যেতে যেতে পথে পথে

বঙ্গ সন্তানের ‘মেন্যু’ আবিষ্কার

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩১
ক্ষিধে পেয়েছে। প্রচণ্ড। ফ্রাঙ্কফুর্টে রাত তখন আটটা। বাংলাদেশে রাত একটা। ক্ষিধে লাগবার কথা শুধু নয়, পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড় শুরু হওয়ার কথা। রুমে খাওয়ার বস্তু কিছু আছে। নন রাইস বিভিন্ন আইটেম। রাতের খাবার হিসেবে মেনে নিলে খেয়ে শেষও করা যাবে না। তারপর এক কাপ কফি, রুমেই তৈরি করার ব্যবস্থা আছে। আমি তা করতে পারিও চমত্কার। তারপরও মনকে মানাতে পারলাম না। মন বললো, যায় উড়ে যাক না নাহয় কুড়ি ইউরোর একটা নোট, গেলো না হয় আরও দু’-চার ‘টাকা’ বেশি। ক্ষিধের সময় পিত্তের দুয়ারে বাঁধই শুধু দেয়া যাবে না, পঞ্চাত্মাকেও তুষ্ট করা যাবে। পঞ্চাত্মা তুষ্ট করার মত প্রীতিকর কাজ আর নেই। আদিনা অ্যাপার্ট হোটেলস এর একটি আছে ফ্রাঙ্কফুর্টের রেলওয়ে স্টেশনটির কাছাকাছি এক জায়গায়। জায়গাটি রাইন নদীর পাড় থেকে খুব কাছে। একটু আগে শাসিত সেই নদীর পাড় ধরে অনেকক্ষণ হেঁটে এসেছি, দুটো সেতুও পার হয়েছি। একটু শুধু হাঁটবার সেতু ও সাইকেল চালাবার অন্যটি সবকিছুর। হাঁটতে হাঁটতে ক্ষিধে লাগায় বাইরে আর কোন খাবার দোকান না খুঁজে হোটেলের রেস্টুরেন্টই দু’-চার ‘টাকা’ বাঁচাবার জন্য অপরিচিত শহরের অপরিচিত পথ ধরে শীতের ভেতর হাঁটার কোন মানে পেলাম না। তাছাড়া যে হোটেলে থাকি, খরচ যাই হোক, তার নিজস্ব রেস্তোরাঁয় খাওয়ার একটা আকর্ষণও আছে। একটা বিলাসী বিলাসী আর বনেদী বনেদী ভাব দেখাবার আর সেটি উপভোগ করার সুযোগও এখানে আছে। বসে পড়লাম। বাংলাদেশের আরেক সঙ্গী, সাইফুজ্জামান তার লোকাল এক বন্ধুকে নিয়ে ডিনার করার ও তাতে আমাকেও আহ্বান করার কথা ছিল। তার অপেক্ষা আর করলাম না। আদেখলার মত, কিংবা নিজের কড়ি বাঁচাবার অপেক্ষায় আমিই বা থাকবো না কেন! ওদের প্রাইভেসিতেই বা হাত চালাবো কেন। আপন প্রাইভেসির মাঝে নিজে নিজে বিলাস করার একটা সুযোগ যে এসে গেলো, সেটিকেই বা ফেরাবো কেন। এইসব ভাবতে ভাবতে বসে গেলাম এবং টেবিলে বসেই যে লিখতে শুরু করলাম, একটু পরে অর্ডার নেয়ার জন্য যে আসবে, তাকে আমি কী বলবো। এদের মেন্যুর কোন খাবারই তো আমার পরিচিত নয়। সবকিছুতো আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। আমাকে প্যারা দু’ প্যারা আরও লেখার সুযোগ দিয়ে খাদ্য এলো অবশেষে। পুরো প্লেটের বারো আনা জোড়া অত বড় ডিম্বামলিট (ডিম্ব+অমলিট) আগে খাবো দূরে থাক, কখনও দেখিওনি। আমার পছন্দমত একেবারে কড়া ভাজা। তার পেটের ভেতর ঢিবেঢিবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে চারকোণা করে ছোট ছোট সাইজে কাটা ডুমোডুমো আলুর টুকরো, ব্রক্বলি, টোমাটো, কাঁচা লঙ্কা ও ক্যাপসিকাম। তেমন বস্তু একটা ঢোকালেই পেটের সব কোণ টাইট হয়ে যায়। সঙ্গে আছে মোটামোটা চাল এ আসা ভাতের বাটি ও মাঝারি সাইজের প্লেটে মেয়োনেজ এর সঙ্গে আসা পর্যাপ্ত ফ্রেঞ্চচিপস। সাবড়াতে পারবো না ভেবেছিলাম। কিন্তু খেতে গিয়ে দেখলাম বিশেষ স্বাদের হালকা তিতকুটে জর্মন ভল্লুক এর সহযোগে সহায়তায় সব উধাও হয়ে যেতে খুব সময় লাগলো না। মাঝে কৃষ্ণবালক এসে জেনে গেলো হাউ ইজ দ্য ফুড স্যার। বা হাতের ধ্যাবড়া সাইজের পেটমোটা বুড়ো আঙ্গুল শূন্যে তুলে বললাম, অ্যাকস্যালেন্ট, উত্সাহ পেয়ে সে আবার জিজ্ঞেস করে বসলো- ইউ এনজয় ইট? অর্ধচিবুনো খাবারে কানায় কানায় ভরা ঢ্যাবঢ্যাবা গাল থেকে রস পড়ে কি পড়ে না অবস্থায় বহু কষ্টে শব্দ বার করলাম। অ্যাবসলুটলি। পে মাই থ্যাঙ্কস টু দ্য শেফ। কতক্ষণ পর বিল এলো। ধারণা ছিল কুড়ি ছাড়াবে। এলো সতেরো দশমিক আশি ইউরো। ধারণার ভেতরে। দুটো অপশান। নগদ ওশুধে দিতে পারি, অথবা চেক আউট এর সময় হোটেল বিল এর সঙ্গেও দিতে পারি। রসিক বালক বললো, হোল্ড স্যার। পে ইট উইথ দ্য ফাইনাল বিল। কিপ ইট সেইভড ইন ইউর পকেট ফর সাম আওয়ার্স। লেট দ্যা পকেট রিমেইন মোর ওয়ার্ম ফর সামটাইম। আমি বললাম-নট ব্যাড। থ্যাঙ্কস। ++লেখক :শ্রমজীবী সাহিত্যিক আদিনা অ্যাপার্টমেন্ট হোটেল, ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন