আমরা কোথায় যাব? কার কাছে যাব? এই সহজ-সরল প্রশ্ন দুটির উত্তর খুঁজে পেতে কেবলই হা-হুতাশ, কেবলই নিস্তব্ধতা, নিমগ্নতা। জানি, এর উত্তর কোন পাঠ্যবইতে নেই, কোন গাইড বইতে নেই। মধ্য বয়সে শিশুশ্রেণীর ছাত্রের মতো ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে অন্যমনস্ক তাকিয়ে থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। নৃশংসতা, সহিংসতা, শত্রুতা, ধর্মান্ধতা— এসব ঋণাত্মক শব্দের সাথে একীভূত হয়ে অজানা আশঙ্কার অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হতে কোথায় চলেছি জানি না। বিপরীতে অন্য একটি প্রশ্নও করা যায়, আমরা কী করতে পারি? এর উত্তরে আর একটি প্রশ্ন যোগ হয়, আসলে কী আমাদের কিছু করণীয় আছে? সুতরাং প্রশ্নের উত্তরে যখন প্রশ্ন আর প্রশ্ন তখন মাথা তুলে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প দেখি না। ১৮ দলের এই যে ৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি পালিত হলো তা থেকে কে বা কারা কতটুকু অর্জন করল বুঝতে পারিনি। শুধু বুঝেছি, সড়কগুলো রণক্ষেত্র আর অগ্নিক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত সুন্দর সংসদ ভবন থাকতে জনগণের পথটিকে কেন ‘খেলার মাঠ’ হিসাবে রাজনীতিকরা ব্যবহার করেন বুঝতে পারি না। পথের উপরে যে নির্মম-নিষ্ঠুর তাণ্ডবলীলা চলে তা কতটা অমানবিক, কতটা অযৌত্তিক তা বুঝার সাধ্য কারো নেই। এতগুলো যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংসলীলার দায়ভার কে নেবে? বিএনপি, আওয়ামী লীগ নাকি পুলিশ? আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কিন্তু ঐ তিনজনের/দলের/জোটেরই। অথচ তাদের হাতেই আমরা নির্যাতিত। তরতাজা ৩টি প্রাণ অকালে ঝরে গেল তার জন্য কারো কোন অনুশোচনা দেখলাম না। আর এই যে বিশ্বজিত্ নামের নিরীহ একটি ছেলে অকালে প্রাণ হারালো, ছাত্র নামধারী ক্যাডারদের হাতে এর দায় কে নেবে। একে কি গণতন্ত্র বলে? নাকি অন্যকিছু। আবার এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি করে বলে তারা নাকি তাদের দলের নয়। কথা হলো তারা যে দলেরই হোক না কেন, তারাতো সন্ত্রাসী। তাদেরকে ধরে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বললেন অবরোধ সফল হয়েছে এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন। যদি প্রশ্ন করি, তিনি জনগণের মনের কথা কী করে বুঝলেন? বুঝতেন তখনই যদি ভাংচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা না ঘটত। অবরোধের নৈতিক বা সাংবিধানিক অধিকার আছে, অবরোধ ডাকবেন; কিন্তু যার ইচ্ছে মানবেন, যার ইচ্ছে ভাংবেন। তা হলে তিনি জনগণের সঠিক রায়টি বুঝতে পারতেন। স্পষ্ট ভাষায় অসংকোচে বলতে চাই, জনগণ ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের পক্ষে নেই, কখনো ছিলেন না, কখনো থাকবেন না।
পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বললেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে বিএনপি-জামায়াত মাঠে নেমেছে। তার এই কথার সাথে কী একমত হতে পারি? শুধু তিনি নন, আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় এমপি-মন্ত্রীদেরও অনেকেই কথায় কথায় এই মন্তব্য করে চলেছেন। কিন্তু আমরা জানি বিচার হচ্ছে আদালতে, মাঠে নয়। মাঠে থেকে বিএনপি-জামায়াত কীভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করছে বা বানচাল করতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে তা বোধগম্য নয়। বিচারের রায় ঘোষণার পর একমাত্র রাষ্ট্রপতিই ক্ষমা করার অধিকার রাখেন—বিএনপি-জামায়াত নয়, এটা সবাইকে ভেবে দেখতে বলি। সুতরাং দৃঢ়চিত্তে বলতে চাই, এই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিচারটি নিয়ে যেন গড়িমসি না হয়। কাউকে দোষারোপ করতে গিয়ে মূল দায়িত্ব থেকে পিছপা হলে তা জনগণের জন্য ক্ষতির কারণ হবে বলে মনে করি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে এক সময় আওয়ামী লীগ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, বিএনপি ঠিক একই পথে পা বাড়াচ্ছে। সুতরাং আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে অতদূর যেতে দেয়া ঠিক হবে কি না। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর যাতে দেখতে না হয় সে ব্যবস্থা নেবার দায়িত্ব বর্তমান সরকারেরই। সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিলে আমরা উপকৃত হব।
লেখার শুরুটা করেছিলাম দুইটি প্রশ্ন দিয়ে, উপসংহারে তার উত্তর আহরণের চেষ্টা করছি। ১৯৯১ সালে ভেবেছিলাম আমরা পূর্ণ গণতন্ত্র পেয়েছি। কিন্তু আশায় গুড়েবালি। হূদয়ে আবার ক্ষত এবং ক্ষত থেকে পচন। পচন শুকানোর উপায় খুঁজলাম, কারণ আমাদের বাঁচতে হবে। মনে হচ্ছিল আমরা দগদগে ক্ষত নিয়ে অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত নৌকাকেই সম্বল মনে করলাম। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু সেটাও স্থায়ী হলো না। নৌকাটা আমাদের যথাযথভাবে কূলে ভিড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হলো। আমরা আবার ভিড়লাম আগের স্থানে। কিন্তু কী দুভার্গ্য আমাদের! স্বভাব বদলালো না মনিবের। আস্থার জায়গাটি হারালাম। ফলে নাগরিক হিসাবে নয়, চাকরের মতো নতজানু হয়ে পড়তে হলো, অন্যায়-অবিচার দেখতে হলো। কী অদ্ভুত ব্যাপার, আমাদের যাবার জায়গা নেই বলে আবার পুরোনো নৌকায় পা। কিন্তু বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার এটাই যে, এখনো পর্যন্ত দুই নৌকায় পা দেইনি। তবু একটা অবিশ্বাস জন্মে গেছে ভেতরে ভেতরে। কে তার নির্বাচনী ওয়াদা শতভাগ পূরণ করতে সমর্থ হবে? কে আর দুর্নীতিপরায়ণ হবে না? কে আইন-শৃঙ্খলা বা বিচার ব্যবস্থায় কোন হস্তক্ষেপ করবে না? কে জনগণের মনের ভাষা বুঝবে? কে এই দেশ আর মাটিকে মমতা দিয়ে আগলে রাখবে? রাজনীতি আমাদের এত অনিশ্চয়তায় ফেলে দেবে ভাবতে কষ্ট হয়। কোথায় গণতন্ত্র? কোথায় স্বচ্ছতা? কোথায় জবাবদিহিতা? তাই খুব অস্থির, খুব সংকটাপন্ন অবস্থা আমাদের। সত্যি সত্যিই কোন সদুত্তর খুঁজে পাই না, আমরা কোথায় যাব? কার কাছে যাব?
লেখক : শিশু সাহিত্যিক
ই-মেইল: [email protected]
