কেমন আছে বাংলাদেশ! কেমন ছিল! কী অপেক্ষা করছে সামনে আমাদের! বছর শেষে এইসব প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অতি ভদ্র সুশীল যারা, জ্ঞানী যারা, তারা বর্তমান দেখে, দেশের ভবিষ্যত্ ভেবে আকুল-ব্যাকুল, ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। গোল টেবিলে, টেলিভিশনে, পত্রিকার পাতায় তারা ঝড় তুলছেন অহরহ। বছর শেষে, পৌষে যেমন পড়েছে শীত, তেমনই কুয়াশা। সকালে ও সন্ধ্যায় কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারদিক, সামনে কিছুই দেখা যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিও যেনবা হয়ে পড়েছে তেমনই কুয়াশায় ঢাকা। রাজনীতিতে শীত নেই, বরঞ্চ উত্তাপ বেশ। তাহলেও কুয়াশা। দেশ-রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেবে—এই নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। বিরোধী দলের সাফ কথা, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না। পক্ষান্তরে সরকারি দল বলছে নির্বাচন হবেই। সরকারি পক্ষের কেউ কেউ এমনও বলছেন, সব দলকে নিয়েই নির্বাচন হবে। ইলেকশন হবে কি হবে না, তা নিয়ে যখন সন্দেহ-সংশয়, বিরোধী দল যখন আন্দোলন-সংগ্রামে রত, তখন মাঝে মাঝেই আবার বলা হচ্ছে, দেশে জরুরি অবস্থা আনার ষড়যন্ত্র হচ্ছে! কেউ কেউ গৃহযুদ্ধের আলামতও দেখতে পাচ্ছেন! এমনও শোনা যায় যে, দেশে আরেকটা ১৫ আগস্ট তৈরির চক্রান্ত চলছে! প্রধান দুই দলের দুই নেতা পরস্পর বিষোদ্গার করছেন। কে কত বড় চোর, কে কার মা, কার মায়ের গলা কত বড়, তা নিয়ে চলছে বাহাস।
অন্যদিকে তৃতীয় শক্তির কথা বলা হচ্ছে। এই তৃতীয় শক্তি জিনিসটা যে কী, তা নিয়েও ধূম্রজাল। দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তৃতীয় শক্তির উত্থান প্রয়োজন, এমন বেমক্কা কথাও বলা হচ্ছে প্রকাশ্যে। তৃতীয় শক্তি বলতেই বাঙালির মনে পড়ে যায় ভয়ংকর ওয়ান ইলেভেনের কথা! মনে পড়ে পৈশাচিক পঁচাত্তরের কথা, মনে পড়ে যায় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ও তত্পরবর্তী ৯ বছরের দুঃশাসনের কথা। যারা আকারে-প্রকারে তৃতীয় শক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন তাদেরই কেউ কেউ বলেন, ‘এরশাদকে আমরা এত খারাপ বলি, কিন্তু তার চেয়েও খারাপ দুই নেত্রী।’ বাহ বা! হাততালি পাওয়ার মতই এই নির্বোধ মূল্যায়ন। আর বিদগ্ধ একজন; যিনি কিছুদিন আগে দেশবাসীর প্রতি এই বলে আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, ‘হুমায়ূন আহমদের নাটকের পোষা পাখিটি যেমন বলতো তুই রাজাকার, তেমনই যেখানে আওয়ামী লীগের কাউকে দেখবেন, সেখানেই বলবেন, তুই চোর। তুই চোর’—সেই তিনি গত বুধবার গোলটেবিলে বলেছেন, দেশ পরিচালনায় দুই নেত্রীই মেধাহীন। শুনে ভাবে অভাজন, তা তো হবেই। সব মেধা যখন চলে গেছে সুশীলকূলের মাথায়, তখন রাজনৈতিক নেতাদের মাথায় কতটুকুইবা আর অবশিষ্ট থাকে!
এই যখন অবস্থা, তখন ভবিষ্যতে চার্লস ডিকেন্সের মত কেউ একজন হয় তো আমাদের এই সময়টাকে বর্ণনা করতে চাইবেন এই ভাবে, ‘সেই সময়টা ছিল খুবই ভাল, সে ছিল খুবই খারাপ সময়, সেই যুগটা ছিল জ্ঞানীদের, কালপর্বটি ছিল নির্বোধদের।’ চার্লস ডিকেন্স ঠিক এভাবেই শুরু করেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘এ টেল অব টু সিটিস’। অথবা নিকেলোই ভি গোগলের ব্যাঙ্গাত্মক উপন্যাস ‘মৃত আত্মা’র বিবরণ পাঠ করে পুশকিন যেমন বলেছিলেন, ‘হা ঈশ্বর! কী বেদনার্ত এই দেশ রাশিয়া!- তেমনই কেউ বলতে পারেন, হে আল্লাহ! কী দুর্ভাগা এই বাংলাদেশ’।
সমাজ ও রাজনীতির এই সময়টাকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন, আমরা বলি, এত দুঃখিত, তাপিত ও বিচলিত হওয়ার কি আছে! বিষয়টা তো নির্বাচন! তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে নির্বাচন হবে না, এ তো কোনো কাজের কথা নয়। অন্তত আমাদের ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়। একটি বা একাধিক দলকে বাদ দিয়ে, তাদের ইলেকশনের বাইরে রেখে এদেশে নির্বাচন কি অতীতে হয়নি! আমাদের মনে কি পড়ে না ১৯৮৬ সালের সেই ইলেকশনের কথা। সেই সময়কার দুই জোটের একটিকে বাদ দিয়ে ইলেকশান হয়ে গিয়েছিল আলবত্। তারপর ২ বছর যেতে না যেতেই, ৮৬-এর নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক মোর্চাটি যখন দেখলো যে, তাদের প্রাপ্তিযোগ ঘটেছে ‘দিল্লিকা লাড্ডু’, তখন তারা সদলবলে সংসদ থেকে পদত্যাগের কোশেশ করছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে সংসদ ভেঙে দিতে হয়েছিল। তারপরও কি দমে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের দি প্রিন্স, যিনি শৃগালের মত ধূর্ত এবং হায়েনার মত হিংস ; মেকিয়াভ্যালির ‘দ্য প্রিন্স’-এরই প্রতিমূর্তি যেনবা। ১৯৮৮ সালে তিনি তো দুই জোটকেই বাইরে রেখে নির্বাচন করতে পেরেছিলেন। তাতে হয়েছেটা কী! চিন্তাশীল বিশ্লেষকরা বলবেন, পরিণাম তো তার ভাল হয়নি। টানা ন’ বছর দাপিয়ে শাসন কিংবা দুঃশাসন চালিয়ে স্বৈরাচারের রাজটীকা মস্তকে ধারণ করে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে। প্রবল গণজোয়ারে তিনি ভেসে গিয়েছিলেন তৃণখণ্ডের মতো। সত্যবটে, ভেসে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কি এমন এসে গেছে তাঁর! গণতন্ত্রীরা নাম দিয়েছে তার স্বৈরাচার। মুখের কথা মুখেই রয়ে গেছে নিন্দুকের। মাঝখান থেকে তিনি এখন ডুগডুগি বাজিয়ে বলতে পারেন ‘নিন্দা আমার সাতনরি হার অলংকার।’
আমরা যে কুশিলবের কথা বলছি, তিনি ছিলেন, তিনি আছেন। তিনি সরকারের সঙ্গে আছেন, তিনি সরকারের সঙ্গে নাই। তিনি স্বপ্ন দেখেন কখনো বিরোধী দলের নেতা হওয়ার, কখনো বা হারানো স্বর্গ ফিরে পাওয়ার। এই তো সেদিন রসিক নির্বাচনে তার রসিকতার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন ভোটার সাধারণ। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সেই সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে শুরুতেই বলেছে যে, তার দুর্গে ধস নেমেছে। বালাই ষাট! এমন কুশলী কুশিলবের দুর্গে ধস নামতে পারে কেমন করে! নামলে নেমেছে, তাতেই বা কি যায় আসে! ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাজনীতির মাঠে তিনি যে পদচিহ্ন রেখে গেছেন, সেটা তো মুছে যায়নি। তার সেই পদাংক তো অনুসরণ করা যেতেই পারে। যদি তার সঙ্গে জোট বাঁধতে পারি, যদি তার দলকে সরকারে রাখতে পারি— তাহলে তার পদাংক অনুসরণ করা যাবে না কেন? নিশ্চিয়ই যাবে। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ইলেকশনে আওয়ামী লীগ ও তার মোর্চা যায় নাই। তাই বলে কি ইলেকশন হয় নাই! সেই নির্বাচনের পর গঠিত সরকার স্বল্পায়ু হয়েছিলো। কিন্তু ইলেকশন তো হয়েছিলো। আর সেই সংসদেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিলো। সেই সরকার স্বল্পায়ু হয়েছিল তার কারণ হিসাবে এতদিন পরে বলাই যায় যে, তারা নব্বইয়ে পতিত স্বৈরাচারের পদাংক অনুসরণ করতে দ্বিধা করেছিলেন। দ্বিধা করা ঠিক হয় নাই। এখন এইকালে, এতদিন পরে, যারা বিরোধী দল অথবা সকল দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের কথা ভাবেন কিংবা দ্বিধাবোধ করেন, তাদের সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলা উচিত। সেই ধূর্ত প্রিন্সের কার্যত কোনো দল ছিলো না, দৃশ্যত কোনো জ্ঞানী-সুশীল তার পক্ষে ছিলেন না। অথচ তিনি দুই দুইটি ইলেকশন করতে পেরেছিলেন। আর আজ যাদের বিরাট দল রয়েছে, জোট রয়েছে— সর্বোপরি আছে দ্য প্রিন্সের সমর্থন-সহযোগিতা, তারা কেন পারবেন না! পারতে তাদের হবে, পারা তাদের অবশ্য কর্তব্য।
রাশিয়ায় ভলগার তীরে বৃষ্টি হলে ঢাকায় যারা ছাতা ধরতে অভ্যস্ত ছিলেন, সঙ্গে আছেন সেই কমিউনিস্টরাও। আছে তারাও, যারা থিসিস এন্টিথিসিস অতঃপর সিন থিসিস করে করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পথ ধরে ক্ষমতাবৃত্তে এসে রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। এ অবস্থায় একটা ইলেকশন করা কোনো ব্যাপার না। এমন সোনালী দিনেও যদি একটা সামান্য ইলেকশন, সবাইকে বাদ দিয়ে হলেও করা না যায়, তাহলে সেই ভদ্রের কথাই ঠিক হয়ে যাবে, যিনি বলেছেন যে, তার চাইতেও খারাপ এরা। যথার্থ হয়ে যাবে সেই বিদগ্ধজনের কথাও, যিনি বলেছেন দুই নেত্রীই দেশ চালনায় মেধাহীন। না। এমনটি সত্য হতে পারে না। এ যে অসত্য, তার প্রমাণ দিতে হবে। মেধা এবং দক্ষতার প্রমাণ দেয়ার সময় এসে গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সংসদীয় আসনের সীমানা ইত্যাদি নিয়ে যারা তর্ক করে, সংগ্রাম করে, তারা তা করে যাক। এ তো জানা কথা, তর্কে বহুদূর। কাজেই, যথাসময়ে অথবা তার আগেই ইলেকশন হয়ে যেতে পারে বৈকি! ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে—তবে একলা চল রে’। অতঃপর নো আপস।
লেখক : সাংবাদিক
email: [email protected]
