পৃথিবীর প্রতিটি দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যমণি ও নেতৃত্বের পাদপীঠ হিসাবে কাজ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক ঘরানায় তাদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেয়ার সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান তেমন গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশেও এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাবে যুগ যুগ ধরে এরা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থেকে যাচ্ছে। এর বলয় থেকে বের হতে পারছে না। অথচ সমাজের সর্বক্ষেত্রে এদেরই অবদান সবচেয়ে বেশি। প্রকৃতপক্ষে এই অনুভূতি থেকেই নব্বই দশকের শেষদিকে বিশ্বব্যাংক সারা পৃথিবীব্যাপী এসএমই খাতের ব্যাপক উন্নয়নে জোর তাগিদ দিতে শুরু করে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্যাংকিং পেশার শুরু হয় বনিয়া-বণিক শ্রেণীর সুবিধা সংরক্ষণের জন্য। ফলে শহর বা নগরকে কেন্দ্র করে বণিক শ্রেণীর সুবিধার্থে এ পেশার প্রসার লাভ করতে থাকে। ব্রিটিশ ভারতে বাংলাদেশ নামক এ ভূ-অঞ্চলে তাই দেখি পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে উনিশশ পাঁচ সালে প্রথম স্থাপিত হয় বর্তমান স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কের উত্তরসূরীর একটি শাখা চট্টগ্রামে খোলার মাধ্যমে। এর পরে কর্ণফুলী-শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জল বহুদূর গড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ব্যবসায়ী সমাজের সুবিধার্থে নগর কেন্দ্রিক ব্যাংকিং খাতের প্রসার অব্যাহত থাকে।
বর্তমানে দেশে ৮১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৪টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৫টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক, ৯টি বিদেশি ব্যাংক, ৩০টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ৩টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডিজিএফআই। তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষুদ্র ঋণের কার্যক্রমে নিবেদিত রয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা ইত্যাদিসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য এনজিও যারা দারিদ্র্য বিমোচনে বিভিন্ন ধরনের প্রচারের কাজ করে যাচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় যে, উপরোল্লিখিত প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান প্রধানত গ্রাম পর্যায়ে কৃষিঋণ ও অকৃষি ঋণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছে। এতটুকু বলার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমরা যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীভুক্ত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর কথা বলি তাদের জন্য বিশেষায়িত কোন প্রতিষ্ঠান এখনও পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাবে এদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম বার বার মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হলে এরা সঠিকভাবে ঋণ সহায়তা বা পরামর্শ পায় না। কারণ সংগত কারণে ব্যাংকগুলো বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। ছোট ও মাঝারি ধরনের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর প্রতি এদের ঝোঁক বা আগ্রহ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। এরা এ খাতে ঋণ প্রদান অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে। এছাড়াও এ খাতে ঋণ দিয়ে আদায়ের যে সার্বক্ষণিক তদারকি ও ব্যবস্থা কাঠামোর যে বিধিবিধান থাকা প্রয়োজন তা বলতে গেলে কোন ব্যাংকেই সঠিকভাবে নেই। ফলে সনাতন ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের এ জাতীয় ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করার প্রচেষ্টা থাকলেও অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে তা ব্যর্থ হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এসএমই ফাইন্যান্সের মতো অধিকতর সুপারভাইজারি কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। যার ফলে ঋণ বিতরণ বা আদায় প্রক্রিয়ায় কোন কোন ব্যাংক নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামোর বাইরে চুক্তি বা কমিশনভিত্তিক কিছু কিছু ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ প্রদান করলেও সেক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ঋণ পাচ্ছে না। আবার অনেকক্ষেত্রে প্রদত্ত ঋণ মূল ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহূত না হয়ে অন্যত্র ব্যবহারও হয়ে যাচ্ছে ঋণ ব্যবস্থাপনার সঠিক কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। এতে এই ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অফিসার/ম্যানেজারদের ওপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে ঋণ আদায়ের জন্য মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে এরা এ কাজে মনোবল অটুট রাখতে পারছে না। আবার অনেককে এর জন্য প্রশাসনিক দণ্ডও পেতে হচ্ছে। একবার প্রশাসনিক দণ্ড পেলে দ্বিতীয়বার এদেরকে একই কাজে নেয়া খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়; কারণ কথায় বলে 'once beaten, twice shy" এটি একটি কঠিন বাস্তবতা। উপরোল্লিখিত কারণে আমাদের চিরাচরিত ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোতে এসএমই ঋণ কার্যক্রম আশানুরূপভাবে এগুচ্ছে না। প্রচার যাই হোক না কেন, মনে রাখতে হবে এক্ষেত্রে ঋণ বিতরণই মূল কথা নয়। মূল কথা হচ্ছে বিতরণের পর উহার সঠিক ব্যবহার ও আদায় নিশ্চিত করা। এসব কারণে ব্যাংকের প্রতিভাবান ও মেধাবী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এ বিভাগে কাজ করে তাদের কেরিয়ার গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছে না। একবার পোস্টিং দিলেও বিভিন্নভাবে তয়-তদ্বির করে অন্যত্র বদলির জন্য ব্যস্ত থাকে বেশি। এসব কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণ ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, তথ্য প্রযুক্তি, হিসাব বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগের মতো এসএমই বিভাগে দক্ষ ও চৌকষ কর্মকর্তা খুব চোখে পড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মানসিকতাসম্পন্ন পুরুষ ও মহিলা অফিসারদের এ বিভাগে আকৃষ্ট করা মস্তবড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় জোর করে বা বাধ্যবাধকতা আরোপ করে এবং উপর থেকে চাপ সৃষ্টি করে কাজ করাতে গিয়ে পুরো কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ‘You May take the horse to water, but Cannot make it drink'.
প্রশ্ন হচ্ছে, তা হলে করনীয় কী? আমি মনে করি আমরা যদি সত্যিকার অর্থে এসএমই খাতের উন্নয়নে আন্তরিক হই এবং এ খাতকে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসাবে গ্রহণ করি তাহলে দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে এসএমই উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ ধরনের ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থাকবে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় শহরে। সেখান থেকে তারা প্রতিটি জেলা, উপজেলাসহ ইউনিয়ন পর্যায়ে সকল ঋণ কার্যক্রমের সার্বিক তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিচালনা করবেন। উল্লেখ্য যে, ব্যাংকটির ঋণ কার্যক্রম হবে প্রধানত তদারকিভিত্তিক। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঋণগ্রহীতার পুরো ঋণ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকবেন এক বা একাধিক অফিসার/সুপারভাইজার। ঋণ বিতরণের জন্য যেসব খাত/ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হবে তাদের ঋণ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই, ঋণ বিতরণ তদারকি ও আদায়ের সার্বিক দায়িত্ব নির্দিষ্ট অফিসার বা গ্রুপের ওপর থাকবে। তাদের প্রধান কাজ হবে ঋণ বিতরণের পর ঋণ গ্রহীতার সাথে নিবিড় ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও বিভিন্ন উপাদান (input) সরবরাহ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করা এবং প্রদত্ত ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে কিনা তা সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করা, যা সনাতন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোন ব্যাংকই কখনও সঠিকভাবে করতে পারছে না। ফলে এই ক্ষেত্রে ওই সব ব্যাংকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নিবিড় তদারকি ঋণ ব্যবস্থায় কখনও হতে পারবে না। প্রস্তাবিত এসএমই ব্যাংক-কে এই মডেল ধরেই কাজ করতে হবে। সুষ্ঠু তদারকি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক ইত্যাদি যদি ৯৭ শতাংশ ঋণ আদায় ও স্থানীয়ভাবে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে পারে, এ ক্ষেত্রে এসএমই ব্যাংক না পারার কোন কারণ দেখছি না।
লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সনাতন ব্যাংকিং ব্যবস্থার লোকজনকে প্রাধান্য দেওয়া সমীচীন হবে না। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে সনাতন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লোকজন এ জাতীয় ব্যাংকে যোগদান করবে প্রধানত চাকরি করার মানসিকতা নিয়ে, কিন্তু এ জাতীয় বিশেষায়িত ব্যাংকের অফিসারদের কাজ করতে হবে চাকরির চেয়ে আরো অনেক বেশিকিছু করার। সুতরাং তাদের চাকরি ও পেশার ঘনিষ্ঠ সংযুক্তি না থাকলে তাদের কাছ থেকে কখনোই আশানরূপ ফল পাওয়া যাবে না। ফলে শুরুতেই ব্যাংকটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে অধিকতর সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী ও অন্য নির্বাহীদের ব্যাংকিং পেশা থেকে নিয়োগ অধিকতর বাঞ্ছনীয় হবে। পেশাদার ব্যাংকার ও অন্য পেশার দক্ষ লোকজনের সুসম সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাংকটিতে প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর মিলনমেলার আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক হারে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ক্লাসটার এলাকা চিহ্নিত করে ওই পেশায় নিয়োজিত কর্মজীবী ও পেশাদারদের ব্যাংকটির ঋণ কার্যক্রমে সঠিকভাবে ইন্টিগ্রেট করতে হবে। যাতে ব্যাংকটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ জাতীয় বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাশ্রেণী গড়ে উঠে দেশে কর্মচাঞ্চল্যের নতুন স্বর্ণদ্বার খুলে দেবে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষায়িত ক্লাসটার (Claster) এরিয়া রয়েছে। এগুলোকে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের কোর এ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের জন্য বিশেষ এরিয়া এ্যাপ্রোচ প্লান (Area approach plan) নেওয়া যেতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা জীবনসংগ্রামে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিটির কাছে ঋণ ও অন্যান্য ইনপুট পৌঁছাতে পারলে এরা জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে পারবে।
রিজিওন্যাল এসএমই ব্যাংক করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অতিকায় বড় ধাঁচের একটি ব্যাংক না করে রিজিওন বা বিভাগভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হলে ব্যাংকটির ঋণ গ্রহীতা নির্বাচন, বিতরণ, নিবিড় তদারকি ও আদায় কার্যক্রম দক্ষ ও সুস্থভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে ‘small is beautiful, big is not always better.’ এ নীতি সামনে রেখেই এসএমই ব্যাংকের পথচলা শুরু করতে হবে। যেহেতু ব্যাংকগুলো রিজিওন্যালভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত হবে, তাদের পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে পরিচালিত অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের মতো বড় অংকের না করে প্রাথমিক অবস্থায় দুইশত কোটি টাকা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। এ ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেবল বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক, আইসিবি, ডিএফআই, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন, জীবন বীমা কর্পোরেশন, সাধারণ ও লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠিত এনজিও, গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক, লব্ধপ্রতিষ্ঠিত বেসরকারি শিল্প গোষ্ঠী, স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান, প্রবাসী বাংলাদেশিসহ খোদ বাংলাদেশ সরকার পিপিপি প্রকল্পের আওতায় এর অন্যতম উদ্যোক্তা হতে পারবে। শুরুতে অংশিদারিত্বে ৫০ঃ৫০ বেসিসে করা যেতে পারে। পরবর্তীতে সরকার পর্যায়ক্রমে তার সেবার অংশ অফলোড করতে পারে। অন্যান্য ব্যাংকের মতোই তারা বিভিন্ন মেয়াদী আমানত সংগ্রহসহ সকল ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে লক্ষ্য থাকবে একটাই - এসএমই কার্যক্রম বেগবান করা। আমানত সংগ্রহ উত্সাহিত করার জন্য অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ে এক শতাংশ অধিক হারে রক্ষিত আমানতের উপর সুদ প্রদান করতে পারবে। মর্মে বিধান থাকতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করার প্রথম পাঁচ বছর এদের কাছে রক্ষিত সঞ্চয়ী ও মেয়াদি আমানতের সুদের ওপর থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অন্যান্য ব্যাংকের ন্যায় বর্তমানে প্রচলিত আয়কর কর্তন থেকে বিরত থাকবে। অর্থাত্ প্রথম পাঁচ বছর তাদেরকে সঞ্চয়ী সুদের ওপর আয়কর কর্তন হতে অব্যাহতি দিতে হবে যাতে ব্যাংকটি অধিক হারে আমানত আহরণ করে দ্রুত নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে। যেহেতু এ জাতীয় ব্যাংকের কার্যক্রম অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ে অধিকতর ক্ষুদ্রাকার ও অনেক বেশি সীমিত তাদের আয়কর বর্তমানে প্রচলিত অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো ৪২.৫% না করে ৩৫% করা যুক্তিসংগত হবে।
প্রস্তাবিত এসএম ই ব্যাংকের একটি বড় ইতিবাচক দিক হচ্ছে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত আমানত তারা প্রধানত স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের ঋণ কার্যক্রমে বিনিয়োগ করবে। এতে গ্রাম থেকে রাজধানীতে মুদ্রা ট্রান্সফার বন্ধ হয়ে সম্পদের সুষম বন্টনের একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করতে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাম ও শহর থেকে সঞ্চয় উজাড় করে রাজধানীতে বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে গ্রাম ও শহরকে ফোকলা করা হচ্ছে। এতে গ্রাম, শহর ও রাজধাীর মধ্যে সম্পদের ভারসাম্যহীনতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থার দ্রুত অবসান দরকার।
বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে এসইডিএফ (SEDF) বাংলাদেশের এসএমই খাতের ওপর ২০০৬ সালে একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করেছিল। এতে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় ষাট লক্ষ এসএম ই প্রতিষ্ঠান তারা চিহ্নিত করে। সনাতন ব্যবস্থা থেকে ঋণ পেতে তাদের বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার বিচিত্র অভিজ্ঞতা জরিপে ফুটে উঠেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মধ্যম শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের জন্য এসএমই ব্যাংক একটি বড় ধরনের সহায়ক শক্তি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ নারী উদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রায় শতভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীভুক্ত। এ জাতীয় বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড অধিকতর বেগবান করা যাবে বলে আশা করা যায়। ২০০৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এস এম ই খাত অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। উন্নত বিশ্বেও এই খাত তাদের জিডিপির (GDP) প্রায় ৫৫% যোগান দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ খাত তাদের কর্মসংস্থানের প্রায় ৬৫ শতাংশের অংশীদার। অন্যান্য কম আয় তালিকাভুক্ত দেশগুলোতে এস এম ই খাত জিডিপির প্রায় ৬০% এবং কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০% যোগান দিচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এস এম ই খাত জিডিপির প্রায় ৭০% এবং কর্মসংস্থানের ৯০% অবদান রাখছে। গত কয়েক যুগ ধরে দেশগুলোর সার্বিক অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।
উল্লেখ্য যে, চীনের অর্থনীতিতে এস এম ই খাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চীনের জিডিপির প্রায় ৬০% যোগান দিচ্ছে এই খাত। এ ছাড়া তাদের আয়ের প্রায় ৪০% কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪% সেলস্ এর ৭১% এবং রপ্তানির প্রায় ৬০% আসছে এই দ্রুত উন্নয়নশীল খাত থেকে। একইভাবে কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ফিলিপিনস্ প্রভৃতি দেশে এ খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
২০০৬ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে এস এম ই খাতের ভূমিকা আরও ব্যাপক। দেখা গেছে যে, ভারতে শিল্পের প্রায় ৯০% জুড়ে আছে এই খাত। শুধু তাই নয়, তাদের শিল্পপণ্য উত্পাদনের প্রায় ৪০% ও রপ্তানির প্রায় ৪৫% দখল করে আছে এই খাত। বিশ্ববিখ্যাত টয়োটা কোম্পানী তাদের ২২টি আইটেম-এর মধ্যে মাত্র ১২টি নিজেরা উত্পাদন করে থাকে। অবশিষ্ট ১০টি সাব-কনট্রাকটিং পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ও মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতায় এস এম ই’র মাধ্যমে করে থাকে। বাংলাদেশেও শিল্পের প্রায় ৯৫% দখল করে আছে এস এম ই খাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই সম্ভাবনাময় খাতের পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নয়নের জন্য স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও আমরা এর জন্য পৃথক কোনও ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। যা কিছু করা হয়েছে, তা সেই চিরাচরিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে করা হয়েছে। এ খাতের উন্নয়নে কথার ফুলঝুরি ছড়ালেও প্রকৃতপক্ষে খাতটি রয়ে গেছে ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত। বলতে দ্বিধা নেই যে, জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা বিবেচনা করেই ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপিন্স-এ এসএমই খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশে এসএমই ফাউন্ডেশন-এর মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে তা রীতিমতো হাস্যকর। এতোবড় একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতের কার্যক্রম কি একটি ফাউন্ডেশন দিয়ে চলতে পারে?
সর্বশেষে বলতে চাই যে, সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারণী মহলকে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা বিবেচনায় রেখে উপরোক্ত প্রস্তাবটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। আশা করবো আগামী বাজেটে ২০১২-২০১৩ প্রণয়নের সময় সরকার এর জন্য একটি রূপপ্রকল্প তৈরি করে আগামী বছর থেকেই এর প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারে। তবেই শুধু ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের ধাক্কা বা পুশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এ জাতীয় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ও বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বৃত্তি, কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণ এবং এসব পেশায় নিয়োজিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে। ফলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যদিকে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করে দেশের বিরাজমান ভিসিয়াস সাইকেল (vicious cycle)-এর ব্যুহ ভেদ করে একটি ভারচ্যুয়াস সাইকেল (virtuous cycle)-এর সিঁড়ি তৈরি করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায় আমাদের বর্তমান মাথাপিছু আয় ৮৫০ ডলার থেকে ২০২১ সালে ২০০০ ডলারে উন্নীত করে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা মোটেই কঠিন কোন কাজ হবে না।
লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক
