আজ ২৫ ডিসেম্বর, শুভ বড়দিন। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্ববৃহত্ সার্বজনীন ধর্মীয় উত্সব। রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট চার্চের অনুসারী সকলেই বিবিধ আনন্দ-আয়োজন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় উদযাপন করিয়া থাকেন এই দিবসটি। এই ক্রিসমাস বা বড়দিন পালন শুরু হয় ৩৫৪ সালে। তখনই এই দিনটিকে যিশুখ্রিস্টের জন্মদিবস হিসাবে স্থির করা হয়। ইহার প্রায় ৯০ বত্সর পর পোপ এই ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। সেই হইতে পৃথিবীর দেশে দেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায় পালন করিয়া আসিতেছে পুণ্যময় এই দিবসটি।
বড়দিন উত্সবের একটি প্রধান দিক হইল সান্তাক্লজের উপহার। এই সান্তাক্লজের আবার একেক অঞ্চলে একেক নাম। কোথাও তিনি ফাদার ক্রিসমাস, সেন্ট নিকোলাস, বহোম নোয়েল, লা বাফেনা, আবার কোথাও ফাদার ফস্ট। এই দিনে সাজানো হয় দৃষ্টিনন্দন ক্রিসমাস ট্রি। ইউরোপ-আমেরিকায় সাধারণত পাইন বা ফার গাছ দিয়া ক্রিসমাস বৃক্ষ বানানো হয়। ক্রিসমাসের মূল উত্সবটি ২৫ ডিসেম্বর হইলেও এখন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে এবং গীর্জায় ইহার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হইয়া যায় ১ ডিসেম্বর হইতে। ২৫ ডিসেম্বরের পরও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ জুড়িয়া চলে বড়দিনের উত্সব।
খ্রিস্টান সম্প্রদায় যিশুকে ত্রাণকর্তা হিসাবে বিবেচনা করিয়া থাকেন। তাঁহার জন্ম হইয়াছিল জেরুজালেমের বেথেলহেমে একটি গোয়ালঘরে। শান্তির এই মহান বার্তাবাহক যখন ধূলির ধরায় আসেন, তখন পাপ-পঙ্কিলতায় ডুবিয়াছিল মানবসমাজ। মহাগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলে এই মহামানবের অলৌকিক জন্ম ও কর্মের বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। মূলত যিশুখ্রিস্টের জীবন দুইভাগে বিভক্ত। জীবনের প্রথম ত্রিশ বত্সর তিনি ছিলেন মাতা মেরির সঙ্গে। এই সময়টাকে বলা হয় গুপ্ত সময়। দ্বিতীয় ভাগের সময়কাল মাত্র তিন বত্সর। এই সময়টায় তিনি মানব সমাজে প্রকাশিত হন ত্রাণকর্তা ও ধর্মীয় গুরু হিসাবে। তিনি ব্যাপৃত হন মহান স্রষ্টার বাণী প্রচারে। এক লোকালয় হইতে অন্য লোকালয়ে ও ঘর হইতে ঘরে গিয়া তিনি বলিতে থাকেন ক্ষমা ও ভালবাসার কথা। প্রচার করেন সৃষ্টিকর্তার শক্তি ও মহিমার কথা। মনুষ্যত্বের কল্যাণ সাধনই সকল ধর্মের মর্মবাণী। যিশুখ্রিস্ট সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করিয়া মানুষের মাঝে মানবতা, শান্তি, ভালবাসা এবং মিলনের বাণী প্রচার করেন আমৃত্যু।
উল্লেখ্য, খ্রিস্টান সম্প্রদায় যাহাকে যিশু বলিয়া মান্য করেন, মুসলমানদের নিকট তিনি হযরত ঈসা (আ.) হিসাবে পরিচিত, যিনি একাধারে ছিলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহর রসুল ও বান্দা। তাহার উপর অবতীর্ণ হয় ‘ইঞ্জিল শরীফ’, যাহা প্রসিদ্ধ ও প্রধান চারটি আসমানী কিতাবের অন্যতম। মাতা মেরি বা মরিয়মের (আ.) গর্ভে তাহার অলৌকিক জন্ম। ধর্মগত দিক দিয়া অনেক ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকিলেও কিছু ক্ষেত্রে আপসের কোন অবকাশ নাই। এইসব দিক বিবেচনা করিলে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ বলিয়াই প্রতীয়মান হয়।
বস্তুত দুই সহস্রাধিক বত্সর আগে যিশুখ্রিস্ট মানুষের অন্তঃকরণে যে আধ্যাত্মিকতার আলো প্রজ্বলিত করিয়াছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগেও উহার গুরুত্ব এতটুকু কমে নাই। পৃথিবীতে আজও তাঁহার অনুসারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইতোমধ্যে বড়দিন ২০১২ উপলক্ষে পোপ বেনেডিক্ট ষোড়শ ভ্যাটিকান সিটিতে বার্ষিক ভাষণে ঐতিহ্যগত পরিবারের মূল্যবোধ রক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। যখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সে সমকামী বিবাহকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলিতেছে, তখন তাহার এই ভাষণের তাত্পর্য অপরিসীম। বলাবাহুল্য, হযরত লুত (আ.)-এর সময় এই রকম অপরাধে ও সৃষ্টিকর্তার চিরন্তন বিধানকে অগ্রাহ্য করিবার কারণে তাঁহার উম্মতের ওপর আল্লাহর গজব নাযিল হইয়াছিল।
যিশুখ্রিস্টের আদর্শ ও বাণী ভবিষ্যত্ পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য রক্ষাকবচ। আমরা মহান ধর্মসাধক যিশুর এই পবিত্র জন্মদিনে বিশ্বের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষত বাংলাদেশের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
