স্মরণ

জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১৬
আজ থেকে এক বছর আগে ১৩ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী অষ্টাশি বছর বয়সে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য। কিন্তু কিছু মানুষের মৃত্যু ভীষণ বেদনাদায়ক, দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু কবীর চৌধুরী এমন এক সময় চলে গেলেন যখন ১৯৭১-এর মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। হয়তো দুই-একজনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় এই বিজয়ের মাসেই আমরা পেয়ে যাব। খুব বেশি হলে আগামী মাস ছয়েকের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রতীকী বিচারের জন্য যে গণআদালত বসেছিল তার অন্যতম বিচারক ছিলেন কবীর চৌধুরী। এই গণআদালত সংগঠিত করার জন্য জাহানারা ইমামের সঙ্গে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল তত্কালীন খালেদা জিয়ার সরকার। সুদীর্ঘ কর্মময় ঘটনাবহুল এক আলোকিত জীবনের অধিকারী ছিলেন কবীর চৌধুরী। ১৯২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালীর চাটখিলে। শিক্ষাজীবনেও অত্যন্ত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে ১৯৪৩ সালে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন কবীর চৌধুরী। ১৯৪৪ সালে এম এ-তেও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পান একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৪৫ সালে কবীর চৌধুরী মেহের তাইমুরকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে যিনি হয়েছিলেন সকলের প্রিয় মেহের কবীর মেরী। তাদের তিনটি কন্যা সন্তান। তারাও প্রত্যেকে সুশিক্ষিত ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। ১৯৫৭ সালে ফুলব্রাইট বৃত্তি পেয়ে মার্কিন সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করতে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসনে উচ্চতর গবেষণা শেষ করেন ১৯৬৫ সালে। এর আগে ১৯৪৪ সালে পাবনা এ্যাডওয়ার্ড কলেজে ইংরেজির অস্থায়ী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন কবীর চৌধুরী। এরপর ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে দেশের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন এই শিক্ষাবিদ। একই দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৪ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রথমে অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে বিভাগীয় প্রধান হিসাবেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পূর্বে তিনি বাংলা একাডেমীর প্রধান, বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে সরকার কর্তৃক তিনি জাতীয় অধ্যাপক সম্মানে ভূষিত হন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে ছোট ভাই শহীদ মুনীর চৌধুরীকে হারান তিনি। তার সৃজনশীল অনুবাদকর্ম বাঙলা অনুবাদ সাহিত্যকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। শেক্সপিয়ার থেকে ডিলান টমাস, টলস্টয়, কহলিল জিবরান, ওরহান পামুক— আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনের খ্যাতিমান অনেকের রচনাই তিনি বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন অনুবাদের মাধ্যমে। অনুবাদ, মৌলিক রচনা, ছোটদের জন্য লেখাসহ দুই শতাধিক বইয়ের রচয়িতা তিনি। তিনি একাধারে ছিলেন শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সংগঠক, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তথা প্রশাসক এবং সর্বোপরি একজন সমাজ সংস্কারক। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দুই রাষ্ট্রীয় সম্মান- স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ও একুশে পদক দিয়ে সরকার তার ব্যাপক কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি দিয়েছেন তারই জীবদ্দশাতে। শুধু শিক্ষাদানেই নিজের জীবনকে আবদ্ধ রাখেননি কবীর চৌধুরী, থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠী ও থিয়েটার স্কুল- বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের এই দুইটি অন্যতম প্রধান সংগঠনেরও তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার জন্য এবং একটি বিজ্ঞানমনস্ক মানবিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে প্রণীত শিক্ষানীতি তৈরির ক্ষেত্রেও কবীর চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সব ক্ষেত্রেই বড় নিয়ামক একথা আমরা সবাই জানি ও উপলব্ধি করি। এক সময় কবীর চৌধুরীর অনুপস্থিতিও আমাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে স্বাভাবিক হয়ে আসবে হয়তোবা। কিন্তু যে কোনো প্রয়োজনে পরামর্শ ও আলোচনার জন্য যাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থানটি যে হারালাম আমরা সেই অপূরণীয় ক্ষতির ক্ষত কি কোনদিন কখনো পূরণ হবে? লেখক : নির্বাহী পরিচালক, বাঙালি সমগ্র জাদুঘর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন