আজ জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস। জাতিসংঘের ফুড এণ্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের নির্দেশনায় ১১ ডিসেম্বর এই দিবস পালিত হয়। ২০০৩ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। আমাদের জীবনযাত্রায় তথা সামগ্রিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও পর্বতের গুরুত্ব তুলে ধরাই দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য। পরিবেশ সংরক্ষণ মানবজাতির বেঁচে থাকার জন্যই দরকার। তবে এ বিষয়ে মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই রয়েছে নৈতিক দায়িত্ব। পরিবেশ সংক্রান্ত নৈতিক বা মানবিক দায়-দায়িত্ব পালনের জন্য পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝা একান্ত আবশ্যক। পর্বত রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে একটি দিবস পালন এ ক্ষেত্রে বেশ তাত্পর্য বহন করে। আসলে পর্বত বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা পরিবেশের অন্যান্য দিকের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনেক কম।
বিশ্বের অর্ধেকের বেশি পরিচ্ছন্ন পানি পর্বত থেকে আসে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ পর্বতের পানির ওপর নির্ভর করে। পৃথিবীর প্রধান প্রধান নদীগুলো পর্বত থেকেই উত্পত্তি হয়েছে। বিশ্বের দশ ভাগের এক ভাগ মানুষ পর্বতে বাস করে। জল বিদ্যুত্ সৃষ্টিতে পর্বতের পানি ব্যবহূত হয়। পর্বত থেকে বিভিন্ন রকমের কাঠ পাওয়া যায়। দৃষ্টিনন্দন পর্বতের দ্বারা ট্যুরিজম শিল্পের উন্নতি ঘটেছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর পর্বতের প্রভাব রয়েছে। সামগ্রিকভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পর্বতের ভূমিকাকে গুরুত্ব না দেয়া সম্ভব নয়। তবে পর্বত সম্পর্কে কেবল তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়। পর্বত রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ হওয়ার প্রয়োজন। এ জন্য পরিবেশ নীতিবিদ্যার পঠন-পাঠন অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। তাই বিভিন্ন পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে পরিবেশ নীতিবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
নীতিবিদ্যা মূলত মানুষের ঐচ্ছিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করার একটি বিদ্যা। তাই পরিবেশের সাথে মানবাচরণ কী রকম হওয়া উচিত, কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিমানুষ পরিবেশের সাথে কী রকম আচরণ করবে সে বিষয়ে আলোচনাই হলো পরিবেশ নীতিবিদ্যা। স্বভাবতই তাই পরিবেশ নীতিবিদ্যার আলোচনার ক্ষেত্র ব্যাপক। প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীব ও উদ্ভিদ জগত্ এক কথায় সামগ্রিক বাহ্যজগত্ এর সাথে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়টি পরিবেশ নীতিবিদ্যার আলোচনার অন্তর্গত।
পরিবেশের ক্ষেত্রে মানবাচরণের নৈতিক তাত্পর্য এ জন্যই আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ কেন না এ ক্ষেত্রে আইন, ধর্মীয় বিধান অনেক সময় যথাযোগ্যভাবে কার্যকর হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় কোন ব্যক্তি যদি তার বাড়ির আঙ্গিনা অপরিচ্ছন্ন রাখে বা কোন নিজের মালিকানাধীন জলাশয় দূর্ষিত করে, গৃহপালিত জীবজন্তুকে নির্যাতন করে তাহলে আইন হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই তাকে আটকাতে পারে না। তাই এক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষা বা নৈতিক সচেতনতা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আর নৈতিক শিক্ষা বা নৈতিক সচেতনতার প্রসারের জন্য এ সংক্রান্ত নৈতিক পর্যালোচনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আর এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সমকালীন বিশ্বে পরিবেশ নীতিবিদ্যা বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে। সমকালীন বিশ্বের বাস্তবতার প্রতি নজর দিলে আমরা দেখতে পাই যে, যথাপোযুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণের অভাবে বা পরিবেশের সাথে বিরূপ আচরণের প্রভাবে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে যার ফলে নানা রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে সে জন্যে মানবজীবনও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই পরিবেশের প্রতি যথাযোগ্য আচরণ করা মানুষের কেবল দায়িত্ব-কর্তব্যই নয় বরং অপরিহার্য বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর এ জন্য পরিবেশ নীতিবিদ্যার পঠন-পাঠন বেড়ে চলছে। পরিবেশ নীতিবিদ্যা তাই সমকালীন প্রায়োগিক নীতিবিদ্যার একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়।
তবে আমাদের দেশে পরিবেশ নীতিবিদ্যার পঠন-পাঠন নেই বললেই চলে। অথচ পাহাড় পর্বত ধ্বংস করাসহ পরিবেশের ক্ষয়-ক্ষতি সংক্রান্ত বহু রকমের অঘটন ঘটার খবর আমরা পেয়ে থাকি। স্কুল পর্যায়ে থেকে পরিবেশ নীতিবিদ্যার পাঠ প্রদান করা হলে মানুষ এ ধরনের মন্দ প্রবণতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত। একথা সকল দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পরিবেশ নিয়ে বড় বড় বৈঠক করলেই পরিবেশ রক্ষা হবে না। পরিবেশের প্রতি দায়-দায়িত্বের বিষয়টি মানুষের অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে হবে। এ জন্য নৈতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক : দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
চেয়ারম্যান, এসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স
[email protected]
