পটুয়াখালী-ঢাকা রুটে লঞ্চ ধর্মঘট

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৪
লঞ্চ মালিক সমিতির ডাকা ধর্মঘটের কারণে গত সাতদিন ধরিয়া পটুয়াখালী-ঢাকা রুটে লঞ্চ চলিতেছে না। এই সময়ে পটুয়াখালী হইতে কোনো লঞ্চ ঢাকা আসে নাই। একইভাবে ঢাকা হইতেও পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে নাই কোনো লঞ্চ। ফলে উভয়প্রান্তের যাত্রীসাধারণকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাইতে হইয়াছে। ব্যাহত হইয়াছে অত্যাবশ্যক পণ্য পরিবহন। ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু কেন এই ধর্মঘট? আর কেনইবা জনগণের এই ভোগান্তি? ইহা অনস্বীকার্য যে, এই সবকিছুর মূলে রহিয়াছে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। গত বুধবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, সুন্দরবন-৬ নামক একটি লঞ্চের সুপারভাইজারের নিকট একদল সন্ত্রাসী ঘাট সুপারভাইজিংয়ের টাকা দাবি করিয়াছিল। তাহাদের এই অন্যায় দাবি মানিয়া লইতে অস্বীকৃতি জানাইলে তাহারা উক্ত সুপারভাইজারকে বেদম প্রহার করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতারের দাবিতে লঞ্চ মালিক সমিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য এই রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করিয়া দেয়। লঞ্চ বন্ধ থাকিলে যেমন যাত্রীদের ভোগান্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়, তেমনি লঞ্চ মালিকদের ক্ষতির পরিমাণও কোনো অংশে কম নহে। অতএব, ইহা বোধগম্য যে, পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া না গেলে কোনো মালিকই একদিনের জন্যও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করিতে সম্মত হইবেন না। কিন্তু দীর্ঘ এক সপ্তাহেও সমস্যাটির সমাধান কেন হইল না তাহা আমাদের একেবারেই বোধগম্য নহে। যতো অজুহাতই দেখানো হউক না কেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন ইহার দায় এড়াইতে পারিবেন না। পটুয়াখালী নদী বন্দরের একজন কর্মকর্তা অবশ্য ইত্তেফাককে জানাইয়াছেন যে, বিষয়টি লইয়া তাহারা বৈঠক করিয়াছেন। সেই বৈঠকে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক হইতে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়া ধর্মঘট প্রত্যাহারের অনুরোধও জানানো হইয়াছিল লঞ্চ মালিক সমিতিকে। কিন্তু তাহারা সাড়া দেন নাই। মালিক সমিতি স্পষ্টভাবে জানাইয়া দিয়াছে যে, লঞ্চ সুপারভাইজারকে মারধরের ঘটনার সহিত জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকিবে। প্রশাসনের আশ্বাসের উপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা স্থাপন করা গেলে লঞ্চ মালিকদের এই অনমনীয় মনোভাবকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা যাইত। কিন্তু বাস্তবতা যে তাহা নহে— কথাটি অপ্রিয় হইলেও সত্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুর্বৃত্তদের ক্রমবর্ধমান দাপটের বিপরীতে ক্রমেই গৌণ হইয়া পড়িতেছে প্রশাসনের ভূমিকা। ইহাকে প্রশাসনের উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা কিংবা অসহায়তা— যাহাই বলা হউক না কেন এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। পটুয়াখালী-ঢাকা রুটে লঞ্চ ধর্মঘটই ইহার একমাত্র উদাহরণ নহে। দেশের সর্বত্রই প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সরবে বা নীরবে চাঁদাবাজি ও জোরজবরদস্তির ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে প্রতিনিয়ত। সত্যমিথ্যা যাহাই হউক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হইতেছে ক্ষমতাসীন দলের নাম। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, এইসব ক্ষেত্রে আইনও তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতেছে না। ফলে চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা ক্রমেই আরও বেপরোয়া হইয়া উঠিতেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মুখ বুঁজিয়া তাহা সহ্য করিতেছেন। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাছিয়া নেওয়া হইতেছে ধর্মঘট কিংবা পাল্টা সহিংসতার মতো চরম পন্থা। পরিহাসের বিষয় হইল, উভয় ক্ষেত্রেই ইহার কুফল ভোগ করিতে হইতেছে সাধারণ মানুষকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্ষমতার মদদপুষ্ট গুটিকয় ব্যক্তির দাপটের নিকট অতীতেও জনগণ জিম্মি হইয়া ছিল। এখনও আছে। সরকার বদল হইতেছে। কিন্তু অবস্থা বদলাইতেছে না। এখন নীতিনির্ধারক মহলকেই ইহা সাব্যস্ত করিতে হইবে যে, তাহারা কাহার পক্ষাবলম্বন করিবেন— গুটিকয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির না কি আপামর জনগণের?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন