একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও গণসচেতনতার গুরুত্ব

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৩
ট্রেনের ধাক্কায় দুই সন্তানের সামনে নিহত হইলেন মা রত্না খন্দকার। দুর্ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার সকালে। খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের সিগন্যাল গেটের কাছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত ঘটনার বিবরণ হইতে জানা যায়, রত্না খন্দকার তাহার দুই সন্তানকে লইয়া জেলগেটে স্বামীর সহিত দেখা করিতে যাইতেছিলেন। তাহার স্বামী একটি রেস্তোরাঁর ম্যানেজার এবং গত ১০ ডিসেম্বর তাহাকে বিএনপি কার্যালয়ের সম্মুখ হইতে গ্রেফতার করা হয়। সংগত কারণেই মা ও তাহার সন্তানদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ কাজ করিতেছিল। তাহাদের বহনকারী রিকশাটি রেলক্রসিংয়ের সামনেই অপেক্ষা করিতেছিল। এখানে কোন নিয়ম লংঘনের ঘটনা ঘটে নাই। কিন্তু আকস্মিকভাবে বিপরীত দিক হইতে রোড ডিভাইডার (সড়ক দ্বীপ) অতিক্রম করিয়া একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা নিয়ম না মানিয়া রেলক্রসিং অতিক্রম করার চেষ্টা করিলে কমলাপুর হইতে লালমনিরহাটগামী লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনটি উহাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ইহাতে সিএনজি অটোরিকশাটি দুমড়াইয়া-মুচড়াইয়া পার্শ্বে দাঁড়াইয়া থাকা একটি প্রাইভেটকারকে ধাক্কা দেয়। পরে অটোরিকশা ও প্রাইভেটকার উল্টাইয়া গেলে ইহার নিচে চাপা পড়ে তিনটি রিকশা। অন্য রিকশার চালক ও যাত্রীরা বাঁচিয়া গেলেও রত্না খন্দকার বাঁচিতে পারেন নাই। সেইসঙ্গে তাহার দুই সন্তান আহত হয়। জন্ম-মৃত্যু সবকিছুই মহান আল্লাহর হাতে। রাখে আল্লাহ মারে কে আর মারে আল্লাহ রাখে কে-এই কথা আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। রত্না খন্দকার এভাবে প্রাণ হারাইবেন এবং তাহার সন্তানরা বাঁচিয়া যাইবে অলৌকিকভাবে, তাহা উপস্থিত লোকজন ভাবিতে পারেন নাই। তবে এই দুর্ঘটনার জন্য কে বা কাহারা দায়ী তাহাই এখানে আলোচ্য বিষয়। রেলক্রসিং দুর্ঘটনায় সাধারণত আমরা অবৈধ রেলক্রসিং কিংবা গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করিয়া থাকি। এইখানে ইহার কোনটিই ঘটে নাই। খিলগাঁও রেলক্রসিংটি আমরা বৈধ বলিয়াই জানি। সেখানে গেটম্যান উপস্থিত ছিলেন। তিনি ক্রসিংবারও ফেলিয়াছিলেন যথারীতি। কিন্তু সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের ড্রাইভার বেপরোয়াভাবে বারের বা ইহার আশেপাশের ফাঁক-ফোকর দিয়া রেললাইনে উঠিয়া যায় বিপজ্জনকভাবে। ইহারই প্রেক্ষিতে ঘটে দুর্ঘটনাটি। বস্তুত ইহা আমাদের অসচেতনতা, কোনকিছুকে তোয়াক্কা না করা ও অধৈর্যেরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা বিভিন্ন সম্পাদকীয়তে বারংবার ইহার উপরই গুরুত্বারোপ করিয়া আসিতেছি। জনকল্যাণ ও জনস্বার্থ রক্ষায় সরকারকে স্বীয় দায়িত্ব অবশ্যই পালন করিতে হইবে। কিন্তু জনগণ যদি সর্বক্ষেত্রে সজাগ ও সচেতন না হন, তাহা হইলে শেষপর্যন্ত অনেক সমস্যারই সুরাহা হয় না বা হইতে পারে না। দায়িত্বরত গেটম্যান জানাইয়াছেন যে, নিয়ম লংঘন করিয়া রেললাইন পার হওয়ার সময় বাধা দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু চালকরা কথা শোনে নাই। এভাবে তাহার কথা কেহ শোনে বা আবার কেহ শোনে না, বরং অনেক সময় গালিগালাজ বা গায়ে হাত তোলারও চেষ্টা করে। বলাবাহুল্য, এই পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নহে। সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করিতে হইলে সকলকে আইন ও নিয়ম-কানুন মানিয়াই চলিতে হইবে। খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের আইনের হাতে সোপর্দ করা প্রয়োজন। তাহাছাড়া ক্রসিংবার একটু বড় করিতে অসুবিধা কোথায়? রেলপ্রশাসনকে ইহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। বাংলাদেশে নানাভাবে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অহরহই ঘটিতেছে। এভাবে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুরও ইয়ত্তা নাই। তবে গণসচেতনতাই আমাদের বহুলাংশে এই সংকট হইতে পরিত্রাণ দিতে পারে।