অতিরিক্তি ভর্তি ফি :অধ্যক্ষের বেতন স্থগিত

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৩
শিশুদের স্কুলে ভর্তি, বিশেষত রাজধানীর স্কুলসমূহে ভর্তির বিষয়টি ক্রমেই বিভীষিকায় পরিণত হইয়াছে। এই বিভীষিকা কায়েমের নেতৃত্বে রহিয়াছে ঢাকার নামি স্কুলগুলি। যেই স্কুলের খ্যাতি যত বেশি, সেই স্কুল বিভীষিকা সৃজনে তত বেশি পারঙ্গম। পাবলিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে ঐ স্কুলগুলিতে অভিভাবকদের ভিড় বেশি, ধনবান অভিভাবকেরা প্রয়োজনে বেশি পরিমাণে অর্থ প্রদান করিয়া ঐ স্কুলগুলিতে সন্তানকে ভর্তি করাইতে প্রস্তুত থাকেন। এইরকম প্রেক্ষাপটে নামি স্কুলগুলিতে নির্ধারিত ফির চাইতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হইয়া থাকে। ইহা শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বৈষম্য তৈরি করে। বিশেষত সীমিত আয়ের অভিভাবকদের ঐ পরিমাণ অর্থ প্রদান করিতে গিয়া নাভিশ্বাস উঠিয়া যায়। আবার কেহ কেহ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নিয়া অথবা উত্তীর্ণ না হইয়া কেবল অর্থ দিয়াই মূল্যবান আসনটি কিনিয়া নেয়। এই ভর্তি বাণিজ্যে গভর্নিং বডির সদস্য, স্থানীয় রাজনীতিবিদ এমনকি সংসদ সদস্যরা জড়াইয়া পড়েন, জন্ম নেয় আর্থিক দুর্নীতির। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ভর্তি পরীক্ষায় লটারি পদ্ধতি চালু করিয়াছিল, যাহা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় নাই। আবার সরকার বলিয়া আসিতেছে ভর্তির সময় অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ না করিতে। কিন্তু এই চলতি শিক্ষাবর্ষেও লওয়া হইয়াছিল অতিরিক্ত অর্থ। গত জানুয়ারিতে ভর্তির সময় গৃহীত অতিরিক্ত টাকা ফেরত অথবা মাসিক বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করিবার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় লইয়াছিল। সেই অনুযায়ী কিছু প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করিলেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান করে নাই। সরকারের নোটিসও কাজে আসে নাই। সরকার বাধ্য হইয়া তিন স্কুল ও কলেজের তিন অধ্যক্ষের এমপিও (বেতন বাবদ মাসিক সরকারি অর্থ) স্থগিত করিয়াছে। একইসঙ্গে কেন তাহাদের এমপিও স্থায়ীভাবে বাতিল করা হইবে না সেইজন্য কারণ দর্শানোর নোটিস দিবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। যেই তিনটি স্কুলের অধ্যক্ষের বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে সেই তিনটি স্কুল হইল মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই তিনটি স্কুলই ঢাকার স্কুলসমূহের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে রহিয়াছে। জানা গিয়াছে, এই তিনটি নামকরা স্কুল ২০১২ সালের ভর্তিতে শিক্ষার্থীদের নিকট হইতে ৯ কোটিরও অধিক অর্থ আদায় করিয়াছে। ইহার মধ্যে মনিপুর স্কুলই আদায় করিয়াছে ৫ কোটি টাকার অধিক অর্থ। লক্ষণীয়, স্কুলগুলি বেতন বাবদ সরকারি অর্থ পাইতেছে; কিন্তু ফির পরিমাণসহ সরকারের বাঁধিয়া দেওয়া অনেক নিয়ম-কানুনই মানিতেছে না। সব মানুষের জন্য শিক্ষা হইল অধিকার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা ও সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়। এই সমন্বয়ের ও সমতা বিধানের দায়িত্বটি সরকারের, যদিও সরকার এই সমন্বয়ের কাজটি যথার্থভাবে করিতে পারে না। ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা ও ক্যাডেট কলেজ মিলিয়া নানান রকমের শিক্ষাব্যবস্থার উপস্থিতি দেশে রহিয়াছে। কিন্তু ইহার মধ্যে বৈষম্য ও দুর্নীতি বাড়াইয়া তুলিতেছে বড় ও নামকরা স্কুলগুলির অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মনোভাব। বর্তমান সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে গৃহীত নানান পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। বাণিজ্যপ্রবণ স্কুলগুলিকে বাগে আনিবার বর্তমান এই উদ্যোগকেও তাই সাধুবাদ জানাইতে হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন