নির্বাচন বনাম ‘ওয়ান ইলেভেন’ ভীতি

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৭
দিন যতই এগুচ্ছে নির্বাচন নিয়ে এদেশের সকল দল ও জনগণের ভিতর জল্পনা-কল্পনা ততই বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনের প্রচারণাও শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় দলীয় প্রচারণা চালাচ্ছে। বর্তমানে এই নির্বাচনের বিষয়কে কেন্দ্র করে বৃহত্তর দলগুলির বাহিরে সুশীল সমাজ নামে দলবহির্ভূত একটি অংশের মধ্যে চরম বিতর্ক চলছে। এবারের নির্বাচন অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, নাকি নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাশীল দল বলছে এবারের নির্বাচন নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে করতে হবে এবং বিরোধী দল বলছে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে। এতে নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে অনিশ্চয়তা যেমন দেখা দিয়েছে, আবার তেমনি নির্বাচন যদি অনুষ্ঠিত হয় তবে তা কতটুকুইবা গ্রহণযোগ্যতা পাবে তাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমার ফলে এদেশের জনগণের মধ্যে এবারের নির্বাচন নিয়ে দারুণ শঙ্কাও কাজ করছে। অনেকে আবার ধারণা করছে আদৌও নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে নির্বাচন হবে কি না? যদিও নির্বাচন নিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেরিতে হলেও বৃহত্তর দলগুলির সঙ্গে সংলাপের কাজ শুরু করেছে কিন্তু সেটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। অনেকে আবার মনে করছে সরকারি ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বিশেষ করে দুই দলের প্রধান দুই নেত্রীকে একসংগে সংলাপে বসাতে পারলেই আমাদের জাতীয় সমস্যাগুলি রাতারাতি অর্ধেক হয়ে যাবে। কিন্তু এমন চিন্তা থেকেই বিগত সরকারের আমলে এই কাজটি করা হয়েছিল কিন্তু জাতি কি তাঁদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পেয়েছিল বা জাতীয় ইস্যু ও সমস্যাগুলি কি সমাধান হয়েছিল? প্রধান দুই দলের দুই নেত্রীর ক্ষণিকের মিলন দৃশ্য ক্ষণিকেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, যা এ জাতি অবলোকন করেছে। তারপরও আমরা আশা করবো বিরাজমান সংঘাত পরিহার করে ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলি নিয়ে দুই নেত্রীর একসঙ্গে বসে সমস্যা সমাধানে উভয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বর্তমানে অধিক জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সরকারি ও বিরোধী দলের বিভিন্ন ইস্যুতে একে অপরের বিপরীতমুখী অবস্থান এবং সংঘাত আবার কি আর এক ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর সৃষ্টি করে কিনা এ নিয়ে অনেকের মধ্যে গভীর শঙ্কা কাজ করছে বলে অনেকে ধারণা করছেন পূর্বে বৃহত্তর দলগুলির সংঘাত ও ব্যর্থতার কারণে সুশীল সমাজের সমর্থন নিয়ে বিগত দিনে ‘ওয়ান ইলেভেন’ এসেছিল। যার ভয়াবহতা ও দুর্ভোগ তখন সদ্যবিদায়ী বিএনপিকে প্রথমে ভোগ করতে হয়েছিল এবং পরে তা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের নেতা-নেত্রীদের ভোগ করতে হয়েছিল। ঐসময় বৃহত্তর দলগুলির কেউই এর কবল থেকে মুক্তি পাইনি। বর্তমান দেশে নির্বাচন ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থান এবং যার যার অবস্থানে অটল থাকায় আবার এদেশে যদি ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তবে সেই ক্ষেত্রে অনেকে মনে করছেন, সর্বপ্রথম ধাক্কা ও আঘাতটা আসবে আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের সরকারের উপর এবং পরে আসবে বিএনপিসহ অন্য দলগুলির উপর। তবে এ কথাও সত্য পরিস্থিতি যদি বেগতিক হয় তবে সেই ক্ষেত্রে দেখা যাবে বিরোধী দলগুলিই ওয়ান ইলেভেনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য হবে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন দলগুলির বিরাজমান পরিস্থিতিতে উক্ত বিষয়গুলি সকলের মনে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণের মধ্যে এক প্রকার ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর ভীতি কাজ করছে। শুধু এসব ঘটনাই নয়, বর্তমানে ইসির মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-বঞ্চিত নির্বাচন কর্মকর্তাদের হুমকি, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে অন্ত:কোন্দল শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এই নির্বাচনে বৃহত্তর দলগুলোর কাছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা ও সাফল্য লাভ করবে সেটিই এখন অধিক অলোচিত হচ্ছে। তবে যে পদ্ধতিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠান হোক না কেন তা যেন হয় সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ। আর এই নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ আনয়নে নির্বাচন কমিশনকে আরো অধিক কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাও অনুরূপ জরুরি মনে করছি। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে জনগণে মঙ্গলার্থে কাজ করুন। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আপনাদের ব্যক্তিগত ও দলীয় উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নির্বাচন ইস্যু নিয়ে একে অপরের বিপরীতমুখি অবস্থানের দ্রুত অবসান করুন। আমরা অবশ্যই চাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করুক। কিন্তু দেশে সেই নির্বাচন যেন হয় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ এবং পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত। বৃহত্তর দলগুলির প্রতি আমাদের অনুরোধ জনগণের সেবক হতে চাইলে আন্দোলনের নামে জনগণকে বলির পাঠা বানানো থেকে বিরত থাকুন এবং তাদের শান্তিতে রেখে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তুলুন। জনগণের রায় পাওয়ার জন্য কে কত জনগণের ভাল সেবক তার পরীক্ষা দিন এবং স্বার্থবাদী মহলের ব্যক্তিগত উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের প্রায় ১৬ কোটি জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করুন এবং তাদের ওপর ভরসা রাখুন। এই জনগণই আপনাদেরকে দায়িত্ব দেবে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। দেশের নির্বাচন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিশেষভাবে আমরা অনুরোধ করছি হিংসা-বিদ্বেষের রাজনীতি পরিহার করে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজ মিলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংলাপ কার্যকরী করে বিরাজমান পরিস্থিতির আশু সমাধান কামনা করছি। আশা করছি দেশ ও জনগণের মঙ্গলে বৃহত্তর দলগুলি সংঘাত পরিহার করবেন। লেখক: লাইব্রেরিয়ান, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন