উদ্বেগ-অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩০
সকল রাজনৈতিক কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হউক— এই প্রত্যাশা সর্বজনীন। নিকট অতীতের ভয়াবহ তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে এমন আশাও উচ্চকিত হইয়া উঠিয়াছিল যে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংঘাতের পথ পরিহার করিবেন এবং যতো কঠিনই হউক না কেন শান্তি ও সমঝোতার আদর্শকেই শিরোধার্য করিবেন তাঁহারা। কিন্তু গত রবিবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আহূত রাজপথ অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করিয়া সারা দেশে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে তাহাতে সেই আশা ধূলিসাত্ হইবার উপক্রম হইয়াছে। যথারীতি নির্বিচারে শত শত গাড়ি ভাঙচুর ও বেশকিছু অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে। সহিংস সংঘর্ষে রক্তাক্ত হইয়াছে রাজপথ। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আহতের সংখ্যা ৫ শতাধিক। সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক বিষয় হইল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও অবরোধের পক্ষ-বিপক্ষের ত্রিমুখি সংঘর্ষে ঝরিয়া গিয়াছে কয়েকটি মূল্যবান প্রাণ। তন্মধ্যে অন্তত দুইজনের যে রাজনীতির সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না তাহা নিশ্চিত। জীবিকার তীব্র তাগিদেই সকালে তাহারা ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই পরিণত হইয়াছে রক্তাক্ত লাশে। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্যকে হারাইয়া দিশেহারা হইয়া পড়িয়াছে শোকার্ত স্বজনেরা। বোধবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষের পক্ষেই যে এই মৃত্যু মানিয়া লওয়া সম্ভব নয়— তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মৃত্যু এই আত্মঘাতী হানাহানিই যেন আমাদের নিয়তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরিয়া আমরা এই চিত্রই দেখিয়া আসিতেছি। স্বাধীনতাপরবর্তী গত চারদশকে পরিস্থিতির উন্নতি হইবার কথা থাকিলেও বাস্তবে তাহা আরও জটিলাকার ধারণ করিয়াছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বহু দল বহু মত থাকিবে— ইহাই স্বাভাবিক। একইভাবে এই ব্যবস্থার তাত্পর্যপূর্ণ একটি দিক হইল— পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে নানা বিষয়ে মতবিরোধ থাকিতেই পারে। এই মতভিন্নতা যতো জটিলই হউক না কেন পারস্পরিক সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাহা নিষ্পত্তি করাই হইল সর্বজনস্বীকৃত গণতান্ত্রিক রীতি। এইগুলি কোনো নূতন কথা নহে। এই ব্যাপারে আমাদের রাজনীতিকদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিঃসন্দেহে আরও ব্যাপক ও গভীরতর। সংঘাতের রাজনীতির পরিণাম যে কখনোই শুভ হয় না— সেই অভিজ্ঞতাও তাহাদের অঢেল। সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শুধু যে জানমালের ক্ষতি হয় তাহাই নহে, অর্থনীতির উপর ইহার নেতিবাচক প্রভাব যে কতো ব্যাপক— সেই পরিসংখ্যানও তাহাদের নখদর্পণেই বলা যায়। জনমনে যে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় তাহা নাই বা বলিলাম। এইসব বিষয় লইয়া ইতোমধ্যে বিস্তর কথা বলা হইয়াছে। জাতিসংঘসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রভাবশালী বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতে বিভিন্ন সময়ে এই ব্যাপারে মূল্যবান পরামর্শও দেওয়া হইয়াছে তাহাদিগকে। কিন্তু কোনো ফল হয় নাই। বরং সমঝোতার সম্ভাব্য সকল সম্ভাবনাকে বারবার ছাপাইয়া উঠিয়াছে সংঘাত। ইহা এখন একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিশেষ করিয়া জাতীয় নির্বাচন যতো নিকটবর্তী হয় সংঘাত ততো তীব্র হইয়া ওঠে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলিলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলির প্রবল অনীহাই যে ইহার অন্যতম কারণ তাহাতে সন্দেহ নাই। হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ প্রভৃতিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জনগণ এই ধরনের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির বিপক্ষে নহে। কিন্তু আমাদের গত কয়েক দশকের বাস্তব অভিজ্ঞতা এমন যে, সংঘাত ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচি কল্পনা করাও কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। ভাবিতে অবাক লাগে যে, এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও এখনো আমাদের গণতন্ত্র টিকিয়া আছে এবং আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও যথেষ্ট আশাপ্রদ। এই দেশের বিপুল উদ্যমী জনগণই যে এই অসম্ভবকে সম্ভব করিয়া তুলিয়াছে— তাহা লইয়া দ্বিমত নাই। রাজনীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন যাবত্ যে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজমান সহসা তাহার অবসান ঘটিবে— অতি আশাবাদীর পক্ষেও এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা সম্ভব নহে। বরং এই উদ্বেগ-অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসের উপযুক্ত কলাকৌশল রপ্ত করিয়া লওয়াটাই অধিক বাস্তবসম্মত হইবে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন