ভর্তি বিড়ম্বনা

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৯
রাজধানীর স্কুলগুলিতে ভর্তিযুদ্ধ যে এক কদর্য রূপ নিয়াছে তাহার নিদর্শন দেখা গিয়াছে রবিবার ভিকারুন নিসা নূন স্কুলে। একদল লোক অধ্যক্ষের হাতে একটি তালিকা ধরাইয়া দিয়া নির্দেশ দেয়, ঐ তালিকা অনুযায়ী ছাত্রী ভর্তি করাইতে হইবে। উহা ছিল শিক্ষার্থীদের সহোদরা কোটার একটি তালিকা, যাহা অভিভাবক ফোরাম নামক এক সংগঠনের পক্ষ হইতে দেওয়া হয়। এই দলে ছাত্রলীগের সদস্যরাও আছে বলিয়া দাবি করা হয়। তালিকা অনুযায়ী ভর্তি না করা হইলে স্কুলে তালা ঝুলাইয়া দেওয়া হইবে এবং শিক্ষকদের বেতন বন্ধ হইয়া যাইবে বলিয়া হুমকিও দেওয়া হয়। ৩০-৩৫ জনের ঐ দল হইতে দাবি জানানো হয়, ইতোমধ্যে অধ্যয়নরত ছাত্রীদের বোনদের ভর্তির যেই কোটা, তাহা শতকরা ১০ ভাগ হইতে বাড়াইয়া শতভাগ করিতে হইবে। স্কুল কর্তৃপক্ষের দিক হইতে জানা গিয়াছে, স্কুলটিতে প্রথম শ্রেণীতে মোট আসন রহিয়াছে এক হাজার ৪৮৪টি। এই বত্সর সোহদরা কোটায় লটারিতে অংশ নিবে ৭৮১ জন। এখন দাবি ও হুমকি প্রদানকারীদের তালিকা অনুয়ায়ী সকলকে ভর্তি করাইতে গেলে বাকিদের সুযোগ সামান্যই থাকিবে। গতবার সহোদরা কোটা ছিল তিন শতাংশ। এইবার তাহা ১০ শতাংশে উন্নীত করাইবার পরও শতভাগের দাবি আসিয়াছে। অভিভাবকদের এই দাবি নিশ্চিতভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত নহে। দাবি-দাওয়ার বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। কিন্তু দল বাঁধিয়া স্কুলপ্রাঙ্গণে অনুপ্রবেশ করিয়া, তালিকা ধরাইয়া দিয়া হুমকি দেওয়ার আচরণটি মানিয়া লওয়া যায় না। অভিভাবক ফোরামে ছাত্রলীগকে সঙ্গে রাখিবার কিংবা সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নাম ভাঙ্গাইবার অর্থ কী? প্রভাবশালীদের দাপটে কি স্কুল কর্তৃপক্ষের ভর্তি প্রক্রিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত লইবার ন্যূনতম ক্ষমতাও থাকিবে না? ইহার পিছনে কি তথাকথিত ভর্তি বাণিজ্য কিংবা দুর্নীতি নাই? তথাকথিত নামী স্কুলগুলিতে ভর্তির নামে চলিতেছে তুঘলকী কাণ্ড। স্কুল কর্তৃপক্ষও ধোয়া তুলসিপাতা নহে। কয়েকদিন আগেই ২০১২ সালের ভর্তির সময় গৃহীত অতিরিক্ত ফি বেতনের সঙ্গে সমন্বয় না করিবার ফলে নামকরা তিনটি স্কুলের অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিত করিয়াছে সরকার, যাহার মধ্যে ভিকারুন নিসাও রহিয়াছে। কিন্তু ভর্তি প্রক্রিয়াটি কীরূপ হইবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত লইবার চূড়ান্ত ক্ষমতা অবশ্যই স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে থাকিবে। অভিভাবক ফোরামের নামে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইয়া ছাত্রীভর্তির পাঁয়তারা ভয়ঙ্কর এক চর্চা। স্কুলটির উদ্বিগ্ন শিক্ষকদের সাধারণ ডায়রি করিবার পরে ইহার একটি সমাধান হইবে, এমনটি আশা করা যায়। স্পষ্টতই, প্রচণ্ড চাহিদার মুখে অভিভাবক ফোরামের দাবিটি অন্যায্য। যদি স্কুলটিতে ভর্তিচ্ছুদের অত্যধিক চাপ না থাকিতো তাহা হইলে ফোরামের দাবিটি ইতিবাচকভাবে দেখিবার সুযোগ থাকিতো। এই সকল তুলকালাম কাণ্ড ঘটিতেছে অল্প কয়েকটি স্কুলকে ঘিরিয়া। তথাকথিত ‘ভালো স্কুল’ এবং ‘মন্দ স্কুল’-এর পার্থক্য আজকাল অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। ফলে অভিভাবকদের চাহিদা এবং প্রত্যাশা কেন্দ্রীভূত হইতেছে কয়েকটি মাত্র স্কুলে। সরকারের এখন উদ্যোগ নেওয়ার সময় আসিয়াছে স্কুলগুলির মধ্যকার পার্থক্য কমাইয়া আনিবার। বেসরকারি স্কুলগুলিও যেহেতু সরকারের এমপিও গ্রহণ করিয়া থাকে, অতএব সকল স্কুলকে একটি নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ভালো স্কুল হইতে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গকে বা অধ্যক্ষকে অপেক্ষাকৃত মন্দ স্কুলে স্থানান্তর করানো যাইতে পারে। এমনকি শিক্ষক বিনিময়ও হইতে পারে। সর্বোপরি স্কুলসমূহের মানের পার্থক্য কমাইয়া আনিতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও নজরদারি স্থাপন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন