স্মরণ

চিত্তরঞ্জন সাহা একজন কিংবদন্তি প্রকাশক

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৫২
পুরোনো ঢাকার ফরাশগঞ্জ তখন আজকের মতো এত জনারণ্য হয়ে উঠেনি। এত দোকানপাটও ছিল না। তখন পুরোনো বিবর্ণ সব অট্টালিকা, খুব উঁচু নয়, সেই বনেদী এলাকাটিতে শোভা পেত। হাইরাইজ বিল্ডিং বা নতুন ডিজাইনের বাড়িঘর তেমন একটা চোখে পড়ত না। গাড়ি-ঘোড়ার অত্যাচারে জীবন আজকের মতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেনি তখনও। ফরাশগঞ্জের একটি সরু-শীর্ণ রাস্তার নাম প্যারিদাস রোড। ২২নং বাড়িতে পুঁথিঘর বই বিপণির কার্যালয়, গোডাউন এবং প্রেস। একদিন তখন উনিশশ’ তিহাত্তর হবে হয়তোবা, আমার এক বন্ধুর সাথে তার পাণ্ডুলিপি জমা দিতে সেখানে গিয়েছিলাম। মুক্তধারা প্রকাশনীর কার্যালয় সেখানে ছিল। ভুলও হতে পারে, কত বছর আগের কথা, আমার ঠিকঠাক সব মনেও নেই। শুধু মানুষটির কথা মনে আছে, মুক্তধারার কর্ণধার এবং মূল মানুষ, চিত্তরঞ্জন সাহা। প্রকাশকরা সচরাচর যেরকমটি হন, যেরকম তারা কথাবার্তা বলেন, চিত্তদা সেরকমটি ছিলেন না। তাকে কোনো স্কুল কিংবা কলেজের অধ্যাপক মনে হয়েছিল প্রথম পরিচয়ে আমার । কথা ও অবয়বে কী এক ব্যক্তিত্ব ঠিকরে পড়ছে যেন। আসলে মানুষের মুখাবয়ব আর কথা বড় মূল্যবান দুই অনুষঙ্গ। বিশ্ববরেণ্য নাট্যকার শেক্সপিয়রও তার এক নাটকে এরকম একটি কথা বলেছেন। অনেকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নাটকটির কথা মনে পড়লো চিত্তদা সম্পর্কে লিখতে বসে। আমার যে বন্ধুর সাথে গিয়েছিলাম, চিত্তদার সাথে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় ও সখ্য রয়েছে। তিনি গিয়েছিলেন পাণ্ডুলিপি জমা দিতে। মনে পড়ে অনেক কথার পর চিত্তদা চপকাটলেট আর রসগোল্লা খাইয়েছিলেন আমাদের। বাংলাবাজার খুব কাছেই। সেখানকার এক বিখ্যাত দোকান থেকে তিনি এসব খাবার আনিয়েছিলেন। প্রকাশকরা ভীষণ কৃপণ। তারা লেখকদের খুব একটা সম্মান করেন না। তাদের পাওনা/রয়ালটি পরিশোধ করেন না, প্রতিশ্রুত টাকা দেন না—এসব অপবাদ শুনে এসেছি। কিন্তু চিত্তদার ক্ষেত্রে এসব প্রযোজ্য মনে হলো না। আমার বন্ধুর পাণ্ডুলিপি সসম্মানে নেয়ার পর তাকে একটা তারিখ দিলেন। একুশ দিন পর রিভিউ কমিটি পাণ্ডুলিপিটি ছাপার জন্য নির্বাচন করলে একটা টোকেনমানি তিনি দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। লোক মুখে শুনেছি চিত্তদা লেখকদের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেননি কোনদিন এবং যতটা সম্ভব কমবেশি সবার সাথে তার সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। আমার বন্ধুটি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বয়সের দিক দিয়ে চিত্তদার অনেক কনিষ্ঠ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাকে স্যার বলে সম্বোধন করেন এবং বিদায় মুহূর্তে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেন। আমি এতদিন বাংলাবাজার প্রকাশকদের সম্পর্কে যা যা অপবাদ শুনে এসেছি তার সাথে সেদিন কিছুই মিললো না। এই হলেন চিত্তদা, এই রকম তিনি। বিরতি দিয়ে কথা বলেন, কোনো হামবাগ ভাব নেই। মানুষটি বিনয়ী এবং সহূদয়। ১৯৪৮ সালে চৌমুহনী কলেজ থেকে স্নাতক করেছেন চিত্তরঞ্জন সাহা। প্রকাশনা শুরু করেছিলেন নোটবই দিয়ে। পুঁথিঘরের নোটবই ক্রমশ বাংলাদেশে ব্রান্ডেড হয়ে উঠে। তিনি মার্কেটিং না পড়েও মার্কেটিং বা বাজারজাতকরণ বিষয়টা ভালো বুঝতেন। সারা বাংলাদেশে পুঁথিঘর এবং পরবর্তী পর্যায়ে মুক্তধারা নেটওয়ার্কিং গড়ে তোলেন। কতটা দক্ষতা, দূরদৃষ্টি এবং ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা থাকলে এটা সম্ভব, তা আজ গবেষণার বিষয়। ভুলে গেলে চলবে না সময়টা ষাট ও সত্তর দশক। তদানীন্তত পূর্ব পাকিস্তানে যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মতো ছিল না। সেলফোন, ইমেইল ছিল না সেসব দিনে। টিএন্ডটি ফোন ছিল একমাত্র ভরসা। সেই স্বল্প সম্পদ নিয়েই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তার আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে। মুক্তধারা প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭১ সালে। আর পুঁথিঘর লি. প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫১ সালে। এই কিংবদন্তি প্রকাশকের জম্ম ১ জানুয়ারি ১৯২৭ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমীতে যে বইমেলা অনুষ্ঠিত হতে দেখছি তা প্রথমে শুরু হয়েছিল চিত্তদার উদ্যোগে একাডেমীর সামনের ফুটপাতে। চিত্তদার নামটি সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। তিনিই প্রথম এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন কারো মাথায় এরকম আইডিয়া বা ধারণা আসেনি। চিত্তদা যে মূলত একজন সৃজনশীল উদ্যোক্তা তা বারংবার প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাবাজারের প্রকাশকদের সাথে এখানেই তার পার্থক্য। তিনি অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। সৃজনশীল সাহিত্য রচনা ও সমাজ গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করেন। তরুণ সাহিত্য কর্মীদের উত্সাহিত করার জন্য প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সংকলন ও প্রবন্ধ একুশে সাহিত্য পুরস্কারের সূচনা করেন। কিংবদন্তি এই প্রকাশক বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল। লেখক :কথাশিল্পী ও অনুবাদক ই-মেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন