[ রা জ নী তি ]

বেশি কথা বলার রাজনীতি

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৯
এবার ষোলই ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার সাথে। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ দেশের সর্বত্রই অগণিত মানুষের সমাগম ঘটেছিল। উচ্ছ্বাস ও স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল লক্ষণীয়। বিকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিণত হয়েছিল এক কথায় জনসমুদ্রে। নানা বয়সের, নানা শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার মানুষ লাল-সবুজ পতাকা হাতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন জাতির সবচেয়ে গৌরবময় অর্জনের এই দিনটিতে। কোটি কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে—যারা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার তাগিদ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির ওপর যে বর্বরতা ও নৃশংসতা চালিয়েছে তা স্মরণ করে নানা ধরনের আয়োজন থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতার প্রতি ধিক্কার জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সমানভাবে ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাদের এদেশীয় সহচর-সহযোগী রাজাকার-আলবদরদের বিরুদ্ধেও। বিজয় দিবসের সব সভা-সমাবেশ-জমায়েত থেকেই একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করে বিচার কাজ শুরু করা হয়েছে, তাদের বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানানো হয়েছে। বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার যে-কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও উচ্চারিত হয়েছে সতর্কবার্তা। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে তাদের প্রতি কোনো ধরনের অনুকম্পা দেখানো যাবে না—সেটা এবার বিজয় দিবসে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন দেশবাসী। ঘাতক-দালালদের বিচারের প্রশ্নে দেশবাসীর মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি নেই, মতভেদ নেই। উেস বাংলাদেশের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে তিনদিনব্যাপী ‘বিজয়ে-পার্বণে’ উত্সবে বিভিন্ন আড্ডায় যেসব প্রতিভাবান তরুণের সমাবেশ ঘটেছিল, তারাও সবাই একবাক্যে, অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে, নতুন প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, এটা নিয়ে কোনো রাজনীতি তারা দেখতে বা মানতে চায় না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই, বিভ্রান্তি নেই। যারা নানা উছিলায় এই বিচার কাজ ব্যাহত করার কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করবে বা করছে, তরুণ সমাজের ঘৃণা ও ধিক্কার তাদের বিরুদ্ধেও। যারা বিচার কাজ এগিয়ে নেবে, সম্পন্ন করবে তাদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন নতুন প্রজন্মের। বিজয়ে-পার্বণে উত্সবস্থলে ‘প্রত্যাশার বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ মতামত দেয়ালে ঠাঁই পেয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন পেশার, বয়সের হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের আশার কথা, স্বপ্নের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন, এদের মধ্যে বেশিরভাগই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ অবিলম্বে শেষ করে জাতিকে গ্লানিমুক্ত করার কথাই তুলেছেন। আগামী বিজয় দিবসের আগেই এই বিচার কাজ শেষ করার দাবিও তারা তুলে ধরেছেন। একাধিক সমাবেশ-আড্ডা-আলোচনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে বিএনপির ভূমিকার নিন্দা জানানো হয়েছে, সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের প্রতি বিএনপির নৈতিক সমর্থন জানানোর ঘটনার পর বিএনপির আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলে দাবি করার নৈতিক অধিকার আছে কি-না, প্রায় সবাই সে প্রশ্নও তুলেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা—এটা যদি সত্য হয় তাহলে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি? কারা ছিল তার প্রতিপক্ষ? শুধু পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনী, নাকি তাদের এ দেশীয় দোসররাও ছিল সে পক্ষে? মুক্তিযুদ্ধে তিনি যদি বিজয়ীপক্ষের একজন হয়ে থাকেন, তাহলে পরাজিত পক্ষে কারা ছিল? স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দেশকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করাকে অনুচিত মনে করে যারা সমালোচনা করেন, তাদের চরম সুবিধাবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধেও উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন অনেকেই। পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার না করে তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিচারের যারা সমালোচক, তারাও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, তাদের চিন্তা-ভাবনায়ও অস্বচ্ছতা রয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের অপরাধের চেয়ে বাঙালি কুলাঙ্গারদের অপরাধের মাত্রা যে কোনো অংশেই কম নয় সে কথাটা পরিষ্কার বোঝানোর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী নিজেই একটি ছোট্ট পোস্টার তৈরি করেছেন আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের বাণী উদ্ধৃত করে। জর্জ ওয়াশিংটন বলছেন: ‘ইংল্যান্ডের সৈন্যরা, যারা আমাদের হাতে ধরা পড়েছে, তারা যুদ্ধবন্দি; যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা ওপরঅলার নির্দেশে আমাদের দেশে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই দেশের মানুষ হয়ে যারা নিজেদের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, নিজেদের মা-বাবা, ভাই-বোনকে হত্যা করেছে, তারা দেশদ্রোহী, তারা যুদ্ধাপরাধী। এদের অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। যুদ্ধাপরাধীদের আমরা মহানুভবতা দেখিয়ে ছেড়ে দিতে পারি; কিন্তু এদের ছেড়ে দেয়া যাবে না। এদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য আমরা বুলেট খরচ করতেও রাজি নই। এদের গায়ে উত্তপ্ত আলকাতরা ঢেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে।’ আজ যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যারা বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার কথা বলেন, তারা আসলে মানবতার পক্ষে নয়, মানবতাবিরোধী ঘাতক-দালালদের পক্ষেই তাদের অবস্থান। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, যারা দেশপ্রেমিক, ৩০ লাখ শহীদ বীরের প্রতি যাদের সামান্য শ্রদ্ধা আছে তারা কখনোই, কোনোভাবেই ঘাতক-দালাল যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ অবলম্বন করতে পারেন না, তাদের বিচার কাজ কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করতে পারেন না। আশা করা হয়েছিল এবার বিজয় দিবসের আগেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় ঘোষণা শুরু হবে। জামায়াতের ওয়াজী নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে। শোনা যাচ্ছিল, অন্তত সাঈদীর রায় ঘোষণা হবে ষোল ডিসেম্বরের মধ্যেই। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটেছে একটি দুঃখজনক ঘটনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এক-এর প্রধান বিচারক নিজামুল হক স্কাইপে বিতর্কে জড়িয়ে পদত্যাগ করেছেন। সরকার দ্রুততার সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত করেছে। এই ঘটনায় বিচার কাজ নিঃসন্দেহে অল্প সময়ের জন্য হলেও ব্যাহত হয়েছে। দেশের মানুষ হয়েছেন আশাহত। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিজয় দিবসে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী বিজয় দিবসের আগেই বিচারের রায় দেয়া সম্ভব হবে। তার এই বক্তব্য অনেককেই কিছুটা আশাহত করেছে। কেন আগামী বিজয় দিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? একজন বিচারকের পদত্যাগের কারণে বিচার থেমে থাকতে পারে না, যেখানে তিনি শেষ করেছেন, সেখান থেকেই শুরু হবে। অবশ্য সৈয়দ আশরাফ এ নিশ্চয়তা দেন যে, রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা হবে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মুখ থেকে একেক সময় একেক কথা শুনে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আমরা আশা করবো, যারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, তারা কথা কম বলবেন, কাজটা বেশি করবেন। যারা কথা বলবেন, তারা ভেবে-চিন্তে বলবেন, নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে নিয়ে বলবেন। টিভি ক্যামেরা দেখলেই মুখ যদি নিশপিশ করতে থাকে, তাহলে চুইংগাম পুরে নেবেন। তবু দয়া করে আগ বাড়িয়ে কথা বলে প্রতিপক্ষের জন্য সুবিধা করে দেবেন না। মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। যারা এই বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত, প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা বিলম্বিত বা প্রলম্বিত করার জন্য দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র করছে, দেদার টাকা ছড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করুন, ধরুন। তাদেরও আইনের হাতে সোপর্দ করার জন্য যা যা করা দরকার সেসব করুন, শুধু শুধু কথা বলে মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবেন না প্লিজ। ষড়যন্ত্রকারীদের স্বরূপ উন্মোচন করুন। নিজেরা নতুন করে রহস্য তৈরি করবেন না, রহস্য ভেদ করতে সচেষ্ট থাকুন। গত ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দেশে দীর্ঘদিন পর একটি ‘ব্যতিক্রমী’ হরতাল পালিত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দল নিষিদ্ধ করা, আশুলিয়ার তাজরীন পোশাক কারখানায় আগুন লাগার ঘটনায় মালিকসহ দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও শাস্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে এই হরতাল আহ্বান করেছিল সিপিবি-বাসদ এবং বাম মোর্চা। যেসব দাবিতে হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল, সেসব দাবির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও হরতালের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনেকেই মনে করেন, দেশের অর্থনীতি আর কোনো ন্যায্য দাবিতেও হরতালের চাপ সহ্য করতে পারছে না। হরতাল আহ্বান করা নিশ্চই গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু আমাদের দেশে এই অধিকারের এতই অপপ্রয়োগ হয়েছে যে, হরতালের কথা শুনলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে আশার কথা এটাই যে, সিপিবি-বাসদের হরতালে মানুষ আতঙ্কবোধ করেনি। কারণ হরতালের আগের রাতে এবং হরতালের দিন কোথাও কোনো গাড়ি ভাঙচুর করা হয়নি, আগুন দেয়া হয়নি, হয়নি কোনো ধরনের সহিংসতা। হরতাল আহ্বানকারীরা গান-বাজনা করে শান্তিপূর্ণ পিকেটিং করায় পুলিশও করেনি মারমুখী আচরণ। উস্কানি না দিলে পুলিশও যে লাঠি-গুলি প্রয়োগ করে না তাও প্রমাণ হলো। অথচ বিএনপি এবং জামায়াত বলেছে, এটা নাকি সরকার সমর্থিত হরতাল! বিএনপির এই প্রতিক্রিয়া শুনে একজন সচেতন নাগরিক মন্তব্য করেছেন, বিএনপি-জামায়াত তো এটা বলবেই, তারা তো ধ্বংসযজ্ঞ না চালিয়ে হরতাল করতে পারে না। শান্তিপূর্ণ হরতাল দেখে তাদের গায়ে তো জ্বালা ধরারই কথা। এরপর তারা হরতাল ডেকে জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর করতে গেলে তাদের প্রতি মানুষের ধিক্কারের মাত্রাও বাড়বে। যারা হরতাল চান না, সমর্থন করেন না, তারাও সিপিবি-বাসদকে সাধুবাদ জানাবেন এইজন্য যে, তারা প্রমাণ করলেন এভাবেও হরতাল করা যায়। হরতাল যে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি—এটাও বোধ হয় প্রমাণ করা প্রয়োজন ছিল। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন