ডিসেম্বরের আর দিন সাতের বাকি। এমনিতেই ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের আবেগঘন মাস। জাতীয় জীবনে মাসটি প্রতিবছরই একাত্তরের বিজয়, বুদ্ধিজীবী ও গণহত্যার নানা স্মৃতি নিয়ে হাজির হয়। সঙ্গে থাকে দেশের সমসাময়িক রাজনীতিও। সব কিছুকে ছাপিয়ে যায় ১৯৭১ -এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের আনন্দ, উত্সব এবং নতুন প্রত্যয়ের কিছু কথা। এ বছর ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে দেশব্যাপী ব্যাপক মানুষের মধ্যে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত করার দাবিটি বেশ জোরদার ছিল। মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু সৈনিকদের প্রতি নতুন প্রজন্মের শিশু, কিশোর, তরুণ ও যুবাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের স্বতঃস্ফূর্ততাও লক্ষ্য করা গেছে। এটি হচ্ছে ডিসেম্বর মাসের মূলসে াত— যা যুক্ত করেছে দেশের মানুষকে নতুন চেতনা ও প্রেরণায়। এটি স্বাধীন দেশ ও জাতির যথার্থ স্বকীয় অবস্থান। সেই অবস্থানে বৃহত্তর জনগণের সংযুক্তি ঘটছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে —তাই এ দৃশ্য প্রবহমানতা প্রমাণ করেছে এ বছর।
অন্যদিকে এ বছর রাজনীতির অঙ্গন ডিসেম্বরের এ সব অর্জনের খোঁজ-খবর কমই রেখেছে, বা বিবেচনায় নিয়েছে। সেখানে হরতাল, সহিংসতা, ভাংচুর, পোড়াপুড়ি, দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে উসেক দিয়েই চলেছে কোনো কোনো শক্তি। প্রতিযোগিতা দিয়ে হরতাল ডাকা হয়েছে, অবরোধ, গাড়ি পোড়াপুড়ি ও ভাংচুর করা হয়েছে, একটি হরতালে ভাংচুর জোরজবরদস্তির কিছুই হয়নি সত্য, তবুও মানুষ সেটি থেকে দূরে থেকেছে, অন্য একজন নতুন নেত্রী জনগণকে হরতাল করার জন্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন —তবে সেদিন যে হরতাল ছিল তা বেশির ভাগ মানুষ জানতোই না, রাস্তাঘাটে সবই ছিল স্বাভাবিক। আসলে বাংলাদেশে এখন হরতাল নিয়ে কী হচ্ছে- কেন হচ্ছে তার কোনো যুত্সই উত্তর বা সংজ্ঞায়ন হচ্ছে না। ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক মাসে এ বছর এ ভাবে প্রতিযোগিতা দিয়ে হরতাল ডাকা হবে, জনজীবন শঙ্কিত ও বিপর্যস্ত করা হবে —তার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে বাংলাদেশে এমন কথাও অনেকের পছন্দের হয় না, খোঁজার চেষ্টা হয় প্রশ্নকর্তার দলীয় বিশ্বাস ও অবস্থানের সংশ্লিষ্টতাকে। চিন্তার জগতে এমন বদ্ধ অবস্থান থেকে যুক্তি দিয়ে বিষয়গুলোকে বোঝা, রাজনীতির গতিপথকে সম্মুখে দেখার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করা খুবই জরুরি বিষয়। তা হলেই রাজনীতির যে কোনো বর্তমানকে ভবিষ্যতের জন্যে যোগ-বিয়োগ দিয়ে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হতে পারে। আমাদের দেশে এ কাজটি খুব একটা হয় না বলেই যে কোনো সময় কেবলি ঘুরপাক খেতে থাকে, সমাধানের পথ খুঁজে পায় না।
আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। ১৮ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃস্থাপনের দাবিতে আন্দোলন করছে। আগে এটি ছিল ৪ দলীয় জোট। এখন এর সঙ্গে আরো কিছু ছোট ছোট দল যুক্ত হয়ে ১৮ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে। এই জোট আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে হতে দেবে না, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংশোধন করে পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি করছে। ২০১১ সাল থেকেই এই দাবিটি তারা করে আসছে। অন্যদিকে সরকার থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবতে বিরোধী দলকে বলেছে। বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বা বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হবে —তার কোনোটি