সত্যের সপক্ষে শান্তির লক্ষ্যে

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫৬
সত্য কোন প্রতিবন্ধকতা মানে না। সত্যের আড়ালে যে অন্ধকার, সেই অন্ধকারও সত্যের স্ফুলিঙ্গে জ্বলে ওঠে। তাই সত্যকে কখনো আড়াল করা যায় না। তবুও মানুষ সত্যকে আড়াল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এটা অনাদিকাল থেকে হয়ে আসছে। কিন্তু সকলেই অবগত, একশ বছর বা হাজার বছর পরেও অপমৃত্যু হওয়া সত্যগুলো জেগে উঠেছে। আমরা অনেকেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবার কথা বলি, বাস্তবে নিজেরাই ইতিহাসকে গলাটিপে হত্যা করি। বোধোদয় হয় না, চেতনা হয় না, মনুষ্যত্ব প্রকাশিত হয় না। তবুও মানুষ হিসাবে আত্মপ্রকাশের আত্মতৃপ্তিতে নিমগ্ন থাকি। কদিন আগেই সারাদেশে বিজয় দিবস পালিত হলো। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের এই গৌরবময় দিনটিতে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম কখন কীভাবে উচ্চারণ করেছি! রাজনৈতিকভাবে এই নামটি উচ্চারিত হলেও জাতীয়ভাবে উচ্চারিত হয়নি। বড় দুঃখ হয় যখন আমরা জন্মদাতার নাম বিস্মরণের খেয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদেরকে মহীয়ান করে তুলি। বলতে চাচ্ছি বিরোধী দলের কেউই বঙ্গবন্ধু নামটি উচ্চারণ করেন না, যদিও বিএনপি বা জাতীয় পার্টির অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের শক্তি। এই ‘শক্তি’ বুঝা বা জানার ক্ষমতা আমাদের নেই। কারণ আমরা জানি কতিপয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ গোত্রের ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমি দেখেছি ভারতে যাওয়ার পথে আমাদের বাড়িতে অনেক লোক আশ্রয় নিয়েছে এবং ঘরে ও উঠোনে প্রচুর লোকসমাগম হয়ে আমাদের বাড়িটা একটা শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে। আমার দাদী ও মা-চাচীরা রান্না করে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আমি কি আমার মা, চাচী, দাদীকে মুক্তিযোদ্ধা বলতে পারি না? সে হিসেবে কতিপয় যুদ্ধাপরাধীকে কেন একটি শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করব? তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করা অনেক আগেই জরুরি ছিল। সেই ব্যর্থতার দায় মাথায় রেখে এখনো দ্রুততম সময়ে কাজটি করা সম্ভব। এদিকে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল হরতাল ডেকে তাদের নিবন্ধন বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। এটা কি প্রহসনমূলক নয়? বিরোধী দলের হরতালে আমরা পুড়ছি, জ্বলছি, জীবন দিচ্ছি, তার মধ্যে সরকারি দলের হরতালও আমাদেরকে মাথা পেতে মেনে নিতে হচ্ছে। এই রাজনৈতিক অপকৌশলের শেষ কোথায়? নিবন্ধিত কোন দলকে যদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতেই হয়, সরকারকে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হবে, যেটা আইনসঙ্গত এবং সংবিধানসম্মত হয়। হরতালের জনসমর্থন দিয়ে এই ব্যবস্থার পক্ষে কোন জোরালো যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব নয়। আমাদেরকে সকল প্রকার অপরাজনীতির অপপ্রচার, অপকৌশল ও অপকর্ম থেকে সজাগ থাকতে হবে। বিশ্বজিত্ হত্যার ঘটনায় কয়েকজন সন্ত্রাসী গ্রেফতার হলেও পত্র-পত্রিকায় দেখলাম তাদেরকে মুক্ত করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির আঁটা হচ্ছে। বিশ্বজিতের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বিশ্ব হতবাক হলেও আমরা বিস্ময় প্রকাশের বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়—অর্থাত্ বিস্ময় প্রকাশ করাটাও বিস্ময়ের ব্যাপার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন বিশ্বজিত্ হত্যার ঘটনা, পোশাক কারখানায় অগ্নিসংযোগে নিহতের ঘটনা এবং রামুর মন্দির পোড়ানোর ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একই সূত্রে গাঁথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি সূত্রটিকে জেনেই থাকেন তাহলে কেন সেটা সমূলে বিনাশ করা হয় না? কয়েকদিন আগেই মাননীয় আইনমন্ত্রী বললেন বিশ্বজিতের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমরা বলতে চাই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন সেটা বড় ব্যাপার নয়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধী যেই হোক তাকে বিচারের আওতায় এনে সঠিক বিচার করার দায়িত্ব সরকারের। সংবাদপত্রের ছবি ও টিভিতে ভিডিও ফুটেজ বাদই দিলাম, যদি প্রধানমন্ত্রীর কথাকেও গুরুত্ব দেই তাহলেও জানা যাচ্ছে বিশ্বজিেক কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অথচ পত্রিকায় দেখলাম, ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বজিতের শরীরে কোনো কোপের চিহ্ন নেই। এই নাটক আর কতদিন মঞ্চস্থ হবে? সন্ত্রাসীদের বাঁচানোর অপকৌশল আর কত দেখতে হবে? রামুর ঘটনার প্রধান আসামী জনসম্মুখে আসায় স্থানীয় ওসি সাহেবকে ক্লোজ করা হয়েছে। সরকারের ভিতরে এত দুর্বলতা কেন? শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশকে জামিন দেওয়া হয়েছে অথচ প্রশাসনের অনেকেই অবগত নন। কিন্তু পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি এই জামিনে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। আমরা মূলত কিছুই বুঝি না, বুঝতে চাইও না। শুধু নিরিবিলি থাকতে চাই, নিরাপদে থাকতে চাই, নির্বিবাদে থাকতে চাই। এই ব্যবস্থাটা সরকারের নেওয়া উচিত কিন্তু সরকারই আমাদেরকে ধূম্রজালের ভিতরে নিক্ষেপ করে অঙ্গুলি প্রদর্শন করে বলেন, আমরা পূর্ণ গণতন্ত্রের মধ্যে বসবাস করছি। গণতন্ত্রের মানে বুঝি না। গণতন্ত্রের মানে যদি স্বাধীনতা হয় আমরা সকলেই স্বাধীন। ফলে যার ইচ্ছে হরতাল-অবরোধ ডাকব, যার ইচ্ছে গাড়ি-বাড়ি ভাঙব, যার ইচ্ছে অগ্নিসংযোগ করব, যার ইচ্ছে যা খুশি করব। এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম? প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা বেশ কিছুদিন যাবত্ একটি কথা বলছেন, দেশ বড় একটা সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলছে এবং এই সংঘাত না বাধা পর্যন্ত স্থির হবে না। আমরা এটা কখনও প্রত্যাশা করি না। আমরা চাই প্রতিটি মানুষের বিবেক জাগ্রত হোক, প্রতিটি মানুষ অন্যায়কে পদদলিত করুক, প্রতিটি মানুষের ভেতরে ভালোবাসা বাসা বাঁধুক। সকল সত্য উদ্ভাসিত হোক, সকল সত্য সূর্যালোকের চেয়েও অধিক আলোয় আলোকিত হোক। শান্তিতে পরিপূর্ণ হোক বাংলাদেশ। লেখক : কবি ও শিশুসাহিত্যিক ইমেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন