ডিসেম্বর মাস। বিজয়ের মাস। মনে করিয়ে দেয় অনেক স্মৃতি। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে কত না ঘটনা। দুঃখ লাগে, মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়, যখন ভাবি এই সোনার বাংলাকে অর্জন করতে যেয়ে কত না লক্ষ পরিবার, কেউ হারিয়েছে স্বামী, কেউ হারিয়েছে সন্তান, কেউ হারিয়েছে মান-ইজ্জত। আবার কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আরো দুঃখ লাগে যখন কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাঙ্গিয়ে নানান সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে, আবার সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা, সত্যিকার যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এমন অনেক পরিবার আছে তারা নীরবে-নিভৃতে, দুঃখে, অভিমানে একমাত্র উপরওয়ালার কৃপা কামনা করছেন। তাদের অনেকের খবর আমাদের অজানা।
আমি মুক্তিযোদ্ধা নই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হয়ে দেখেছি ভাইকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে। দেখেছি বাবাকে পেছনে দু’হাত বেঁধে মিলিটারীরা ধরে নিয়ে গেছে। দেখেছি জঙ্গী বিমানের গর্জন, শুনেছি কামানের ভয়ঙ্কর কানে তালা লাগা আওয়াজ। দেখেছি উঠোনের মাঝে বড় নিমগাছটা তুলে ফেলে সেখানে ট্রেঞ্চ খোঁড়ার দৃশ্য। দেখেছি পিঠাপিঠি ছোট দু’ভাইয়ের গুলির আঘাতে হাতের আঙ্গুল উড়ে যাওয়া, আরেকজনের পেট ছিদ্র হয়ে ফিনকি দিয়ে রক্তে ভেসে যাওয়ার দৃশ্য। দেখেছি মাকে রাতভর চোখের জলে বুক ভাসাতে। আমি ছোট হলেও সব বুঝতে পারতাম। কষ্টে আমারও কান্না আসতো।
সেদিন তারিখ ছিল ১৫ ডিসেম্বর। শেষ বিকেলের তেজহীন রৌদ্র আস্তে আস্তে জানিয়ে দিচ্ছে বেলা শেষ। কিছুক্ষণ পর নামবে সন্ধ্যা। জানালার গ্রীল ধরে মাথাটা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অল্প বয়সের কিছু ছেলেপেলে স্লোগান দিচ্ছে: ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। মা দেখো, কি সাহস। সামনে মিলিটারী ক্যাম্প, আর কিনা বলছে জয় বাংলা, বাংলার জয়। কিছুক্ষণ পর বিষয়টা বুঝতে পারলাম, যখন দেখলাম বিজয়ের উল্লাসে সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে। আমরা স্বাধীন। সবাই বলাবলি করছে মিলিটারীরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়েছে ইত্যাদি অনেক কথা...। ক্যাম্পের ভিতর দু’টি বীভত্স লাশ পাওয়া যায়। কাছেই ছিল খেলার মাঠ। সেখানে লাশ দু’টি আনা হয়। স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যে কত অত্যাচার তাদের উপর করা হয়েছে। তার দু’দিন পরের ঘটনা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একাকি ভাবছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভাইয়া কোথায় আছে কে জানে। হঠাত্ চোখ পড়ে একটি লোক, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গায়ে চাদর, মাথার চুল এলোমেলো, ধূলায় ভরা, কাঁধে অস্ত্র। কোন কিছুর সন্ধান করছেন। তবে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না যে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কাছে এসে বললাম— কাকে চাচ্ছেন। চেনা যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে চিনতে পারলাম এ তো ভাই। আমার ভাই। মা দেখো কে এসেছে। সেটা ছিল গলা ফাটানো কান্নাজড়িত চিত্কার। যুদ্ধে যাওয়া ভাইকে আবার ফিরে পাব এ যে কত আনন্দের তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। মা ছেলেকে ফিরে পাবার সেই আনন্দাশ্রু যেন বাধ মানছিল না।
দেশ আজ স্বাধীন। বার বার ঘুরে-ফিরে আসে এই ডিসেম্বর— বিজয়ের মাস। কত ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে আমরা এই বিজয় পেয়েছি তা নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের তুলে ধরতে হবে। দেশকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতে হবে। শ্রদ্ধা জানাতে হবে সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের উদ্দাম সাহস ও অসীম বীরত্ব আমাদের এনে দিয়েছে এই বিজয়। আর এ দেশটির প্রতি যে মানুষটির ছিল অপরিসীম ভালবাসা, যিনি মিশে আছেন এর প্রতিটি ধূলিকণায়, যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের বদৌলতে অর্জিত হয়েছে একটি স্বাধীন দেশ। প্রিয় পাঠক, চলুন না সেই মৃত্যুঞ্জয়ী অমর মানব, স্বাধীন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি আর কামনা করি আল্লাহতায়ালা তাঁকে বেহেস্ত নসীব করুন। আর আমাদের এই দেশটি হোক শান্তির স্বর্গভূমি।
লেখক :ব্যাংকার
