মাঠপর্যায়ের ১৮৮টি বিভিন্ন পদে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে বিপুল দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠায় অবশেষে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসের আওতাধীন নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্থগিত করিতে নির্দেশ জারি করিয়াছে এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন ও হিসাবরক্ষক রেজাউল করিমকে প্রাথমিককভাবে বরখাস্ত করিয়াছে। জেলার ৯টি উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারী, অফিস সহকারী, স্টোর কিপার, ওয়ার্ড বয়, সুইপারসহ বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগের জন্য চলতি বত্সরের মার্চ মাসে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হইয়াছিল। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষান্তে ১০ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। অধিকাংশই নিয়োগপত্র পাইয়া চাকরিতে যোগদান করিয়াছিলেন। কিন্তু নিয়োগ বঞ্চিতরা ক্রমশ ক্ষুব্ধ হইয়া আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়েন, সিভিল সার্জনের অফিস ঘেরাও করেন। শহর জুড়িয়া তোলপাড় শুরু হইয়া যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি ফাঁস হইয়া দেশব্যাপী বিপুল আলোচনা-সমালোচনারও জন্ম দেয়। অবশেষে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্থগিত করিয়া পরিস্থিতি আপাতত সামাল দিয়াছে এবং দায়ী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি লইতেছে।
ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় আনুগত্য আর আইনের শাসনের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের সংস্কৃতির যেন স্বাভাবিক অংশ হইয়া উঠিয়াছে। জনপ্রশাসনের এমন কোনো শাখা নাই যেখানে দুর্নীতি ও ঘুষের লেনদেন চলিতেছে না। বিরল ব্যতিক্রম বাদে প্রশাসনের রাঘববোয়াল হইতে চুনোপুটি পর্যন্ত সকলেই এই প্রকার উপরি আয়ের ভাগবাটোয়ারায় নিজেদের পাওনাটুকু বুঝিয়া লইতে একটুও হীনমন্যতা বা অপরাধ বোধ করেন না। গত কয়েক দশকে সমাজের এই অসুস্থতা ন্যায়-নীতির সকল মাত্রা ছাড়াইয়াছে, ফলে তাহারা এরূপ অবৈধ উপার্জনকে নিজেদের ন্যায্য অধিকার বলিয়াই মনে করেন। নিরুপায় জনসাধারণও এই বাস্তবতা মানিয়া লইয়াছেন। যেকোনো সরকারি পরিসেবা লইতে, নিজেদের নাগরিক অধিকারটুকু আদায় করিতে কিংবা সন্তানের নিয়োগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত তদবির ও পর্যাপ্ত ঘুষের যোগান নিশ্চিত করিয়াই তাহারা মাঠে নামেন। জনপ্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশেষ একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে: নিয়োগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলগুলি বিজ্ঞাপিত পদগুলি হইতে নিজেদের দাপট অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক পদে পছন্দের লোক নিয়োগ ও তাহা হইতে প্রাপ্তব্য ঘুষের অর্থ দাবি করিয়া বসেন। গোল বাধে তখনই যখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মধ্যস্থতাকারী উপদলগুলির ভিতরে পদের সংখ্যা ও ঘুষের অর্থ ভাগবাটোয়ারা লইয়া বনিবনা হয় না। সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো উপদল প্রত্যাশিত বখরা না-পাইয়া যথেষ্ট সন্তুষ্ট হইতে পারেন না। তাহাদের নিকট তদবির করিয়া ঘুষের টাকা জমা দিয়া চাকুুরির আশ্বাস পাইলেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগপত্রটি আর হাতে আসিয়া পৌঁছায় না। ফলে অসন্তোষ দানা বাঁধিয়া উঠে। তখন উক্ত নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলিয়া বঞ্চিত প্রার্থী ও মধ্যস্থতাকারী উপদলগুলি একযোগে আন্দোলনে নামিয়া পড়েন। অন্যথায়, ঘুষদাতা আর গ্রহীতাগণ পরস্পরকে সন্তুষ্ট করিয়া দুর্নীতির নীরব দুঃশাসন সচল রাখেন এবং যোগ্যদেরকে বঞ্চিত করিয়া চলেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি, রেল কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি কিংবা সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, কিংবা ইসলামী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ কেলেঙ্কারির তুলনায় সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এই দুর্নীতি হয়তো মাত্রাগত দিক হইতে সামান্য। কিন্তু ইহা জাতীয় পর্যায়ে সর্বস্তরের প্রশাসনিক অবকাঠামোর নিঃস্ব নৈতিকতাকেই তুলিয়া ধরে। আর এইসব ঘটনার পুঞ্জীভূত সমাহারই বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া আন্তর্জাতিক পরিসরে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষ অবস্থানে লটকাইয়া রাখিয়াছে। সম্প্রতি এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আবারও সিদ্ধান্ত টানিয়াছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ঘুষ লেনদেনে বাংলাদেশ সকলের শীর্ষে রহিয়াছে। আর, সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে রাজনৈতিক দল, সংসদ প্রতিনিধি ও পুলিশ বিভাগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করিয়া যথার্থ কাজটিই করিয়াছেন। কিন্তু, যখন একটি দেশের জনপ্রতিনিধি হইতে শুরু করিয়া জনগণের নিরাপত্তাবিধানকারীরা পর্যন্ত দুর্নীতির গরলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত তখন নিয়োগ স্থগিতাদেশের মতো বালির বাঁধে কি সর্বগ্রাসী জোয়ার থামিবে!
