স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সকল সরকারের দিকে যদি দৃষ্টি ফেরাই তবে একটি বিষয় অভিন্ন দেখবো। তা হচ্ছে সরকার পরিচালকরা মেয়াদের শেষদিকে এসে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়েন। নানা দিক থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সফল হন না বলে চারদিকে সরকারের সমালোচনার গতি বাড়তে থাকে। এ সময় নিজেদের রাশ টেনে রাজনীতি ও প্রশাসন গণমুখী করার চেষ্টায় না গিয়ে সমালোচকদের সমালোচনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আগে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের যুগ ছিল না। তাই মিডিয়া বলতে সংবাদপত্র সব সময় সরকারের কোপানলে পড়তো। বিটিভি বরাবর ‘সততা’র সাথে দায়িত্ব পালন করে এসেছে। জনগণের নয়, সরকারের প্রচারযন্ত্র হিসেবে নিজের অবস্থান অটুট রেখেছে। বেসরকারি চ্যানেলের যুগে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো বিটিভি জনগণ দেখুক বা না দেখুক, বিটিভির সংবাদ আমলে নিক বা না নিক, সরকারের একমাত্র মিডিয়া স্বস্তি বিটিভিকে ঘিরেই। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার যুগে সকল প্রতিষ্ঠানই যে সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে এগুচ্ছে তা বলা যাবে না। রাজনৈতিক বিভাজনের অনুষঙ্গে মিডিয়াতেও বিভাজন রয়েছে। বিশেষ কয়েকটি সংবাদপত্র সাধারণ পাঠকের কাছে দলীয় সংবাদপত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। ওসবের পাঠকও বিটিভির দর্শকের মতো। কট্টর দলীয় সমর্থকরা ধর্মীয় লিফলেটের মতো আবেগ আর শ্রদ্ধায় পড়েন। কেউ কেউ অন্য কাগজের সাথে তুলনা করতে বা কৌতুকের আনন্দ পাওয়ার জন্য পড়েন। নিরপেক্ষ মেজাজের পত্রিকাগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের ঝোঁক বেশি। কলামের ক্ষেত্রেও একই কথা।
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ‘নিরপেক্ষতা’ রাষ্ট্র ক্ষমতার দৌড়ে থাকা দলগুলোর পছন্দ না। সরকার আর সরকারি দলের তো নয়ই। শুনেছি পত্রিকাকে বলা হয় দ্বিতীয় সংসদ। সংসদে যেমন আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের পথ ধরে নীতি নির্ধারিত হয়, আইন পাস হয় বা সরকার নিজেকে সংশোধন করে, সংসদের বাইরে থেকে তেমন পথ দেখানোর চেষ্টা করে সংবাদপত্র। এর রিপোর্টিং, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ইত্যাদি লেখনির মাধ্যমে। আর আমাদের দেশে যেহেতু বিরোধী দলের সংসদে না আসার সংস্কৃতি চালু আছে, ফলে সমালোচনা করে সরকারকে পথ দেখানোর দায়িত্বটি আরো বেশি বর্তেছে সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার উপর। কিন্তু সরকার পরিচালকরা যদি মনে করেন ‘আমাকে বোঝাবে এমন মোড়ল কে আছে এই গ্রামে’—তা হলে অন্য কথা।
সরকার তার উপদেষ্টা ও পরামর্শকদের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। আর সংবাদপত্র সরকারকে বিনা পারিশ্রমিকে পরামর্শ দেয়। এক ধরনের দায়বোধ থেকে দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু গণতন্ত্র চর্চার দুর্বলতার কারণেই বোধ হয় সরকার প্রধানরা হীরকরাজা চরিত্রের হয়ে যান। অর্থ দিয়ে যাদের পোষণ করেন তাদের কাছে কেবল তোষামদ শুনতে পছন্দ করেন। আত্মশুদ্ধির দরকার নেই। হীরকরাজা যা করেন তাতেই ‘তথাস্তু’ বলতে হয়। দায়িত্বশীল সংবাদপত্র তা করে না। সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে পথ দেখাতে চায়। এ কারণে সরকারগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক বোধ থাকলে এ ধারার সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলগুলোকে বন্ধু ভাবার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সরকার নিয়ন্ত্রকগণ গঠনমূলক সমালোচনাকেও সহ্য করতে চান না, শত্রুজ্ঞান করেন। কেবল চান সকলে অন্ধের মতো প্রশংসা করে যাক।
সমপ্রতি নানা বক্তৃতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমগুলোর সমালোচনায় মুখর। তাঁর ক্ষুব্ধতা আড়াল করতে পারছেন না। এ সময় বিএনপির অবরোধ অনাচার আর জামায়েতের হরতাল অনাচারের সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্রলীগের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস। মিডিয়াতে এসবের রিপোর্টিং বা প্রতিবেদন নীতিমালা অনুযায়ী গুরুত্ব বিবেচনায় জায়গা করে নেবে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় এক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে। বিরোধী দলের অনাচারের খবর কম গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হচ্ছে বা প্রচার পাচ্ছে আর সরকার সংশ্লিষ্ট অনাচারের খবর বা প্রচার প্রাধান্য পাচ্ছে। আমরা মনে করি কোনো সরকারের মনের জোর কমে গেলে এসব বিষয় নিয়ে এমন হতাশা ব্যক্ত করে।
কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এগুতে চাই, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতচক্র আর তাদের প্রশ্রয়দাতাদের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত দেখতে চাই তারা মুক্তির পথ খুঁজতে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাফল্য কামনা করেছিলাম। ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোটকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার রাজনীতি নতুন আর পরিচ্ছন্ন ছন্দ খুঁজে পাবে। আমি কলাম লেখক হিসেবে আশা করেছিলাম এবার সরকারের এগিয়ে চলার সাথী হবো। লেখার ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে সরকারের চলার পথে সামান্য হলেও ছন্দ যোগ করবো। রচনা করবো সরকারের সাফল্যগাথা আর দিন বদলে দেয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের এত বিপুল জনসমর্থন পেয়েও তার অপচয় করলেন সরকার পরিচালকরা। দলীয় গণ্ডিতে নিজেদের আটকে ফেললেন। সরকার পরিচালিত হতে লাগলো গতানুগতিক ভঙ্গিতে। আমরা তারপরও চেয়েছি সরকারের সম্বিত্ ফেরাতে। রবীন্দ্রনাথের মতো ‘আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচানোর’ চেষ্টা আর কি! মিডিয়ার এ ধারার চেষ্টাকে গণতান্ত্রিক পরিবেশে ইতিবাচকভাবে নেয়ার কথা। সমালোচনা থেকে আত্মশুদ্ধির পথ খোঁজার চেষ্টা করা। কিন্তু অতি আত্মবিশ্বাসী আমাদের সরকার পরিচালকরা সে পথে হাঁটতে চান না। সমালোচনাকে নিন্দা ভেবে ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু এই সহজ সত্যটি বুঝতে চান না সরকারের কর্মকাণ্ড মিডিয়াতে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হতে হলে সরকারের বা দলের নেতিবাচক কাজ থেকে সরে আসতে হবে। বিএনপির অবরোধ কর্মসূচির পর প্রধানমন্ত্রী এক সভায় দুঃখ করে যা বললেন তার সার কথা হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের গাড়ি পোড়ানো পত্রিকায় লিড নিউজ হয় না, অথচ সরকার বা সরকারি দল নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয় তেমন নিউজ প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপে অনেক সংবাদপত্র। কিন্তু এখন কেউ বিনয়ের সাথে যদি বলে বিএনপির গাড়ি পোড়ানোসহ নানা অরাজকতার ছবি ও সংবাদ অবশ্যই লিড নিউজ হওয়ার যোগ্য। কিন্তু একই দিনে প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বিশ্বজিেক সকলের সামনে কুপিয়ে, পিটিয়ে যখন হত্যা করে তখন স্বাভাবিকভাবেই লিড নিউজের জায়গাটি দখল করে নেবে মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের ঘটনা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী যখন পিস্তল হাতে প্রকাশ্যে সন্ত্রাস ছড়ায় অথবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ সতীর্থদের মেরে জখম করে যখন চারতলা থেকে ফেলে দেয় তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা লিড নিউজ হয়ে যায়।
এই অনাচার বন্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন, দলীয় সন্ত্রাসীদের দলছাড়া করতেন, যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করতেন, তবে নিশ্চয়ই এই সুকর্মের কথা সংবাদপত্রে গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পেতো। সরকারেরও মর্যাদা বাড়তো। অথচ সকলের চেনা-জানা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মীরা নিষ্ঠুর নির্যাতনে নিরপরাধ বিশ্বজিেক খুন করার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন ছাত্রলীগ নয় বলে খুনিদের আড়াল করতে চাইলো তখনো আবার স্বাভাবিক নিয়মে সংবাদপত্রে তা গুরুত্বের সাথে ছাপা হলো। অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের দায় চাপলো সংবাদপত্রের ঘাড়ে। ফলে অপরাধীদের ছাত্রলীগ পরিচয় উন্মোচিত হলো সবিস্তারে। আর এ অবস্থাটি সরকারই ডেকে আনলো। তাই মিছেমিছি দুঃখ পেয়ে লাভ কি!
