আগেকার দিনে কেবলি পুরুষ মানুষই সম্পদ আহরণের কাজ করতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সবকিছুই পাল্টে গেছে। মেয়েরা আজকাল আর পুরুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে গৃহকোণে আবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। তাইতো সকল সেক্টরেই খুব দ্রুতগতিতে তারা উচ্চ ও শক্ত আসনে স্থান করে নিচ্ছে। পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষা বিভাগসহ সকল বিভাগের অনেক উঁচু পোস্টই এখন মেয়েদের দখলে। পৃৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মেয়েরাই সর্বোচ্চ আসনে আসীন। সংসারে অর্থসম্পদ উপার্জনের দায়িত্ব এখন আর আগের মত কেবল পুরুষদেরই নয়। পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও সংসারের ঘানি টানার দায়িত্ব নিয়েছে। সত্য যে, তাদেরকে এ দায়িত্বে ঠেলে দেয়া হয়নি। বরং তারাই দায়িত্ব নিয়েছে। কিছু সময় আগেকার কথা বলছি, সে সময় মেয়েরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পোস্টার- ব্যানার নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলেও সত্য যে, তাদেরকে সেভাবে কোন ছাড় দেয়া হয়নি পুরুষদের পক্ষ থেকে। বলা যায় যে, সময়ের ব্যবধানে কোন সংঘাত ছাড়াই সুযোগ পেয়েছে মেয়েরা। বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায়, আগে মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ছিল অনেকটাই বিলাসিতা। কিন্তু মেয়েরা পুরুষের কাছে নিজেদের নির্যাতিত-বঞ্চিত হতে দেখে সেখানে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শিক্ষার আঙ্গিনায়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে বলা যায় মেয়েরাই বেশি স্থান দখল করে নিয়েছে। তারা আজকাল বুঝতে শিখেছে, পুরুষ মানুষেরা কখনো ভাই, কখনো স্বামী, কখনো বাবা, কখনো শ্বশুর, কখনো ভাসুর ইত্যাদি বিভিন্ন চরিত্রে সমাসীন থাকলেও তারা শ্রেণীগতভাবে সব সময়ই একই থেকেছে এবং আছেও। পুরুষেরা শ্রেণীগতভাবে মেয়েদেরকে তাদের অধীনস্থ শ্রেণীর বলে মনে করে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সকল স্তরেই পুরুষরা নেতৃত্বে থেকে নিজেদের স্বার্থে যেখানে যখন যা প্রয়োজন আইন তৈরি করে নিয়েছে। এখন বদলে গেছে প্রকৃতির নিয়ম। বদলে গেছে তাই দিনও। চারিদিকের পৃথিবী আস্তে আস্তে পুরুষদের হাতের মুঠো থেকে বের হয়ে চলে আসছে মেয়েদের কাছে। বাজার, অফিস-আদালতের অনেকাংশই এখন মেয়েদের দখলে। সন্তান লালন- পালনে মায়েদের তুলনায় এখন বাবারা অনেক অনেক বেশি দক্ষ। পুরুষদের পক্ষ থেকে সেখানে কোন প্রতিবাদ নেই। আছে কেবলই আদেশ প্রতিপালনের প্রতিযোগিতা।
মানুষের একটা বিশেষ সত্তা যে, একজন সব সময়ই আলাদা থাকতে চায়, নিজেরটাকে ভাল হিসেবে দেখতে ও দেখাতে চায়। একজন যা ভাল বা মন্দ মনে করেন, তা অন্য সকলেই একই রকমভাবে ভালো বা মন্দ মনে করুক, তাইই চায়। এখানে কোন ব্যতিক্রমই মেনে নিতে রাজি থাকে না। আর এখানেই যত সন্দেহের মূল নিহিত, এখানেই বপন করা হয় সন্দেহের বীজ। প্রত্যেক মানুষ যেমন পৃথক, তেমনি প্রত্যেকেরই যে একটা পৃথক চিন্তার জগত্ থাকতে পারে এবং আছে, সে সত্যটাকে সত্য বলে মেনে নিতে পারলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু আমরা তা পারি না। মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু মেনে নিতে পারাটাই বীরত্ব, যোগ্যতা এবং একজন মানুষের সৌন্দর্যতা। বীরত্বপূর্ণ, যোগ্যতাসম্পন্ন, সৌন্দর্যতাসম্পন্ন মানুষই হলো সুন্দর মানুষ। সে বিচারে সুন্দর মানুষই সুখী ও ভাগ্যবান। মনের মতন হলো না! আমার চাওয়ার মতন হলো না!! ভেবে ভেবে কত সমস্যার সৃষ্টি করি। কিন্তু আসলে যে মনের মতন হবার নয়, চাওয়ার মতন হবার নয়, তা জানি না বলেই মেনে নিতেও পারি না; সেখানেই সন্দেহ এসে দানা বাঁধে। শুধু দানাই বাঁধে না বরং আক্রান্তকে একেবারে নিঃশেষ করে দেবার পরই তার ঘণ্টা বাজবে বিদায়ের; তার আগে নয়।
অথচ দৃষ্টিভঙ্গির সামান্য পরিবর্তনেই সম্ভব অনেক সুন্দর কিছু আবিষ্কার করা। চোখের দেখার ভঙ্গি, চিন্তার ভঙ্গিই এ জন্য দায়ী, তা ভুল বলা হবে না। তাই দৃষ্টিভঙ্গির সামান্য পরিবর্তনেই সম্ভব অনেক সুন্দর কিছু আবিষ্কার করা। তবে এটা ঠিক যে, কেউ ইচ্ছে করলেই তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে সক্ষম নন। বড় কঠিন এ কাজ। তবে এও সত্য যে, সব সুন্দরই কঠিন হয়। সুন্দর সহজলভ্য নয়। যা সহজলভ্য,তা সুন্দর নয়।
লেখক :জেলা ও দায়রা জজ (অবসরপ্রাপ্ত)
