এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু দেশটির স্বাধিকার অর্জিত হয়েছে কিনা, স্বশাসনের যোগ্যতা আছে কিনা, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের চেতনা বিকশিত কিনা—সেই প্রশ্নের সমাধান এখনো হয়নি। কেবল পরনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকার চর্চা হয়েছে এখানে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের উন্নয়নে বৈদেশিক সাহায্যের অনিবার্যতার অনুশীলন করা হয়েছে। এমনকি আমাদের শিশু গণতন্ত্রের লালন ও বিকাশে সরকার ও বিরোধী দলসমূহের রাজনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সংলাপ সাফল্যের জন্যও আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রত্যাশা দেখা যায় সর্বমহলে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর দেশমাতৃকার পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানত ভারত ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব হতে আহরিত বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু সেই উত্স থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা না পেয়ে পরবর্তী সময় তিনি স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাশ্চাত্য বিশ্ব ও মুসলিম বিশ্বের সাহায্যের দিকে হস্ত প্রসারিত করেন। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত জননেতা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিক্ষত দেশটির প্রয়োজনে বৈদেশিক সাহায্যের যে গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন তা পরবর্তীকালে সকল শাসকের উন্নয়ন রূপরেখায় সন্নিবেশিত হয়েছিল। বাংলাদেশের উন্নয়নে বহুমুখী গণতন্ত্রের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বৈদেশিক সাহায্যের বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে বাংলাদেশের শিল্পায়নে বহির্মুখী নীতি (outward oriented growth policy) অনুসরণ করেছিলেন। এই দুই মহান নেতা বাংলাদেশের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সাহায্য উেসর যে প্রক্রিয়া শুরু করেন তা বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা-উত্তরকালে সাময়িক সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা যে আমাদের চিরনিয়তি হয়ে আমাদের চির পরনির্ভর করবে এমন দুরাশা মনে হয় দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দ কখনো পোষণ করেননি।
সত্তর দশকে উন্নয়ন ও বৈদেশিক সাহায্যের মধ্যকার দৃঢ় ঋণাত্মক সম্পর্কের ব্যাপারে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদগণ নানা তত্ত্ব উপস্থাপন করলেও এর বিপরীতে নির্ভরশীলতায় ভয়ংকর চিত্রও অংকিত হয় ছক-তাত্ত্বিকগণের (structuralists) ক্ষুরধার লেখায়। ফ্রাংক, বায়ান, ওয়ালারস্টেইন, আমীন, ফুরটাডো, ফ্যালেট্রো, কার্ডোসো প্রমুখ অর্থনীতিবিদ বৈদেশিক সাহায্যের ভয়ংকর পরনির্ভরতার অভিশাপ তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর অনেক দেশ সেই সতর্কবাণীর প্রেক্ষিতে পরনির্ভরতা এড়াতে বহিঃসাহায্য বিকল্প বর্জন করে স্বশাসন, স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের গৌরব অর্জন করে মাতৃভূমির উন্নতি সাধন করলেও বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের ঘুমের ঘোর এখনো কাটেনি। সে কারণে আমাদের সর্বত্র, এমনকি গণতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনেও বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক উন্নয়নে গণতন্ত্রের বিকাশ অনস্বীকার্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে পরনির্ভরশীল হলে অনতিবিলম্বে অর্জিত গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সেই সত্য বোধহয় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। যার ফলশ্রুতিতে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ছাড়া, বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া আমরা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার কোন ঘাত-অভিঘাত পার হতে সক্ষম হইনি।
স্বাধীনতার একুশ বছর পর নব্বই-এর দশকে গণতান্ত্রিক যাত্রা সূচিত হলেও স্বাধীনতা উত্তর পরনির্ভরতা এবং গণতন্ত্র উত্তর পরনির্ভরতার মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। গণতান্ত্রিক যুগের শুরুতে বিএনপি প্রধান দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সরকার প্রধান হয়েও পরনির্ভরতার শৃংখল থেকে স্বচ্ছ-মুক্ত ছিলেন না। মাগুরা নির্বাচনের মত বেশকিছু অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড তার প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ফুঁসে উঠেছিল প্রতিবাদী জনগণ, সোচ্চার হয়েছিল মিডিয়া। তখনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সাহায্য-উেসর সহযোগিতায় গণতন্ত্র বিকাশের পথে পা বাড়ানো হয়। পরবর্তী ক্রমিকায় সরকার প্রধান হন আওয়ামী লীগ প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা। অতীতের সকল বেদনাবিধুর ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে গণতন্ত্রের স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে এক পর্যায়ে জনবিচ্ছিন্ন হন। উদ্বিগ্ন-উত্কণ্ঠিত হয় দেশের জনগণ, পুনরায় সোচ্চার হন মিডিয়া, সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ। গণতন্ত্র রক্ষা ও বিকাশের প্রয়োজনে আবারো আমাদের নির্ভর করতে হয় বিদেশের উপর। তৃতীয় গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয় চারদলীয় জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। সেই সরকারের মেয়াদকাল উত্তীর্ণ হলে কেয়ারটেকার সরকার প্রধান কে হবেন এ ইস্যুতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ জোট তুমুল বিতর্ক-সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন। রাজপথ প্রকম্পিত হয় দুই জোটের দৈনন্দিন রাজনৈতিক অস্থির কর্মকাণ্ডে, যাতে ঝরে পড়ে অনেক রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক নাগরিকের লাশ।
সেই মুহূর্তে গণতান্ত্রিক যাত্রা বাধামুক্ত করতে পুনরায় দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয় বিদেশিদের। গণতন্ত্র রক্ষায় সাহায্যদানের অজুহাতে সামরিক নেতৃবৃন্দের যোগসাজশে দুই নেত্রীকে ধ্বংসের নীল নক্সা নিয়ে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা প্রবর্তন করা হয়। এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ১/১১-এর কালো অধ্যায় রচিত হয়। বাংলাদেশকে অরাজনীতিকরণে পলাশীর পদ্ধতিতে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ কার্যকর থাকে। কিন্তু আবারো জীবনবাজি রেখে রাজপথে নেমে পড়ে সাধারণ জনগণ, মুক্ত করে তাদের দুই প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে। শুরু হয় মহাজোটের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকারের চতুর্থ অধ্যায়, নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মহাজোট সরকার গঠন করে। তাদের চার বছরের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জনউন্নয়ন ও গণতন্ত্র ভাবনা তেমন গুরুত্ব পায়নি বলে বিশ্লেষকগণ পত্র-পত্রিকায় ও ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় মতামত ব্যক্ত করেছেন।
মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুসমূহের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী বিচার ও পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন খুবই স্পর্শকাতর। যুদ্ধাপরাধের ট্রাইব্যুনাল নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা পরামর্শ দেওয়া হলেও তা কর্ণপাত করেনি সরকার। অবশেষে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান স্কাইপে কেলেংকারিতে জড়িয়ে পদত্যাগ করে যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রক্রিয়াকে যেন বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছেন। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংকে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি শেয়ার বাজারের ধস, ব্যাংক কেলেংকারি, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতি, গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ইমেজ সংকট, পররাষ্ট্রনীতির নানা ব্যর্থতা, আইন-শৃংখলার অবনতি, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী রূপরেখা প্রণয়নে ব্যর্থতা সরকারকে গণতন্ত্রের বান্ধব মহল হিসেবে বিবেচনায় আনতে বাধা দিচ্ছে।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ১৮ দলীয় জোটের বিক্ষোভ- অবরোধ-হরতাল কর্মসূচির প্রতি সরকারের গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। সরকার ও বিরোধীদল উভয়ে অতীতের সকল শিক্ষা ভুলে গিয়ে নতুন করে নানা রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। হরতাল-অবরোধের গণতান্ত্রিক অধিকারের চৌহদ্দীর বাইরে গিয়ে বিরোধী জোট জ্বালাও-পোড়াও, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের তান্ডব চালাচ্ছে। আর সরকার তার পেটোয়া পুলিশ বাহিনী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের সাহায্যে এমনকি কিশোর-যুবক-তরুণ ছাত্র নেতা-কর্মীকে সহিংসতায় উসকিয়ে দেয়ার মত পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