কেউই স্পষ্ট করেনি। সরকার যেমন করেনি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখাটি কেমন হবে, বিরোধী দলও বলেনি তাদের চাওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কাঠামো, গঠন প্রক্রিয়া ও কার্যকারিতা কেমন হবে। ফলে দেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি জটিলতার আশঙ্কা গোড়াতেই রয়ে গেছে। কেননা, বিরোধী দলগুলো জোটগতভাবে কোনো নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সরকারের পক্ষে বেশ কঠিন, সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই যতোই নির্বাচনটি অবাধ এবং সুষ্ঠু হোক না কেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিরোধী দলের হাতে বড় একটি ক্ষমতা রয়েই গেছে যা উপেক্ষা করা সরকার দলের পক্ষে বেশ কঠিন। সুতরাং এ ধরনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রস্তাব বিরোধী দলকে দিয়েছেন। বিরোধী দল বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে না দিলেও তাদের বিবেচনা তত্ত্বাবধায়কের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে এখনো পর্যন্ত এমনটিই বোঝা যাচ্ছে। তবে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কতোটা সংশয়মুক্ত সেটিও নিশ্চিত নয়। কেননা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়েই তো দেশে আবার তর্ক-বিতর্ক শুরু হবে, কারো নাম কোথাও উচ্চারিত হলে তার হাড়ির খবর খোঁজার তাত্ক্ষণিক চেষ্টা শুরু হবে, ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত শান্তি ও নিরাপত্তাও তাতে বিঘ্নিত হতে পারে। সুতরাং, বিরোধী দল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি করছে তা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো রূপরেখা বা প্রস্তাবনা উপস্থাপিত হয়নি, এটি এখনো দাবি আকারেই রয়ে গেছে। দাবি আকারে থাকা যে- কোনো বিষয় সম্পর্কে জনমত সৃষ্টি করা অপরিহার্য। সে কাজটি ১৮ দল এখনো পর্যন্ত করেনি। না করেই ১৮ দল আন্দোলনের একটি কর্মসূচি গত মাসের ২৯ তারিখ ঢাকায় অনুষ্ঠিত জোটের সমাবেশ থেকে ঘোষণা করেছে। সে ক্ষেত্রে ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলের দেশব্যাপী রাজপথ ও সড়কপথ অবরোধের কর্মসূচি ছিল। কিন্তু এর আগেই ১৮ দলের দ্বিতীয় বড় দল জামায়াত ও মানবতা বিরোধী অপরাধে আটককৃত তাদের দলীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে ৩ ডিসেম্বর সমাবেশ করতে চেয়েছিল যা সরকার করতে অনুমতি না দেয়ায় পরদিন ৪ ডিসেম্বর দেশব্যাপী তাত্ক্ষণিকভাবে হরতাল আহবান করেছে। বিএনপি-জামায়াতের উক্ত হরতালকে নৈতিকভাবে সমর্থন প্রদান করায় ১৮ দলের আন্দোলনের ইস্যু নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ৩ ডিসেম্বরই দেশে গাড়ি ভাংচুর ও গাড়ি পোড়াপুড়িতে ১৮ দলের অন্যতম দল জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ব্যাপকভাবে নেমে পড়ে। ৪ ডিসেম্বরের হরতালে সংঘাত, সংঘর্ষ গাড়ি এবং দোকানপাট ভাংচুর ও পোড়াপুড়ি বিস্তৃত হয়। সেদিনের আন্দোলনের ইস্যু কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না, ছিল জামায়াতের আটককৃত নেতাদের মুক্তির দাবি। এর পর ৯ ডিসেম্বর বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা একই ধারায় রাজপথ, সড়কপথ অবরোধ করে, ভাংচুরের নজির বিহীন হিংস্রতা ঘটায়, সেদিন সরকার সমর্থিত ছাত্র লীগের কর্মীরা পুরান ঢাকায় অবরোধ ঠেকানোর নাম করে বিশ্বজিত্ নামে একজন নিরীহ পথচারীকে হত্যা করায় পরিস্থিতির মর্মান্তিকতা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ দলীয় জোট এমন পরিস্থিতিতে ১১ ডিসেম্বর নতুন করে হরতালের ডাক দেয়। বোঝা যায় ১৮ দল হরতালকেই বেছে নেয় সরকারকে কাবু করার মাধ্যম হিসেবে। চোরাগোপ্তা হামলা, রাস্তাঘাটে গাড়ি পোড়ানো, ভাংচুর চালানো, পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা করা এসব আক্রমণাত্মক কৌশল প্রয়োগে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে বিএনপির কর্মীরা বেশ দাপটের সঙ্গে করতে পারায় একদিকে যানবাহনের মালিক, চালক, দোকানপাট থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ বেশ অসহায় ও জিম্মি হয়ে পড়ে, অন্যদিকে সরকারও বেশ বেকায়দায় পড়ে। হরতালের সময় অবাধে রাস্তায় নেমে যা খুশি তা করার প্রবণতাটি ব্যাপকতা লাভ করে। এতে ১৮ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাংচুর ও পোড়াপুড়িতে শক্তি প্রদর্শনের নির্ভরতা বেড়ে যায়, সরকার পতনের প্রতি তাদের এক ধরনের বিশ্বাসও বেড়ে যায়। কিন্তু এটি যে কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার আন্দোলনের কর্মসূচি নয়, জনগণের সমর্থন আদায়ের উপায়ও নয়, এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে ১৮ দলের প্রধান দুই দল তথা বিএনপি এবং জামায়াত বরং হরতালের জিম্মি করা কর্মসূচি দিয়েই এগুতে বেশি উত্সাহী হয়ে ওঠে। এমনটি জোরদার করার পেছনে জামায়াতের অবস্থান বোধগম্য, বিএনপিও কিন্তু তাতেই ভর করতে শুরু করে। অর্থাত্ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনকে এমন অবস্থাতেই সরকার পতনে পরিসমাপ্ত করতে কোনো কোনো মহল উত্সাহী হয়েও ওঠে বলে মনে হয়। রাজনীতিতে যাদের ঝোঁক এডভ্যাঞ্চারিজমের দিকে বেশি থাকে তারাই সহিংসতাকে অবলম্বন করে আন্দোলন করতে বেশি তত্পর থাকে। অতীতে বাংলাদেশে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন হয়েছে। হরতাল ও অবরোধের মতো বহু কর্মসূচি রাজনৈতিক দলগুলো পালনও করেছে, ভাংচুর, বোমাবাজি, জ্বালাও পোড়া ও-এর মতো কিছু কিছু ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এবারের মতো হিংস্র রূপের ব্যাপকতা আগে এতোটা ছিল না। অতীতে যৌক্তিক দাবিতে জনসমর্থন ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে, জনগণের একটি অংশ তাতে অংশগ্রহণও করেছে। ফলে আন্দোলনগুলো দেরিতে হলেও জনসমর্থনে পুষ্ট হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছে। কিন্তু এবার এ সবের ব্যতিক্রম ঘটেছে। ১৮ দলের প্রধান দুই দলের ইস্যু নিয়ে বিভ্রান্তিতে জনমনে দ্বিধা - দ্বন্দ্ব রয়েছে, তার ওপর একের পর এক হিংসাত্মক হরতাল ডেকে দেশব্যাপী একটি বড় ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। যানবাহনকে জিম্মি করা হয়েছে, জনগণকে বাদ দিয়েই তা করা হয়েছে। এর ফলে ১৮ দলের কর্মসূচি আন্দোলনের চরিত্র থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। আন্দোলনের মূল বক্তব্যই থাকে জনগণের স্বার্থে দাবি আদায়ে কর্মসূচি দেয়া, জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন আদায় করা। জনগণের সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হিংসাত্মক কর্মসূচি ও জোরজবরদস্তি বিবেচিত হতে পারে না। হরতালের ক্ষেত্রেও তা বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হয় রাজনৈতিক দলকে। কিন্তু যেভাবে এই ডিসেম্বরে একের পর এক হরতাল ডাকা হচ্ছে, হরতাল অবরোধে নেতাকর্মীরা যেভাবে জোরজবরদস্তি, ভাংচুর ও তান্ডবে অংশ নিতে দেখা গেছে তা আন্দোলনের চেতনা থেকে ১৮ দলকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে নিয়েছে। শুধু ১৮ দলের হরতালই নয়, যে ক’টি বাম সংগঠন ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ করাসহ ৮ দফা দাবিতে ১৮ ডিসেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহবান করেছিল তাতে কোনো ধরনের পোড়াপুড়ি, ভাংচুর ও হিংস্রতার মতো ঘটনা না ঘটলেও সব ধরনের পরিবহন রাস্তায় নামতে সাহস পায়নি, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক বন্ধই ছিল, দোকান পাটও খুলতে ইতস্তত করছিল। এর কারণ হচ্ছে, দেশে হরতালের নামে ভাংচুর, পোড়াপুড়ির যে উন্মত্ততা দেখানোর অবাধ লাইসেন্স দেখা গেছে তাতে মানুষের বিশ্বাস ও আস্থায় বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। কে কাকে বিশ্বাস করবে, করবে না-এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর কয়েকটি ইসলাম ভিত্তিক দল ১৮ তারিখের হরতালের প্রতিবাদে একটি হরতাল ডেকেছিল। ৮টি দল তা প্রত্যাহার করার পরও মানুষ গাড়ি বের করতে ভয় পাচ্ছিল, দোকান পাট খুলতে ভয় পাচ্ছিল। দেশে কয়েক স্থানে হরতালকারীরা গাড়ি ভাংচুর করেছে। গাড়ি-ভাংচুর করাটি এখন হরতাল আহবানকারী ও পালনকারীদের প্রধান মানসিকতা, অবলম্বন ও প্রবণতা হয়ে উঠেছে। তাই হরতালের নাম শুনলেই যানবাহনের মালিক, চালক ও শ্রমিকদের মধ্যে এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, জীবন ও গাড়ি রক্ষার বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কে, কেন হরতালের ডাক দিয়েছে তা শোনারও প্রয়োজনীয়তা এখন আর কেউ করছে না। কেননা, সবাই দেখছে কিভাবে আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক দলের ট্যাঙাড়ে বাহিনী রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, কিভাবে চলন্ত গাড়ির ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে, গাড়ির ভেতরে কোনো মানুষ আছে কি না তাও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না, ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে সিএনজি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, বিদেশি পর্যটকের গাড়িতে ভাংচুর চালানো হয়েছে- এসবই ভয়ানক প্রতিহিংসার পরিচয় বহন করে। রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের নামে দেশে এমন অপকর্ম করা হচ্ছে এটিই বাস্তব। সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক-অযৌক্তিক ক্ষোভ প্রশমনের এমন উপায় পৃথিবীতে খুব কমই আছে, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এসব যখন আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে একাকার করে ফেলে তখন জনগণ বিপন্ন বোধ না করে পারে না। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে ১৮ দলীয় জোট আন্দোলনের নামে হিংসাত্মক হরতালের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, তত বেশি জনগণ ঐ সব ঘোষিত কর্মসূচি ও আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর পরিণতি কারো জন্যেই ভালো কিছু হচ্ছে না। যারা আন্দোলন ডেকে এ ধরনের একের পর এক ধ্বংসাত্মক হরতাল করছে, তাদের এখন উচিত হবে জনগণ -এসব হরতাল কতোটা সমর্থন করেছে, এ সব ভাংচুর পোড়াপুড়ির ফল তাদের দল বা জোটের পক্ষে আদৌ গেছে কি না তা পর্যালোচনা করা। যদি না গিয়ে থাকে তাহলে সব কিছু পুনর্বিবেচনা করা একান্তই জরুরি।
দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। জনগণ এ ক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেবে না। সরকার কোনো কারচুপির নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে পারবে -তেমন বাস্তবতা এখন আর বিরাজ করছে না। বিরোধী দলের তাই উচিত হবে আগামী নির্বাচন কী ধরনের সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থায় হলে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে তার একটি রূপরেখা জাতির কাছে তুলে ধরা। সরকার, সুশীল সমাজ, মিডিয়াসহ সকলেই বিষয়গুলো বিচার বিশ্লেষণ করে দেখবে। সে ক্ষেত্রে তাদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ সরকারের থাকবে না, তবে অযৌক্তিক দাবি বা আন্দোলন করলে জনগণ বিরোধী দলকেও সমর্থন জানাবে না। সুতরাং জনগণকে আস্থায় নিয়েই সকল পক্ষকে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
[লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]