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললো। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়লো। ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ দুদক সরাসরি সরকারের ভাষায় বলে দিল পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। অর্থমন্ত্রীও তেমন সার্টিফিকেট দিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ‘মিথ্যা অভিযোগ’ তোলায় বিশ্বব্যাংককে এক হাত নিলেন। ফলে এসব প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপার মতো নিউজ বলেই তা যথাস্থানে ছাপা হলো। প্রধানমন্ত্রী যখন নিজস্ব অর্থায়নে বা প্রবাসীদের টাকায় কিংবা শিক্ষার্থীদের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে পদ্মা সেতু বানানোর কথা বললেন তখনো তা প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলো। এক পর্যায়ে আবুল হোসেন যখন পদত্যাগ করলেন এবং এজন্য প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশপ্রেমিক অভিধায় অভিহিত করলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে সে খবরও অধিকাংশ সংবাদপত্রে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। আবার সময়ের বিবর্তনে এই দুদকই আগের অবস্থান থেকে সরে মেনে নিল পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির সন্ধান মিলেছে। সাতজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। সন্দেহের তালিকায় রেখেছে আবুল হোসেন, আবুল হাসানদের, তখনো সংবাদপত্রের নীতিমালা অনুযায়ী এসব সংবাদ প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল।
ঠিক একইভাবে জামায়াত-শিবির কর্মীদের পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর, অবরোধে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের নৈরাজ্য তৈরি, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে জামায়েতের ডাকা হরতালে বিএনপির নৈতিক সমর্থন দেয়া এবং হরতালের দিনে অরাজকতা তৈরি প্রভৃতিও অনেক গুরুত্বের সাথে সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে আর টিভি চ্যানেলে দেখানো হয়েছে।
সুতরাং আমরা বলবো, গুটিকয়েক দলীয় সংবাদ মাধ্যম ছাড়া তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনেই প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়। ফলে আমরা মনে করি সরকারি বা বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীর উষ্মা প্রকাশ বা দুঃখিত হওয়ার পেছনে তাঁদের অগণতান্ত্রিক মানসিকতার ভূমিকা অনেক বেশি। সমালোচনা সহ্য করা এবং সমালোচনা থেকে পথের দিশা নেয়া গণতান্ত্রিক আচরণ। অন্যায়কারী যখন আর অন্যায় ঢাকতে পারে না বা প্রকাশিত রিপোর্ট সত্য নয় বলে যখন প্রমাণপত্র হাজির করতে না পারে তখন অসহিষ্ণু হয়ে যায়। আমরা আমাদের জাতীয় নেতা-নেত্রীদের কাছ থেকে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক অস্বস্তি দেখতে চাই না।
তাই আবারো বলছি, এ দেশের মুক্ত চিন্তার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে এই স্বাধীন দেশে শক্তিমান দেখতে চায় না। তাদের প্রশ্রয়দাতাদের সুপথে ফিরে আসার প্রহর গুনে। প্রতি মুহূর্তে প্রত্যাশা করে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য সত্ ও জনগণের রাজনীতিতে ফিরে আসুক। এ কারণে তাদের সমালোচনা করেই বাস্তবের উঠোনে ফিরিয়ে আনতে চায়। আওয়ামী লীগকে এদেশের অধিকাংশ মানুষ নির্বাচনে বিপুল সমর্থন জানিয়ে সরকারে বসিয়েছে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে। তাই সরকারের পক্ষে লিখতে পারলে আমরা সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাবো। অবশ্য সে পথ তৈরি করতে হবে সরকারকেই।
লেখক:অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
[email protected]
