বাংলাদেশের অনেকে উন্নত চিকিত্সার জন্য প্রায়শ ব্যাংকক গিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, গত বছর একজন হাজী সাহেবের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেলাম একটি কলম। কলমটি কোন এক গাছের ডাল দিয়ে তৈরি ও দৃষ্টিনন্দন। ভাবলাম, পুণ্যময় মক্কা-মদীনার এই পণ্য পেয়ে ধন্য হলাম। কিন্তু ভাল করে নজর বুলাতে দেখলাম, কলমের গায়ে লেখা- ‘মেড ইন থাইল্যান্ড’। অর্থাত্ এই পণ্যটি সৌদি আরব ঘুরে বাংলাদেশে এসেছে। আমাদের দূরতম প্রতিবেশি দেশ থাইল্যান্ড অর্থনৈতিক উন্নয়নে কতটা অগ্রসর হয়েছে তা এখন সহজেই অনুমেয়।
বদলে যাওয়া এই থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা গতকাল বিকেলে বাংলাদেশে দুইদিনের সফর শেষে রাজধানী ব্যাংককের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। এর আগে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি ভারত সফর করেন। যদিও তিনি দিল্লী হয়ে বাংলাদেশে আসেন, তথাপি তার এই সফর নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে, তার সাথে দক্ষিণ এশিয়ার মেলবন্ধন ঘটাটা খুবই জরুরি। আবার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বিনিয়োগের জন্য এমন দেশ চায় যার শ্রম সস্তা ও প্রবৃদ্ধি বিরাজমান। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড সম্পর্ককে এগিয়ে নেবে।
বাংলাদেশ সফরে ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রথমদিন শুক্রবার রাতে আমাদের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই তার সম্মানে নৌশভোজের আয়োজন করে। সেখানে সংগঠনটির সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চান। কেননা থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণই বেশি। আবার থাইল্যান্ড যেসব পণ্য আমদানি করে, তার অনেক পণ্যই বাংলাদেশে রফতানি হয়। এ থেকে বোঝা যায়, ব্যবসায়িক কৌশলের কাছে আমরা থাইল্যান্ডের কাছেও হেরে বসে আছি।
১৯৮৫-৯৬ সালের মধ্যে থাইল্যান্ডে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়। এখন দেশটি রফতানিপ্রধান দেশে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকট থাইল্যান্ডের মতো উদীয়মান দেশের জন্য অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে। সে দেশের সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে উত্সাহিত করার পর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়। সংরক্ষণবাদকে তারা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। থাইল্যান্ড এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ ইকো-কার উত্পাদক দেশ। পৃথিবীর নামি-দামি ব্র্যান্ড যেমন মিতসুবিশি, সুজুকি ও হোন্ডা কোম্পানি সেখানে সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছে। কৃষি থেকে কিভাবে শিল্পোন্নয়নে সফল হওয়া যায়, বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে থাইল্যান্ডের কাছ থেকে।
থাই প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেছেন গতকাল। এই বৈঠকের পর উভয় দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একটি হল কৃষি খাতে সহযোগিতা ও অন্যটি দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠানের বিষয়ে। অন্যান্য সরকার প্রধানদের ন্যায় তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথেও সাক্ষাত্ করেছেন। এতে বোঝা যায়, দীর্ঘমেয়াদে সুসম্পর্ক রক্ষার জন্য থাইল্যান্ড বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আসলে এশিয়ার সকল দেশই এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশেষ করে কানেকটিভিটি বা যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। থাইল্যান্ড এক্ষেত্রেও এগিয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির সমাজ ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রক বৌদ্ধ ধর্ম, রাজতন্ত্র (বর্তমানে সাংবিধানিক) ও সামরিক বাহিনী। অনেক চড়াই-উত্রাইয়ের পর এখন দেশটিতে বেসামরিক সরকার ও গণতন্ত্র স্থিতিশীল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সামরিক বাহিনী দেশটি শাসন করে। এসময় অনেক অভ্যুত্থান হয়। এরপর ২০০৮ সালে বেসামরিক শাসন ব্যবস্থায় ফেরার পর ক্রমে অবস্থার উন্নতি হয়। এ যাবত্ থাইল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন থাকসিন সিনাওয়াত্রা। গ্রামাঞ্চলে ও গরীব মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। নির্বাসনে থাকায় ও তার সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে আসেন তার ছোট বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। অনভিজ্ঞ হলেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সফলতার পরিচয় দিচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হল, থাকসিনপন্থি রেডশার্ট ও বিরোধী হলুদ শার্ট আন্দোলনে একসময় ধরে নেয়া হয়েছিল যে, থাইল্যান্ডের কোন ভবিষ্যত্ নেই। কিন্তু শেষপর্যন্ত প্রভাবশালী ও উপরোক্ত ত্রিশক্তির সাথে সমঝোতার মাধ্যমে দেশটিতে গণতন্ত্র উজ্জীবিত হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্নিহিত স্থানে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও অনেক সম্ভাবনাময়। এমনকি গত বুধবার ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলিকেও ছাড়িয়ে যাবে। আগামী বছর প্রবৃদ্ধির হিসেবে পৃথিবীর শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় থাকবে বাংলাদেশের নাম। এসব খবর কার না শুনতে ভাল লাগে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নে চাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পালাবদল ও বিজনেস-ফ্রেন্ডলি বা ব্যবসা-বান্ধব সরকার। সরকার আসবে সরকার যাবে, কিন্তু ব্যবসায়ীদের ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কোন ক্ষতি হবে না। থাইল্যান্ডের কাছে এ বিষয়টিও শিক্ষণীয়। আবার তিন মাস বন্যাকবলিত থাকার পরও থাইল্যান্ডের অর্থনীতির তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। এ ধরনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও আমাদের জন্য আদর্শস্বরূপ। পরিশেষে আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড সম্পর্ক আরও মধুর ও সুদৃঢ় হবে।
লেখক : সাংবাদিক
e-mail : [email protected]
