মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভক্তি কাম্য নয়

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৫
বাঙালি জাতি হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। জাতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের কোন ক্ষুদ্র স্বার্থ বা শ্রেণীবিন্যাস ছিল না। এদেশের জনগণের বহু বছরের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফসল এই মুক্তিযুদ্ধ। বহু বছরের লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, বঞ্চনার ইতিহাস এই মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের কারিগররাই হলো মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ যেমন গৌরবের, মুক্তিযোদ্ধাও তেমনি গৌরবের। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি হয় না। একটির সাথে আরেকটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে টানা-হেঁচড়া কম হচ্ছে না। কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে মুক্তিযোদ্ধা নয়, কে আসল মুক্তিযোদ্ধা কে নকল মুক্তিযোদ্ধা এ নিয়ে দেন-দরবার বাক-বিতণ্ডা কম হচ্ছে না। কিন্তু সুরাহার পথ নেই। ফলে দিনে দিনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বিতর্ক বেড়ে চলছে। এতে বিভক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাসহ গোটা জাতি। ১৯৭১ সালে এদেশের মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাদে সবাইতো ছিল মুক্তিযোদ্ধা। কেউ অস্ত্র হাতে প্রত্যক্ষভাবে, কেউ অস্ত্রবিহীন পরোক্ষভাবে যুদ্ধ করেছে। এদেশের প্রায় প্রতিটা ঘরই ছিল একেকটা মুক্তিযুদ্ধের দুর্গ। মুক্তিযোদ্ধা জনতার কাতারে প্রায় পুরো জাতিই ছিল একটা যুদ্ধক্ষেত্র। সেটা ছিল অনেকটা পানি আর মাছের মত। পানিতে মাছের অবস্থান যেমন অনুকূলে, তেমনি মোবালাইজড জনতার মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানও ছিল অনুকূলে। স্বাধীন দেশে সে অনুকূল অবস্থানটা আরো সুদৃঢ় করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। দিনে দিনে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভক্তি আমাদের হতাশার পথে হাঁটাচ্ছে। কে মুক্তিযোদ্ধা কে মুক্তিযোদ্ধা নয়— সে বিতর্ক দিনে দিনে বাড়ছে। কিন্তু যে মা ছেলে হারালো, যে শিশু বাবা হারালো, যে বোন চোখের জলে বুক ভাসালো তারা কি কম মুক্তিযোদ্ধা? মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? যে গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের পথ দেখালো, অস্ত্র বহন করলো, খাদ্য খাওয়ালো, আশ্রয় দিলো, তারা কি মুক্তিযোদ্ধা নয়? যদিও তাদের সার্টিফিকেট নেই। শুধু সার্টিফিকেটটাই কি বড় কথা? যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এই স্বাধীনতার মুক্ত বাতাস কি আমাদের গা সইতে পারছে না? তবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এতো অবহেলা কেন? যখন যুদ্ধ করেছে তখনতো কেউ নাম,খ্যাতি, যশ লাভের জন্য যুদ্ধ করেনি, তখনতো কেউ সার্টিফিকেট চায়নি। বরং কিছু বিপথগামী, দু’মুখো স্বার্থান্ধ ব্যক্তি উল্টোপথে হেঁটেছে। তাদের কথা ভিন্ন। অনেক সময় তারাই হর্তা-কর্তা,সার্টিফিকেট দাতা। এক চোখে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি উপহাস, অন্য চোখে মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাঙিয়ে আখের হাসিল করা। কষ্ট লাগে স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও যখন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট খুঁজে ফেরে। সামান্য ভাতার জন্য দয়া ভিক্ষা করে। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে আকুতি জানায়। যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধারা কষ্টে আছে তখন খুব খারাপ লাগে। যাদের কিছু করার ক্ষমতা আছে তারা করে না। বরং অবহেলা করে তাদের কষ্টটাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। অথচ দেশে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় আছে, কল্যাণ ট্রাস্ট আছে, ফাণ্ড আছে, আরো কতো কি আছে। কিন্তু এর সুফল তো এই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা পাচ্ছে না। অথচ মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে কত লুটপাট হচ্ছে। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করলেই কি শুধু মুক্তিযোদ্ধা? অথচ জীবিত অবস্থায় কেউ তাদের খবর নেয় না। অসহায়, অবহেলায়, বিনা চিকিত্সায় কাতরে মরে। সব দলেই মুক্তিযোদ্ধা আছে। কম-বেশি হতে পারে। তাদের ঠিকানাতো একটাই, স্বাধীনতা ধরে রাখা এবং স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া। স্বাধীন বাংলাদেশে অপশক্তি এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা একটি বলিষ্ঠ শক্তি হিসেবে রুখে দাঁড়াবেন, গণতান্ত্রিক চলার পথে শক্তি ও সাহস যোগাবেন, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী হবেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দুর্বল উজ্জীবিত হবে আর কায়েমী স্বার্থবাদীরা ভীত-সন্ত্রস্তের মত পাততাড়ি গুটাবে এটাইতো কাম্য হতে পারে। কিন্তু যদি মুক্তিযোদ্ধারা বিভক্ত হয়ে পড়েন, একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন, তবে তো অপশক্তিই লাভবান হবে। যারা স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের মূল মন্ত্র হতে বিচ্যুত হয়ে কায়েমী স্বার্থের হাতকে শক্তিশালী করেছে তারাতো মুক্তিযুদ্ধ করলেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নয়। তাদের কাছে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, আইনের শাসন এসব ভাল লাগবে না। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে তারা অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। তাদের দিকে কেউ তাকায় না। শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে আমরা তাদের নিরাশ করছি, আর বিভক্তি করছি। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই না। লেখক :প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আফাজউদ্দিন খান ডিগ্রী কলেজ, মনোহরদী, নরসিংদী