গত ৯ তারিখে বিরোধী দলের অবরোধ দিবসে ওয়ারেছ আলী, মংলা প্রামাণিক ও বিশ্বজিত্ দাসের অকাল মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বিশ্বজিতের মৃত্যুর পেছনে যে নির্মম-নিষ্ঠুর রাজনৈতিক সহিংসতা প্রকাশ পেয়েছে তা খুবই ভয়ংকর। তার হত্যাকারীদেরকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে মিডিয়া চিহ্নিত করলেও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারি দল হত্যাকারীরা ছাত্রলীগ কর্মী নন বলে জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ হত্যাকারীদেরকে বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ কর্মী বলে অভিহিত করেছে।
গত ১৩ ডিসেম্বর একাধিক জাতীয় দৈনিকে খবর দেয়া হয়েছে যে, হত্যাকারীরা সবাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী এবং সংগঠনের নতুন কমিটিতে পদ পেতে গত ৬ ডিসেম্বর তাঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর সিভি জমা দিয়েছেন।
১০ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের গ্রেফতারের পর নতুন করে রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়েছে। বিরোধী জোটনেত্রীকে গ্রেপ্তারের হুমকিও সেই সহিংসতায় ঘৃত ঢেলে দিয়েছে। গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব বুঝি আবারো আমরা ছেড়ে দিচ্ছি বিদেশিদের উপর। মনে হচ্ছে গণতন্ত্রের নব বিকাশে বৈদেশিক সাহায্য আবারো অনিবার্য হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বাংলাদেশে সফররত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও ব্লেক বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুদলকে সংলাপের আহবান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে বাংলাদেশ ককাসের চেয়ারম্যান যোসেফ ক্রাউলিও আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জোর তাগিদ দিয়েছেন। দেশব্যাপী আতংকে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে তারাও রাজনৈতিক সংলাপের অনুরোধ জানিয়েছেন। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো গত ৬ ডিসেম্বর চারদিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন। গত ৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির দিন তার সফর শেষ হলে তিনি আমাদের রাজনৈতিক সহিংসতায় জাতিসংঘের নিন্দা জানান। তিনি সরকার, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সাথে নিবিড় সাক্ষাত্ করে রাজনৈতিক সংলাপের তাগিদ দেন। জার্মানী দূতাবাসের স্থপতি আনার উপর এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের গাড়ীর উপর হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানীও নিন্দা জানান।
এমতাবস্থায় পুরো জাতি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে আছেন, তারা সংলাপ প্রক্রিয়া আদৌ এগিয়ে নিতে আগ্রহী কি না, দু’নেত্রী এবং দু’দলের সংলাপ এখনি জরুরি, তা না হলে বাংলাদেশের আকাশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘন অমানিশা নেমে আসবে। অঙ্কুরেই ধ্বংস হবে আমাদের সকল গণতান্ত্রিক স্থাপনা। ঠিক সে মুহূর্তে আরেকটি পলাশীয় অধ্যায় সংযোজিত হবে, উন্মেষের সূতিকাগারেই বিনষ্ট হবে শিশু গণতন্ত্র। আমাদের গণতান্ত্রিক অর্জনের সকল শক্তি তালাবদ্ধ হবে বৈশ্বিক গণতন্ত্র-মোড়লদের বৈদেশিক সাহায্যের কাঠামোগত তালা-চক্র জালে (structural interlocking)। গণতন্ত্রের প্রতিরক্ষাা ছদ্মাবরণে বহিঃশক্তির অন্তর্ভুক্তি ও আবির্ভাব আমাদের গণতন্ত্র— যাত্রায় আরেকটি ১/১১ যুক্ত করে এমন অনতিক্রম্য বাধার- বিন্ধ্যাচল স্থাপন করবে। যা প্রতিহত করার শেষ শক্তিটুকুও ততক্ষণে নিঃশেষিত হবে। তার আগেই সংলাপের প্রক্রিয়ায় আন্তরিক হতে হবে সকলকে। এ দায়িত্ব সরকারের, বিরোধী দলের, সকল নাগরিকের।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
