নিউমোনিয়ার টিকা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৫১
স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক ঘোষণা দিয়েছেন ২০১৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে নিউমোনিয়ার টিকা সংযোজন করা হইবে। ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি নিউমোনিয়া। এক ধরনের জীবাণু হইতে এই রোগের সংক্রমণ ঘটে এবং এখনো নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার উদ্বেগজনক। অবশ্য গত ২০ বত্সরে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাইয়াছে। হাম, যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, পোলিও, হুপিংকাশি ও ধনুষ্টংকার এই ৬টি মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সাফল্য অর্জন করিয়াছে। পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হইয়াছে বাংলাদেশকে। কিন্তু উদ্বেগজনক হইলেও সত্য যে, বাংলাদেশে নিউমোনিয়া প্রতিরোধে অন্যান্য ক্ষেত্রের মত শিশুমৃত্যু রোধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয় নাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস-এর তথ্য মতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে অনূর্ধ্ব ১ বত্সরের শিশুদের শতকরা ৩১ ভাগ নিউমোনিয়ার রোগী। আর উদ্বেগজনক তথ্য, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এই শিশুদের শতকরা ২৪ ভাগ জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে মারা যায় এবং ৫ হইতে ১৪ বত্সরের শিশুদের ক্ষেত্রে এই মৃত্যুহার শতকরা ৮ দশমিক ৬ ভাগ। অনূর্ধ্ব পাঁচ বত্সরের শিশুদের নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হ্রাস না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হইল বাংলাদেশে নিউমোনিয়ার টিকা সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকা। তবে আশার কথা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. রুহুল হক সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আগামী ২০১৩ সাল হইতে ইপিই বা টিকাদান কর্মসূচিতে নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়াছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুহার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়া আসিবে নি:সন্দেহে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বত্সর সারা বিশ্বে প্রায় ১৫৬ মিলিয়ন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং তন্মধ্যে অনূর্ধ্ব ৫ বত্সর বয়সের ২ মিলিয়ন শিশুর জীবন কেড়ে নেয় সহজ প্রতিরোধযোগ্য নিউমোনিয়া নামক এই ঘাতক ব্যাধিটি। বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় আক্রান্তদের মাত্র শতকরা ২৭ ভাগ যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাইয়া থাকে এবং শতকরা ৭৩ ভাগ নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু যথাযথ স্বাস্থ্যসেবার বাহিরে থাকে। ফলে আক্রান্তদের শতকরা প্রায় ৯ ভাগের মৃত্যু ঘটে। আর নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী জীবাণু নিরাময়ে প্রয়োজন হয় মূল্যবান জীবাণুনাশক বা এন্টিবায়োটিকস। অথচ এই রোগটির প্রতিষেধক বা টিকা দেওয়া গেলে নিউমোনিয়ার হাত হইতে বহু শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। দেরিতে হইলেও সরকার এই রোগের টিকা জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে সংযুক্ত করিতেছে। তাহার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ অবশ্যই প্রশংসা পাইতে পারে। দেশের অনূর্ধ্ব ৫ বত্সরের শিশুদের নিউমোনিয়ার টিকাদানের আওতায় আনিতে হইলে এই বিপুল অর্থ কোথা হইতে আসিবে এবং এত বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিনও পাওয়া যাইবে কোথায় তাহা নিয়া আরো সংশয়ের অবকাশ রহিয়াছে। অবশ্য প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে আশার কথা গ্রোবাল ভ্যাকসিন এন্ড ইমিউনাইজেশন কর্মসূচিসহ বাংলাদেশে নিউমোনিয়ার চিকিত্সায় সহায়তার আশ্বাস দিয়াছে। দেশে অন্তত: ২ কোটি অনূর্ধ্ব ৫ বত্সরের শিশু আছে। এইসব শিশুর নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন দিতে অন্তত: ৪ শত হইতে ৬ শত কোটি টাকার প্রয়োজন হইবে। তবে আশার কথা দেশের একটি ওষুধ কোম্পানি হেপাটাইটিস বি, জলাতাংক ভ্যাকসিন, টাইফয়েডের ভ্যাকসিন ও টিটেনাস ভ্যাকসিন দেশেই তৈরি করিয়াছে এবং নিউমোনিয়াসহ আরও কয়েকটি ভ্যাকসিন উত্পাদন প্রক্রিয়ায় আছে। তবে দেশে তৈরি ভ্যাকসিন যাহাতে মানসম্মত হয় এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায় তাহাও নিশ্চিত করা জরুরি। আর দেশে তৈরি ভ্যাকসিন সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হইলে একদিকে যেমন কমমূল্যে প্রতিষেধক পাওয়া যাইবে অন্যদিকে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হইবে। নিউমোনিয়াসহ সব ধরনের ভ্যাকসিন উত্পাদনে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো আরও আগাইয়া আসিলে নিউমোনিয়াসহ শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার আরও কমিবে এবং নি:সন্দেহে তাহাতে রক্ষা পাইতে পারে হাজার হাজার শিশুর জীবন। তাই এই কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন কাম্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন