন্ডিয়া গেটের সামনে মাঠে বসে। দারুণ একটা পিকনিক পিকনিক মজা হল। শিমলা :দিল্লী থেকে রাতে রওনা হয়ে কালকা স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। গন্তব্য শিমলা হিমাচলের রাজধানী। কালকা থেকে টয় ট্রেন নামের এক স্পেশাল ট্রেনে আমরা শুরু করলাম শিমলা যাত্রা। আসাধারণ এক জার্নি। গাড়ি ঘুরে ঘুরে পাহাড়ে চড়ছে, বাইরে অবিশ্বাস্য সুন্দর প্রকৃতি! যদিও টয় ট্রেনের জার্নি ভীষণ ক্লান্তিকর, তবুও ওই জার্নিটা আমরা কখনো ভুলব না। রাতের শিমলাকে দেখলাম এবং মুগ্ধ হলাম। সমুদ্রতল থেকে ৭২৩৪ ফিট ওপরের শিমলা থেকে তাকালাম নীচে। পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গ্রামগুলোর অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিলো বাড়ি-ঘরগুলোর আলো দেখে। দম বন্ধ করা এক দৃশ্য। মনে হচ্ছিলো আকাশটা মাথার ওপরে নয়, নেমে এসছে পায়ের নীচে। আর তাতে জ্বলছে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ তারা। এরপর শিমলা থেকে মানালি। মানালি :সমুদ্রতল থেকে ১৯৫০ মিটার বা ৬৩৯৮ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত মানালি একটি ছোট্ট শহর। মনে হচ্ছিলো যেন স্বর্গে চলে এসেছি। সেই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। শুধু দু’চোখ ভরে দেখে নেয়ার। হোটেলের রুমটা থেকে দেখা যাচ্ছিল পাহাড় চূড়া। সাদা বরফের টুপি মাথায় দিয়ে আছে যেন। কয়েকটা বৌদ্ধ বিহার আর ভারতের বনবিভাগের সংরক্ষিত বন, “বন বিহার”-এ ঘুরলাম বিকেল বেলাটা। পরদিন খুব ভোরে গেলাম সোলান পাসে। যারা প্যারা গ্লাইডিং ও পাহাড়ে ঘোড় সওয়ারী করতে উত্সুক, তারা সবাই সোলানে যান। উজ্জ্বল ঝিকিমিকি রোদ, সাথে হিমেল আমেজ, হালকা বাতাস। চমত্কার আবহাওয়ায় কেউ করলো প্যারা গ্লাইডিং (সঙ্গে অবশ্য পাইলট থাকে, কোনো চিন্তা নেই), কেউ চড়লো ক্যাবল কারে, কেউবা ট্র্যাকিং করে উঠে গেলো চূড়ায়। হাজার হাজার ফুট ওপর থেকে সমতলকে দেখার মজাই অন্যরকম। কিছু সময়ের জন্য যেন পাখি হয়ে যাওয়া। আমরা মেয়েরা মানালির ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল পাহাড়ি পোশাকে ছবি তুললাম। পাহাড়ি নাচের ভঙ্গিমায় পোজ দেয়ার সময় একেকজনকে একদম পাহাড়ি মেয়েই মনে হচ্ছিলো। হোটেলে ফেরার পথে পাহাড়ি নদী “পিয়াসী” তে কাটালাম অনেকটা সময়। পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পরলাম। এবার যেতে হবে কলকাতায়। কলকাতা :ভারতের তিলোত্তমা নগরী কলকাতা। হাওড়া স্টেশন থেকে ধীরে ধীরে আমাদের ট্যাক্সি প্রবেশ করে পুরনো কলকাতায়। ঢুকতেই যানজট। আমাদের দেশের মতই দীর্ঘ সারি। তবে দুর্গা পূজার ষষ্ঠীর দিন হওয়ায় পূজার রেশটা ভাল করেই পাচ্ছিলাম। রাস্তার দু’পাশে একটু পরপর প্যান্ডেলের আলোকসজ্জা, ধুপের গন্ধ, শঙ্খ-ঘণ্টার আওয়াজে অন্যরকম এক কলকাতাকে দেখলাম। পরদিন মেট্রোতে করে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উদ্দেশ্যে যাত্রা। মেট্রো সার্ভিস আসলেই মুগ্ধ হবার মত। মেমোরিয়াল থেকে বের হলেই সামনে রেসকোর্স ময়দান। তারপর গেলাম কলকাতা নিউমার্কেট। দলবেঁধে চক্কর দিলাম পুরো নিউমার্কেট আর ডাউন মার্কেট। চমত্কার কয়েকটা শাড়ি আর শান্তিনিকেতনী ব্যাগ কেনা শেষে শুরু করলাম, কলকাতার বিখ্যাত স্ট্রীট ফুড খাওয়া। রাজ কচুরি, চাউমিন, সবজি পুরী, নিম্বু পানি, লাচ্ছি, পানি পুরি আরো কতকিছু যে খেলাম মজা করে। আর আইসক্রিমের তো তুলনাই নেই। রাতে ব্যাগ গুছাতে গুছাতে ভাবলাম, আনন্দের দিনগুলো কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতে হয়! এই ট্যুরটার স্মৃতি কখনই মন থেকে মুছে যাবে না। বন্ধুদের সাথে এতগুলো দিন কি আনন্দে, নিশ্চিন্তে কেটে গেলো। যেন মাত্র কয়েকটা দিন! ফিরে গিয়েই আবার সেই পড়াশোনা, ক্লাসে দৌড়ানো, আইটেমের চাপ...আবার সেই একঘেয়ে জীবন। সবারই দেখলাম মন খারাপ। তবু কি আর করা যাবে। আজ ২ অক্টোবর, আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের নিজেদের দেশে। যতই সুন্দর হোক পরের দেশ, পরের দেশই। সুন্দর একটা স্মৃতি মনের ভেতর জমা করে আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের নিজেদের বাড়িতে। বর্ডার আর কাস্টমসের ঝামেলা মিটিয়ে যখন পা রাখলাম বাংলাদেশে মনটা একদম ভালো হয়ে গেলো। এই আমার প্রিয় স্বদেশ-যার পরতে পরতে আমার অধিকার আর অনুভব। লেখক : শিক্ষার্থী, সিটি ডেন্টাল কলেজ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন