অনেক জল্পনা-কল্পনা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও স্বাধীনতা লাভের ৪১ বছর পর অবশেষে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে ৪৩ জন শহীদের স্মরণে তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ঘিওর, দৌলতপুর ও তেরশ্রী এলাকার স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনতা লাভের মাত্র চব্বিশ দিন আগে ’৭১-এর ২২ নভেম্বর তেরশ্রী এস্টেটের সাবেক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বেওনেট চার্জ করর এবং গুলি করে নির্মম ও জঘন্যভাবে হত্যা করা হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানিকগঞ্জের আর কোথাও এত বড় ট্রাজেডি ঘটনা ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধে মানিকগঞ্জের ইতিহাসে এটি একটি রক্তাক্ত ইতিহাস বলে আমি মনে করি। আজ ২৯ নভেম্বর সোমবার সকাল ৯টায় মানিকগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার লিয়াকত আলী ফোনে জানালেন মানিকগঞ্জ ‘মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায়’ স্মরণিকা প্রকাশ করা হবে। এ সময় লিয়াকত ভাই স্মরণিকায় একটি লেখা পাঠানোর জন্য আমাকে অনুরোধ জানালেন। সত্যি কথা বলতে লিয়াকত ভাইয়ের অনুরোধেই আজ আমার এই ছোট্ট প্রয়াস। আমার এই লেখায় যদি কোথায়ও কোন তথ্যগত ভুল থাকে বা যদি কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন আশা করি আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এটা পাঠকবৃন্দের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ।
“তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ” নির্মাণ ও এর প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা বা এর সত্য ইতিহাস ব্যাপক এবং এর বিশালতাও অনেক গভীরে। শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পূর্ব পরিকল্পনা এবং ইতিহাস পর্যালোচনায় পরে আসি।
অনেক জল্পনা-কল্পনা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যার অক্লান্ত প্রচেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে যার এত বড় মহতী উদ্যোগ, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে পশ্চিম মানিকগঞ্জের অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি হলেন আমাদের মানিকগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা ১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য এ.বি.এম আনোয়ারুল হক।
“তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ” নামের দৃষ্টিনন্দন নকশায় নির্মিত বিশাল আকারের বেদির উপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৩০ ফুট ও ১৭ ফুট উচ্চতার এ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ঘিওর, তেরশ্রী, দৌলতপুর, টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোল ঘেঁষে তেরশ্রী হাইস্কুল ও তেরশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুকে বিশাল আকারের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি সবার দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিদিন যাত্রাপথে বিভিন্ন জেলা-উপজেলাসহ গামীণ জনপদের হাজার হাজার মানুষ ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে এমন একটি নান্দনিক স্থাপনার উদ্যোগ দেখে মুগ্ধ হয়। আমি আগেই বলেছি তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক মাননীয় সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে, মূলত তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে তার দেশপ্রেম ও বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অংশ হিসেবে তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাই ছিল তার একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। অবশেষে তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে ঘিরর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. আবদুল আজিজ মিয়াকে সভাপতি ও সাংবাদিক মজিবর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ৯ মাস কঠোর পরিশ্রম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় ২২ নভেম্বর তেরশ্রী শহীদদের স্মরণসভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের কথা থাকলেও দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড এবং বিএনপি’র অপরানীতি এবং মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনকে মাথায় রেখেই গত ১৩ নভেম্বর রোজ মঙ্গলবার এক অনাড়ম্বর ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়েছে। তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি ছিল তেরশ্রী এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের। দাবি পূরণ হয়েছে। এখন তেরশ্রী এলাকাবাসীর জোর দাবি যুদ্ধপরাধীদের বিচার করতে হবে এবং বর্তমান সরকারের শাসনামলেই যুদ্ধপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করে তার রায় কার্যকর করতে হবে।
তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সাথে যে সকল ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়/ এলজিইডি/ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মানিকগঞ্জের বিশাল এন্টারপ্রাইজ ও তেরশ্রী এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে এদের সকলের সহযোগিতার জন্য আমি জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন ও লাল গোপালের শুভেচ্ছা।
লেখক :সাধারণ সম্পাদক, তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ বাস্তবায়ন কমিটি, ঘিওর, মানিকগঞ্জ
