আজ থেকে ১৩ বছর আগে জ্যান শুয়েরম্যানের স্পাইনোসেরিব্রাল ডিজেনারেশন ধরা পড়ে এবং তখন থেকেই তিনি তার শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন। শুনতে খটমট এই রোগের সাধারণ পরিচয় হচ্ছে পক্ষাঘাত। ১৩ বছর আগেই পক্ষাঘাতে জ্যান অচল হয়ে যান। তিনি তার হাত বা পা নাড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। মূলত তার ঘাড়ের নিচে পুরো শরীরই ছিল অচল। কেবল কথা বলা আর মাথা নাড়ানোর ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল তার। খুশির খবর হচ্ছে, প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার ১৩ বছর পরে এসে জ্যান কোনো বস্তুকে হাত দিয়ে ধরতে পেরেছেন এবং আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই বিভিন্ন বস্তুকে নাড়াতে পেরেছেন। এই হাতগুলো অবশ্য জ্যানের নিজের হাত নয়, বরং রোবোটিক হাত। জ্যানের মস্তিষ্কে স্থাপন করা হয়েছে কিছু চিপ, আর সেই চিপের মাধ্যমেই জ্যান নির্দেশ দিয়ে ইচ্ছেমতো নাড়াতে পারছেন রোবোটিক হাত। এই ঘটনাটিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অভূতপূর্ব এবং নতুন এক যুগের সূচনা বলেই অভিহিত করছেন। এই গবেষণায় জ্যানের মস্তিষ্কের মোটোর কর্টেক্স অংশে চার মিলিমিটার বাই চার মিলিমিটার আকৃতির দুইটি সেন্সর স্থাপন করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রতিটি সেন্সরে রয়েছে শতাধিক সূক্ষাকৃতির সূচ যেগুলো দুইশটি আলাদা আলাদা মস্তিষ্কের কোষ থেকে ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল গ্রহণ করতে সক্ষম। দুইটি সেন্সর মস্তিষ্ক থেকে যে সিগন্যালগুলো পায়, সেগুলোকেই পরবর্তী ধাপে রোবোটিক হাতের জন্য নির্দেশে পরিণত করা হয়। আর সেই নির্দেশ অনুসারেই রোবোটিক হাতগুলো মানুষের হাতের মতোই নড়াচড়া করতে পারে, কনুই ও কব্জির কাছে বাঁকতে পারে এবং আঙ্গুলগুলোকেও নাড়াতে পারে; মানুষের হাতের মতোই পারে কোনো বস্তুকে ধরতে। জ্যানের মস্তিষ্কে চিপগুলো স্থাপনের পর তাকে কিছু মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় এবং দ্বিতীয় দিনেই সে রোবোটিক হাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে এই বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠে এবং রোবোটিক হাতকে তার নিজের হাতের মতো করেই ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে শুরু করে। এই গবেষণার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জ্যান যেভাবে রোবোটিক হাতকে ব্যবহার করছে, তা অনেকটাই স্বাভাবিক মানুষের মতোই। এই গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষক অ্যান্ড্রু শোয়ার্টজ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, এর আগে এত ভালো নিয়ন্ত্রণ অন্য কেউ দেখাতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের সাফল্য আগের কোনো উদ্যোগেই পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয়, স্পাইনাল কর্ডের আঘাতে যেসব রোগী রয়েছেন, তাদের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি। যেসব রোগীরা কোনোভাবেই নড়াচড়া করতে পারেন না, তারাও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজই করতে সমর্থ হবেন।’ ইতোমধ্যেই এই গবেষণার ফলাফল সাড়া জাগিয়েছে বিশ্বব্যাপী গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মাঝে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে একে বিশাল একটি অর্জন বলেই অভিহিত করছেন তারা।
