ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৩
মহান বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বাহির হইয়াছিল এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলিত সেই শোভাযাত্রা হইতে আহ্বান জানান হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার। এই আহ্বানের সংবাদ পাঠ করিয়া মন ভরিয়া যায় আশা ও আনন্দে। এই মহতী ডাক দিবার যথার্থ জায়গাও বটে বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা চাই এবং আমাদের সকলেরই চাওয়া উচিত যে, এই আলোকমন্ডিত আহ্বান জনে জনে, দেশের প্রতিটি প্রান্তে অনুরণিত হউক, জীবন ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সঞ্চারিত হোক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রেরণা। কিন্তু, তারপরও প্রশ্ন আসিয়া যায়, ন্যায় জিনিসটা কী! এই নিয়া অন্তহীন তর্ক এবং কূটতর্ক উভয়ই চলিতে পারে। কেহ কেহ বলিবেন, ন্যায় একটা আপেক্ষিক ধারণা। একজনের কাছে যাহা ন্যায়সঙ্গত, আরেকজনের কাছে তাহা অন্যায়। এইগুলি কূটিল তর্ক। এই তর্কের শেষ নাই। এই তর্কে বহুদূর। ন্যায় বলিতে আমরা সেই সত্যটিকে বুঝি যাহা যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। দার্শনিক হেগেলের মতে ‘যাহা যুক্তিসঙ্গত তাহাই সত্য এবং যাহা সত্য তাহাই যুক্তিসঙ্গত’। কোনটা যুক্তিসঙ্গত আর কোনটা নয়, তাহা নিয়াও মতের বিভিন্নতা থাকিতে পারে। ভিন্নমত পোষণ করিবার যে অধিকার, সে-ও কিন্তু যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। যুক্তি ও প্রতিযুক্তির মধ্য দিয়া সত্যকে বাহির করিয়া আনিবার জন্যই শৃংখলাবদ্ধ আইন-কানুন, নীতি-নিয়ম প্রণীত হইয়া থাকে। যে কোনো স্বাধীন দেশে আইনের উত্স উহার শাসনতন্ত্র। প্রথা এবং রীতিও অনেক ক্ষেত্রে আইন বলিয়া স্বীকৃত হইতে পারে, যদি তাহা সংবিধানের মৌলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। আইনের যেমন ধারা-উপধারা রহিয়াছে, তেমনই নিজস্ব নীতি-নিয়ম থাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার। কর্তৃত্বের ও অধিকারের সীমারেখা রহিয়াছে। সীমা লংঘনের সুযোগ নাই কাহারও। যখনই সীমা লংঘিত হয়, তখনই খর্ব হয় অন্যের অধিকার। নিজের অধিকারের সীমানা মানিয়া চলিবার চিরন্তন শিক্ষা প্রকৃতির মধ্যেও রহিয়াছে। ঘূর্ণায়মান চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র কেহই নিজস্ব কক্ষপথ অতিক্রম করে না। গোলাপ কখনই হাস্নাহেনার ঘ্রাণ লোপাট করিয়া নেয় না। নিজের বৈশিষ্ট্যকে সে বিসর্জন দেয় না। এটাই ন্যায়সঙ্গত। আমরা যখন ন্যায়ভিত্তিক সমাজের কথা বলি, তখন কিন্তু আসলে আমরা স্বীকৃত ও শৃংখলাবদ্ধ আইন ও নীতি-নিয়ম দ্বারা পরিচালিত সমাজের কথাই বলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হইবেন কিভাবে, ভর্তি হইবার জন্য যোগ্য শিক্ষার্থী বাছাই করা হইবে কোন প্রক্রিয়ায়, ছাত্রাবাসে কি প্রকারে সিট পাওয়া যাইবে, কোন পদাধিকারী কিভাবে নির্বাচিত হইবেন, কিভাবে কার্য সম্পাদন করিবেন, পার্লামেন্ট কিভাবে কাজ করিবে, সংসদ সদস্যগণ কতদূর কি করিবেন, সরকারের কোন কর্মকর্তার দায়-দায়িত্ব কী, কিভাবে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হইবে— ইত্যকার সবই লেখা রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট বইয়ে। অসম্ভব নয় যে, সেইসব চালু নীতি-নিয়মের কোনো কোনোটি অযৌক্তিক। সেইগুলিরও প্রতিবাদ করিবার, প্রতিকার চাহিবার পথনির্দেশ আইনে রহিয়াছে। মোটকথা নীতি-নিয়মের মধ্যে থাকিয়াই সব তর্কের, সব সমস্যার সমাধানসূত্র খুঁজিয়া পাওয়া যায়। অতঃপর এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আইন ও নীতি-নিয়ম পালন ও প্রয়োগ করার নামই ন্যায়। সমাজের সর্বস্তরে, গ্রাম ও শহরে, স্কুলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, শাসন-প্রশাসন, আচার-বিচার, রাষ্ট্রনীতি-রাজনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য সবখানে যে দিন যথারীতি নিয়ম-নীতি প্রতিপালিত হইবে, সেই দিনই আমরা বলিতে পারিব যে, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ভাষণে-শ্লোগানে, সেমিনারে, গোলটেবিলে, মিছিলে-শোভাযাত্রায়— আমরা যে আহ্বান জানাই, তাহা মানিবার জন্য আমাদের নিজেদেরও প্রস্তুত করিতে হইবে। তবেই না প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন