পদ্মা সেতুর অর্থায়নের ঝামেলা যেন আর শেষ হচ্ছে না। মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিরক্তি ক্রমে যেন বেড়েই চলেছে। ২৯১ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে স্বল্পসুদে লোন দাতা বিশ্ব ব্যাংক ১২০ কোটি ডলার অর্থ সাহায্য দেবার অঙ্গীকার প্রথমে করেছিল। কিন্তু সেসময় অর্থায়নের বিষয়টির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন সরকারি ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সরকারকে একাধিকবার তুলে ধরার পরও সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাড়া না পাওয়ার কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর ১২০ কোটি ডলারের ঋণ গত ২৯ জুন বাতিল করে দেয়। বিশ্ব ব্যাংকের সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য দাতাগোষ্ঠিরাও (এডিবি, জাইকা) সুরে সুর মিলিয়ে তাদের ঘোষিত অর্থায়নের ব্যাপারেও দ্বিধা-পোষণ করে। তারাও অজুহাত দেখাতে থাকে যে, বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অমীমাংসিত ঝামেলাগুলো না চুকলে তারাও ভেবে দেখবে যে এ প্রকল্পে তারা অর্থায়ন করবে কি করবে না।
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে বিশ্ব ব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছিল এবং অভিযুক্তদের ব্যাপারে সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের বিষয়ে সরকার কতটা আন্তরিক থাকবেন-তার নিশ্চয়তা চেয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল যে, সরকার সেসময় বিশ্ব ব্যাংকের আনিত অভিযোগগুলো তেমন গুরুত্বের সঙ্গে তো নিলেনই না বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ কেউ গলা উঁচু করে এই প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি বলে অভিযোগগুলোকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলো এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সঙ্গে অভিযুক্ত প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর পক্ষে প্রকাশ্যে সাফাই গাওয়াও শুরু করলো। শুধু তাই নয়, সরকার বিশ্ব ব্যাংককে এক ধরনের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মালয়েশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়লো পদ্মা সেতুতে চড়া সুদে বিকল্প অর্থায়নের জন্য। এছাড়াও এই ইস্যুটিকে ঘিরে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির অযথা বেশি কথা বলার প্রবণতাও বেড়ে গেল। কেউ উচ্চাভিলাষী হয়ে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে বলেও এক ধরনের দুঃসাহসিক ঘোষণা পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত করতে লাগলো। এসব ঘটনাকে ঘিরে সরকারের সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের দূরত্বই যে শুধু বাড়ল তা নয় বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজটিও মহাজোট সরকারের সময়ে এক মহাঝুঁকিতেই পতিত হল। বেশ কয়েক মাস যাবত্ মহাজোট সরকার নতুন করে কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করেছেন বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে কি করে পুনরায় এই দাতা সংস্থাটিকে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ফিরে আনা যায়! তবে এই উদ্যোগটি তারা যখন নিলেন তখন নদীতে অনেকটায় জল ঘোলা হয়েছে। সরকার ও দাতা সংস্থাটির মধ্যে বিশ্বাসের ঘাতটিও অনেকটা বেড়েছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব ব্যাংক শর্ত সাপেক্ষে অর্থায়ন পুনর্মূল্যায়ন করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যাপারে তারা সরকারের আন্তরিকতা প্রকৃত অর্থেই দেখতে চায়। সহায়তা করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদককে অনেক তথ্য-উপাত্তও দিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংক। সেই লক্ষ্যে গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ দেয়া আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যরা দ্বিতীয় দফা ঢাকায় সফরে এসেছিলেন এবং দুদকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। ঢাকার কাগজগুলোতে এ বিষয়টিকে ঘিরে ইতিমধ্যে অনেক তথ্যই প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে কার কার নাম এজাহারে থাকতে পারে এ ধরনের সম্ভাব্য ১০ জনের একটি তালিকা দুদকের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে বাদ দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা নিতে চায় দুদক। এতে বাধ সাধে বিশ্ব ব্যাংকের আন্তর্জাতিক প্যানেল। বিশেষ করে সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যাপারে কোনক্রমেই ছাড় দিতে নারাজ এই প্যানেলটি, কারণ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট যথেষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে তাদের কাছে। বিশেষ বিবেচনায় কাউকে ছাড় দেয়া নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে গ্রহণযোগ্যও হবে না। এ অবস্থায় ঢাকা ত্যাগ করেন বিশেষজ্ঞ প্যানেলটি।
আমার সাধারণ জ্ঞানে যা বলে তা হল, আইনি প্রক্রিয়া শুরু মানেই তো শাস্তি নিশ্চিত নয়। তাহলে দুদক কেন এবং কার/কাদের স্বার্থে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর নাম এজাহার থেকে বাদ দিতে এতো উত্সাহী হবেন? তাছাড়া মন্ত্রী মহোদয়ও ইতিপূর্বে একাধিকবার বলেছেন যে তিনি দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সংগে যুক্ত নয় বিশ্ব ব্যাংকের অভিযোগটি ডাহা মিথ্যা। সুতরাং এটা তো এখন এই প্রভাবশালী মন্ত্রী মহোদয়ের নিকট বিশেষ একটা সুযোগ বা চ্যালেঞ্জ এসেছে যে, দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা তার নামে বিশ্ব ব্যাংকের আনিত অভিযোগটি শতভাগ মিথ্যা প্রমাণ করে দেশের মান-সম্মান ভূলুণ্ঠিত না করে চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও আলোকিত করা। তার জন্য বা আর নয়জনের জন্য সাড়া দেশের ১৬ কোটি মানুষ আর কত ভুগতে পারে? পদ্মা সেতু দেশের আপামর মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের এক বিশেষ স্বপ্ন। এই অলীক স্বপ্ন পূরণ হবে, মানুষের মুখে হাসি থাকবে সেটাই তো হবে কাম্য। দশজন ব্যক্তির নামে দুর্নীতির অভিযোগ থাকার জন্য ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিষাদ ঘটবে তা কি করে হয়? এই সেতু বাধাহীনভাবে সম্পন্ন হবে সেটাই তো মূলত সবার নিকট প্রত্যাশিত। আজ যারা এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছেন- দুদক বা সরকার কি চায় না- যে দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিচার হোক? তাহলে কি এই বিশ্বাস আমাদের মধ্যে প্রলম্বিত হতে থাকবে যে- “যে সরিষা দিয়ে ভূত ছাড়ানো হবে সেই সরিষার মধ্যেই প্রকৃত ভূত লুকায়িত”? “দল বা ব্যক্তির চেয়ে দেশ বড়”-এই উক্তিটি কি তাহলে আমরা ভুলতে বসেছি? তা কি করে হয়? যমুনার মতো একটি কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু যে আমাদের চাই-ই চাই।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটের একটি ইন্ডাস্ট্রিতে সায়েন্টিস্ট পদে কমরত
