[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক সহিংসতা এবং উত্তরণের উপায়

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৫
মহাত্মা গান্ধী ৭টি সামাজিক পাপ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হল: নীতিহীন রাজনীতি, চরিত্রহীন শিক্ষা, মানবতাবিহীন বিজ্ঞান, নৈতিকতাহীন বাণিজ্য, শ্রমহীন সম্পদ, বিবেকবর্জিত আনন্দ এবং ত্যাগহীন অর্চনা প্রার্থনা। এ সব গুণ দ্বারা যদি আমরা বাংলাদেশের সমাজকে বিশ্লেষণ করি তাহলে অবশ্যই স্বীকার করতে বাধ্য হবো যে, গোটা বাংলাদেশ সমাজে আমরা পাপের সমুদ্রে অবগাহন করছি। বাংলাদেশের নীতি-নৈতিকতাহীন ভোগবাদী রাজনীতি আজ আমাদের সর্বনাশা সংঘাতের প্রান্তসীমায় এনে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের চরিত্রহীন শিক্ষা আমাদের জন্য দুর্বৃত্ত তৈরি করছে। আমাদের বিজ্ঞান আমাদের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ বয়ে আনছে। আমাদের বাণিজ্য আমাদের জীবনকে বিষময় করে তুলছে। শ্রমহীন সম্পদের পাহাড় আমাদের জনজীবনে প্রতিদিন মৃত্যু উপহার দিচ্ছে। বিবেকবর্জিত আনন্দ পশুত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অর্চনা আমাদের প্রার্থনা আমাদের জন্য কোন মঙ্গল নিশ্চিত করছে না। জাহাজের ক্যাপ্টেন যেমন জাহাজের গতি নির্ধারণ করেন তেমনই আমাদের রাষ্ট্র নামক জাহাজের কান্ডারীরা রাষ্ট্রকে যথার্থ পথে পরিচালিত করছে না। ইংরেজীতে প্রবাদটা এরকম: A stateman thinks for the next generation, a politician thinks for the next election. আমাদের গোটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য যে, সাম্প্রতিক সময়ের ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করলে ঐ প্রবাদের প্রতিফলনই দেখতে পাব। জনজীবনের এ দুর্ভোগ নিয়ে আমাদের পলিটিক্যাল এলিটদের মাথাব্যথা নাই। তাদের মাথাব্যথা ক্ষমতায় থাকা না থাকা নিয়ে। আমাদের রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, জাতীয় স্বার্থের চেয়েও বেশি ব্যাকুল নিজ স্বার্থ সুবিধা নিশ্চিত করতে। পাওয়ার পলিটিক্স বা ক্ষমতার রাজনীতি হচ্ছে তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ক্ষমতার মোহ তাদের এতটাই ব্যতিব্যস্ত করে তোলে যে, ন্যায়-অন্যায়, আইন-কানুন, রীতি- রেওয়াজ, ভদ্রতা-সভ্যতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি কোনটারই তোয়াক্কা করেন না। ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় এক ধরনের অবস্থান, ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে আর এক ধরনের অবস্থান। উদাহরণ স্বরূপ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা বলা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত যৌথ আন্দোলন করে এবং ১৭২টি হরতাল পালন করে। তত্কালীন সরকার এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা কোনমতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিতে চাননি। আন্দোলনের তীব্রতা তাদের বাধ্য করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিতে। ভালই চলছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে স্থূল এবং সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ থাকলেও সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্যতার কারণে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু কি কারণে প্রতিষ্ঠিত, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ অবস্থা বাতিল করা হল? গ্রামে ছোট্ট সময় দেখেছি হারুপার্টি হাডুডু মাঠে ব্লেড পুঁতে রাখতো, ফুটবল খেলায় ফাউল খেলে নিছক গায়ের জোরে জিততে চাইতো। হাস্যকর হলেও সত্য জাতীয় ক্ষমতার খেলওয়াড়রা যখন বুঝতে পেরেছেন ফেয়ার প্লে বা স্বচ্ছ খেলা হলে তাদের জেতার কোন সম্ভাবনা নেই, তখনই তারা রুলস অফ গেমস-এ পরিবর্তন আনলেন। এখন বিরোধীরা তাদের ভবিষ্যত্ ক্ষমতায় যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে দেখে আন্দোলন করছেন। আন্দোলন অবরোধ হরতালে তীব্রতা যদি এতটা কঠিন না হয় যে, সরকার এটি পুনঃপ্রবর্তনে বাধ্য হবেন তখন পর্যন্ত তারা তা করবেন না। অর্থাত্ তারা শক্তির কাছে, চাপের কাছে, আন্দোলনের কাছে, নতি স্বীকার করবেন, যুক্তির কাছে নয়। এটা কেমন কথা? যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামে বিভিন্ন রণকৌশল অবলম্বন করতে হয়। টু স্টেপ ফরোয়ার্ড ওয়ান স্টেপ ব্যাকোয়ার্ড এই নীতিকৌশল রাজনীতিরই কথা। আন্দোলন করা হয় আপোষের জন্য। আর সংলাপ বা ডায়লগ এই আপোষের অংশবিশেষ। এবারে বিরোধী পক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের সূচনাতেই বলেছে সরকার নীতিগতভাবে বিষয়টি মেনে নেয়ার পর যে কোন জায়গায় যে কোন সময়ে আলোচনায় প্রস্তুত। এমনকি অব্যাহত সংসদবর্জনরত বিরোধী দল বলেছে, নীতিগত সম্মতির পর তারা সংসদে যোগদান করতেও রাজি। বিরোধী নেত্রী এ কথাও বলেছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামটি যদি সরকারের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয় তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন বা যে কোন নামেই ঐ ব্যবস্থা মেনে নিতে তারা সম্মত। অপরদিকে বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার পরিবর্তে সরকার শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলন-দমন, নিপীড়ন-নির্যাতন, হামলা-মামলা যে কোন আন্দোলনকে অবদমন করতে পারে না আমাদের ইতিহাসই তো তার সাক্ষী। মানুষ হত্যা, করে জেল-জুলুম দিয়ে যদি আন্দোলন দমন করা যেত তাহলে আইউব-ইয়াহিয়া পরাজিত হত না। শক্তিমান এরশাদ সাহেবকে বিদায় নিতে হত না। ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনদের চিরস্থায়ী স্বপ্নের অবসান হত না। রাজনৈতিক মোকাবেলার পরিবর্তে প্রচারণা- প্রতারণা দ্বারা তাদের যে ইস্যুটিকে পাশে ফেলে দিয়েছেন এখন তা সরকারি দলের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠছে। বিরোধী পক্ষ যখনই যে কোন আন্দোলন করেছে তারা এটিকে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর অপকৌশল বলেছেন। যখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে, তেলগ্যাস রক্ষার আন্দোলন হয়েছে তখনই তারা পুলিশ দ্বারা পিটিয়ে দিয়েছে। এমনকি আড়িয়াল বিলের মত স্থানীয় এবং অরাজনৈতিক আন্দোলনকেও শক্তি প্রয়োগ দ্বারা তারা প্রতিহত করেছে। আর বলেছে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য এসব করা হচ্ছে। আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সেদিন বলেছেন: একই অস্ত্র বার বার প্রয়োগ করলে ভোঁতা হয়ে যায়। হরতাল এখন ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তাকে সে কথাটিই ফেরত দিতে চাই এভাবে- যুদ্ধাপরাধী ইস্যু নামের অস্ত্রটিও এখন যথেচ্ছ ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে গেছে। কথায় বলে লেবু বার বার কচলালে তেতো হয়ে যায়। আমার ধারণা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটি সংবেদনশীল এবং গ্রহণযোগ্য ইস্যুকে তারা অসাবধানতাবশত ভোঁতা করে ফেলছেন। এখন সবকিছু ছাপিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। এখন আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় জাতীয় দাবিতে পরিণত হওয়ার প্রমাণ কী? তাহলে বলতে হয় ‘দেয়ালের লিখন পড়ুন’। ক্ষমতাসীন মহাজোট বাদে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচ্চারিত শব্দাবলী কি তারা শোনেন না? জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী দলগুলোর কথা বাদ দিয়েও আজকে বি. চৌধুরী এবং ড. কামাল হোসেনের কথা বলা যায়। এমনকি সরকারি মদদে হরতালকারী সিপিবি, বাসদ এবং বাম মোর্চা কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে? সবাই মীরজাফর, তারা একাই সিরাজদ্দৌলা এ মানসিকতা গোটা জাতির জন্য অসম্ভব ক্ষতিকর। কথায় কথায় জিয়াউর রহমান, কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মত মানুষকে রাজাকার বলা হীনমন্যতারই লক্ষণ। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে তারা এখন জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করছে। বিরোধী দলেও জ্বালাও-পোড়াও যতই তীব্রতর হচ্ছে সরকার মনে করছে জনমত তাদের পক্ষে চলে যাচ্ছে। সুতরাং একটা সংঘাতময় পরিস্থিতি তাদের জন্য অনুকূল হবে। বরং আইন-শৃংখলার যত অবনতি হবে পাবলিক সেন্টিমেন্ট সরকারের বিপক্ষে চলে যাবে। সরকার সংঘাতকে সংঘাত দ্বারা মোকাবেলার যে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা দেশকে উচ্ছৃংখলা-বিশৃংখলা, অরাজকতা এবং অবশেষে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ অভিযোগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব মহলের। জাতীয় পত্র-পত্রিকা বিরোধী নয় তাদের পক্ষপুটের পত্র-পত্রিকায় যে প্রতীকী জনমত প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে তারা তা লক্ষ্য করছেন না? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি মীমাংসিত হতে যত দেরি হবে সরকারের জনপ্রিয়তা ততই হ্রাস পাবে। সরকারের আন্দোলন মোকাবেলার আর এটি অস্ত্র রাজনৈতিক নিপীড়ন। বিগত চার বছরে এত মামলা এবং হামলা হয়েছে যে, পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে বিগত ৪০ বছরেরটা একত্র করলেও তার সমান হবে না। গ্রামে মুরগীর ঠাং ভাঙলেও যেমন অসত্ প্রতিবেশী মামলা ঠুকে দেয় তেমনি সব হাস্যকর বিষয় এনে জাতীয় নেতৃবৃন্দের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে গাড়ী পোড়ানোর মামলা অথবা সর্বশেষ ময়লার গাড়ীতে আগুন দেয়ার মামলা উল্লেখ করা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে অলিখিত জাতীয় ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল এ দাবি আদায়ের জন্য সংঘর্ষ-সংঘাত সৃষ্টি করুক নাগরিক সাধারণ তা পছন্দ করে না। সাধারণ মানুষ এটাও পছন্দ করে না যে, সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য এ ইস্যুর প্রতি অনড় থাকুক। মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। একটি রাজনৈতিক উপায়ে, একটি নিয়মতান্ত্রিক পথে বিষয়টির সুরাহা হোক এটাই সাধারণ মানুষের কাম্য। এ জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। সংলাপের মাধ্যমে অলিখিত জাতীয় ঐক্যকে অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে এটা কোন ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের বিষয় নয়, এটা জাতীয় স্বার্থের বিষয়। উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত করে তুলতে পারেন না। রাজনীতিবিদদের সে কল্যাণী মনোবৃত্তি তৈরি হোক এটাই সকলের প্রার্থনা। লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন