[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গ

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩১
ই. এইচ. কার, তার বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে যেভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন তার প্রতিফলন আমরা আজ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারায় দেখতে পাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে উদারবাদীরা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতামূলক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিবেচনা করে থাকলেও ই. এইচ. কার উদারবাদীদের এরূপ ধারণার সমালোচনাপূর্বক মন্তব্য করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিটা মূলত দুই বা ততোধিক দেশ এবং জনগণের মধ্যকার স্বার্থের দ্বন্দ্ব দ্বারা বিস্তৃত, যেখানে কিছু রাষ্ট্র অধিক ক্ষমতাধর থাকবে এবং অধীনস্ত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা করতে থাকবে। যার দরুন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য এ ধরনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে। আর তাই ই. এইচ. কারের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কটা মূলত সহযোগিতার নয়, বরং স্বার্থগত দ্বন্দ্বের। আর এরই বাস্তবিক উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ এদিকে যেমন আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে তেমনি আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করছে। যদিও ১৯৭৪ সাল থেকে স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের উপর চীন তার আধিপত্য বজায় রেখেছে কিন্তু তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস, মালয়েশিয়া এবং ব্রুনাই এই পাঁচটি রাষ্ট্রও উক্ত দ্বীপপুঞ্জের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করছে। আর এর ফলেই এই ছয়টি দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীন এশীয় অঞ্চলের একমাত্র পরাক্রমশালী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আর এরূপ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই চীন প্রয়োজনে দক্ষিণ চীন সাগরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সামরিক শক্তিরও ব্যবহার করছে। ধারণা করা যায়—অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং রাজনৈতিক স্বার্থের মতো বিষয়গুলো দক্ষিণ চীন সাগরের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধকে আরো জটিলতর করে তুলেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান এরূপ দ্বন্দ্বের ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতার মাত্রাও বেড়েছে অনেকখানি। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক উভয় প্রকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই দক্ষিণ চীন সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সমুদ্রগর্ভে প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদও দক্ষিণ চীন সাগরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের অবস্থান বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। আর তাই চীন শুরু থেকেই নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মূলত দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জে নিজের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। ধারণা করা যায়, যদি চীন দক্ষিণ চীন সাগরে আইনগতভাবে নিজের অধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় তাহলে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের দেশ ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনস এবং ব্রুনাইয়ের উপর নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে যা কি-না পরবর্তীকালে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে চীনের অবস্থানকে নিশ্চিত করবে। আর তাই চীন চাচ্ছে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধগুলোর একটি দ্বিপাক্ষিক সমাধান, যেখানে ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনস চাচ্ছে আমেরিকা এবং আসিয়ানের মধ্যস্ততা। প্রসংগত: উল্লেখ্য যে, স্নায়ু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী সময়কাল পর্যন্ত আসিয়ান দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিল। এমনকি ১৯৭৪ এবং ১৯৮৮ সালের দিকে ভিয়েতনামের কাছ থেকে স্প্রাটলী ও প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিজের অধীনে নেয়ার জন্য চীন শক্তির ব্যবহার করলেও আসিয়ান এ ব্যাপারে চীনকে দায়ী না করে বরং চুপ ছিল। পরবর্তীকালে দ্বন্দ্বের পরিধি ব্যাপকতর হলে ১৯৯২ সালের জুলাই মাসে আসিয়ানের ২৫ তম মন্ত্রিসভার বৈঠকে আসিয়ান ডিক্লিয়ারেশন অন দ্যা সাউথ চায়না সি গ্রহণ করা হয়। যদিও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসিয়ান দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে বিরাজমান দ্বন্দ্বগুলোর একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করছে কিন্তু পক্ষান্তরে তা আসিয়ান কর্তৃক এরূপ পদক্ষেপ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর মধ্যকার আঞ্চলিক একাত্মতার উপর কিছুটা প্রভাব ফেলছে। প্রসঙ্গত বলা যায় যে, যদিও দক্ষিণ চীন সাগর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করছে কিন্তু একই সাথে তা উক্ত অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের বিভাজনও তৈরি করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের যে সকল দেশের জাতীয় স্বার্থ সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধের সাথে সরাসরি জড়িত না তারা চীনের সাথে প্রত্যক্ষ কোন বিরোধে যাওয়ার ব্যাপারে বা চীনের সাথে তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরাজমান দ্বন্দ্বের ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন। কেননা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে একমাত্র অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে উদীয়মান রাষ্ট্র চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ব্যাপারে তারা অধিক আগ্রহী। এরূপ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ চীন সাগরে বিরাজমান সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আসিয়ান এককভাবে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে তা বিবেচনা করার মত বিষয়। অনেকটা ভূ-কৌশলগত কারণে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের উপর নিজের অধিকার দাবি করে আসছে। আর এজন্যেই হয়ত চীন তার সামরিক বাহিনীকে আরো সুসজ্জিত করছে। অন্যদিকে নৌ ও বিমান উড্ডয়নের জন্য এই স্থানকে নিরাপদ রাখা ও এই সমুদ্রপথকে কোন দেশের প্রভাবমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে আমেরিকার নৌ-কৌশলগত স্বার্থও কাজ করছে। তাই বলা যেতে পারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই এখন এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ পারস্য উপসাগরে নৌ ও বিমান বাহিনীকে চালনার জন্য দক্ষিণ চীন সাগরকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। মূলত প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ ম্যাকলেসফিল্ড এলাকা হচ্ছে বিবাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। অন্যদিকে কেবলমাত্র স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়েই এ অঞ্চলের ছয়টি দেশের মধ্যে বিবাদ রয়েছে। সাম্প্রতিককালে কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে তাকেশিমা দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং দিয়ায়ুটাল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপান, চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে নতুন দ্বন্দ্ব জন্ম নিয়েছে। সমুদ্রগর্ভে সম্পদের প্রাচুর্যতা নিয়ে চীন এবং অন্য রাষ্ট্রগুলো আজ যে বিবাদে জড়িয়েছে তার ফলে অনাগত ভবিষ্যতে সম্পদের অপ্রতুলতা দেখা দিলে দক্ষিণ চীন সাগরের উক্ত স্থানগুলো নিয়ে হয়ত প্রত্যেকটি রাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসবে। তেলসমৃদ্ধ স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের উপর এর আশেপাশের ছয়টি দেশ নিজেদের আইনগত অধিকার দাবি করে আসছে। এদের মধ্যে চীন, ভিয়েতনাম এবং তাইওয়ান সম্পূর্ণ দ্বীপপুঞ্জের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করে। আজ দক্ষিণ চীন সাগর মূলত একটি কৌশলগত কোরিডোর হিসেবে চিহ্নিত। জাপান, কোরিয়া এবং চীনের নিকট এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পথ। কেননা মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হতে এসব দেশে তেল ও অন্যান্য পণ্য আনার ক্ষেত্রে এই পথটি ব্যবহার করা হয়। মূলত তিনটি বিশেষ কারণে দক্ষিণ চীন সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি এমন একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ এবং বাইরের দুটি বৃহত্ শক্তি (জাপান ও আমেরিকা) জড়িত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এখানে তেল ও গ্যাসের প্রচুর মজুত রয়েছে, যা উত্তোলনের মাধ্যমে যে কোন রাষ্ট্রই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। আর সবশেষে, গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্র পথে যে কোন দ্বন্দ্ব যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানসহ আরো অনেক বৃহত্ শক্তির স্বার্থকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে।  লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।