বিজয়ের স্মৃতি

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪০
১৯৭১ সাল। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ছাত্র-জনতা যার যা কিছু আছে তা নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হল। রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় ভরে গেল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন। বাংলাদেশের বঞ্চনার ইতিহাস বললেন। ধারাবাহিকভাবে বঙ্গবন্ধু ২৩ বছরের আন্দোলনের কথা বললেন। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিলেন। বললেন—“রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ”। বললেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে”। স্বাধীনতা যুদ্ধের সমস্ত দিক নির্দেশনা দিলেন। কিছুই বাদ দিলেন না। সমস্ত জাতিকে প্রস্তুত থাকতে বললেন। তিনি এও বললেন- আমি যদি আর হুকুম দিতে নাও পারি তোমরা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনা পেয়ে সমগ্র জাতি মুক্তিবাহিনী গঠন করল। ট্রেনিং নেয়া শুরু করল। রাজারবাগের পুলিশ ও পিলখানায় ইপিআর সদাপ্রস্তুত থাকল। বাংলাদেশের প্রত্যেক গ্রামে, থানায়, মহকুমায়, জেলায় মুক্তিবাহিনী গঠন করে, সংগ্রাম কমিটি গঠন করে জাতি প্রস্তুত হতে থাকল। ২৫ মার্চ রাত ১২টায় পাকিস্তানী বাহিনী বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাথে সাথেই রাজারবাগের পুলিশ, পিলখানার ইপিআর প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করল। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, রাজারবাগের পুলিশই বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযোদ্ধা। ২৫ মার্চ সমস্ত রাতই প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে। প্রতিরোধ যুদ্ধই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয় তার আগেই। পুলিশ, ইপিআর, আনসার, ছাত্রজনতা ৭ মার্চের দিক নির্দেশনার পর আর কোন ঘোষণার অপেক্ষায় না থেকেই প্রতিরোধ যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে দেয়। শেখ মুজিবের লক্ষ লক্ষ অনুগামী, মুক্তিবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ শুরু করে। বাংলাদেশের আপামর জনতা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। মুক্তিবাহিনী কৌশলগত কারণে একপর্যায়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর লক্ষ লক্ষ সেনা ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে ও অস্ত্র নিয়ে দেশের ভিতরে এসে যুদ্ধে অংশ নেয়। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া বেলা ২.০০ ঘটিকায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার একটি ঘোষণা পাঠ করেন। ঐ বার্তাটি ছিল আমাদের কাছে একটি সংবাদ। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর অনুগত সৈনিক ছিলেন। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। সৈয়দ নজরুল উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হন। জেনারেল ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োজিত হন। সমস্ত বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। ১১টি সেক্টরে ১১জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেয়া হয়। জিয়াউর রহমানকেও একটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেয় সরকার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মেজর জলিলের, কাদের সিদ্দিকীর বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের সংবাদ বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা থেকে প্রচারিত হয়। মে মাসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দৈনিক দু’টি অধিবেশনে মুক্তিবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের খবর প্রচারিত হত। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অংশ বজ্রকণ্ঠে প্রচার করা হত। ঐ বজ্রকণ্ঠ শুনে মুক্তিবাহিনী বার বার, শত সহস্রবার বলীয়ান হত। আর নতুন নতুন উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে থাকল। বজ্রকণ্ঠটি মুক্তিবাহিনীকে এতই উদ্দীপনা দিত যে মুক্তিযুদ্ধ অতিদ্রুত বেগবান হত। এম.আর আখতার মুকুলের চরমপত্র শুনে মুক্তিবাহিনী ও জনতা উল্লসিত হত। পুরো মুক্তিযুদ্ধটাই বঙ্গবন্ধুর নামে, বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় চলেছিল। স্বাধীনতার সকল প্রেরণার উত্স ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি ও চেতনা যে কত বেশি শক্তিশালী ছিল তা বলে বা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রকৃত অর্থে ২০/২৫ লক্ষ সশস্ত্র মুক্তিবাহিনী ছাড়াও সাড়ে সাত কোটি বাঙালিই সেদিন মুক্তিবাহিনীতে অংশ নিয়েছিল। যে যেভাবে পেরেছে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা দিয়েছে, গোটা জাতিই যুদ্ধ করেছে। সবার মুখের শ্লোগান ছিল: জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। সমস্ত বিশ্বের দৃষ্টি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর আর বাঙালির নয়নের মণি, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালির মুক্তির দিশারী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। ডিসেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী আরো ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে। প্রতিটি রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের পর্যুদস্ত করে এক একটি এলাকা মুক্ত এলাকা করে ফেলত। পাকিস্তানী বাহিনী শেষ পর্যন্ত ঢাকায় অবরুদ্ধ হয়ে কোন উপায় না পেয়ে, পালাবার কোন পথ না পেয়ে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের হাতে আত্মসমর্পণ করে। রেডিওতে বাজাচ্ছে একটি গান: বিজয় নিশান উড়ছে ঐ বাংলার ঘরে ঘরে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হল। রাজাকারও মুক্তিবাহিনীর হাতে বন্দী হল। সমস্ত জাতি তখন বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায়। কেননা বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ তখন সাড়ে সাত কোটি মানুষের কাছে অর্থহীন মনে হল। মুক্তিবাহিনী তখন এমন চিন্তাও করেছিল যে, যুদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসবে। মুক্তিবাহিনী ঘোষণা দিল যে আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছি, তাই এ অস্ত্র বঙ্গবন্ধুর হাতেই সমর্পণ করব। অন্য কারো হাতে নয়। অবশেষে বিশ্ববাসীর চাপে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে পদার্পণ করেন। সমগ্র দেশবাসী উল্লাসে ফেটে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মুক্তিবাহিনী আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি করে উল্লাস প্রকাশ করে। ঐদিনই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়। বাঙালি জাতির আত্মা শান্ত হয়। লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সাবেক ব্যাংকার

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন