আলোকপাত

আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১০
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে ফেলে আসা শৈশবের পাঠ্যবইয়ে পড়া নীতিবাক্যগুলো হঠাত্ করে মনে পড়ে দুঃখ ঘনালো হূদয়ে। আমরা কেন আজকের যুগের ছেলেমেয়েদের মনে সেই আদর্শ বাক্যগুলো গ্রথিত করতে পারিনি। তাহলে পত্রিকার পাতায় দেখতে হতো না লাঠি, পিস্তল, চাপাতি হাতে ধেয়ে চলা উগ্রমুখের রুদ্র ছবি। এরা কারা? আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই দুধে-ভাতে লালন করা আপনজন। ছেলেবেলায় চঞ্চলতার মধ্যে তারা বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করেছে, বাঁশপাতার বাঁশি বানিয়েছে, নদীর তীরে নৌকোবাইচ দেখতে গেছে। ওদের মনে ছিলো সোনালী স্বপ্ন, রামধনুর সাত রঙ তাদেরও জীবনকে করে তুলেছিলো বর্ণময়। পেয়ারা গাছে উঠে পেয়ারা পেড়েছে, ঢিল ছুঁড়ে কাঁচা আম পেড়ে নুন-মরিচ সহযোগে বন্ধুদের সঙ্গে খেয়েছে, কখনোবা ছিপ ফেলে পুকুরে মাছ ধরেছে। হঠাত্ করে পাল্টে গেলো পরিবেশ, গাছ-পাতার সবুজ আকাশের নীল নদীর ঢেউ সব হারিয়ে তারা বন্দি হলো ইট-কাঠ, লোহা-লক্কড়ের খাঁচায়, যার নাম শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ি। দম ফেলার জো নেই, অল্প পরিসরে অনেক লোক, যেন জাল টেনে আটক করা মাছ। এভাবেই ধীরে ধীরে কিছুটা পড়াশোনাও করল তারা, কিন্তু সুকুমারবৃত্তির চর্চা থেকে গেলো অনুপস্থিত। পরীক্ষায় পাস করে গেলেও চাকরির নিশ্চয়তা নেই, মায়ের গঞ্জনা, বোনের দীর্ঘনিঃশ্বাস নাগপাশের মতো ঘিরে ধরল তাদের। সেই হতাশা, সেই না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে গেলো অনৈতিক জীবনে। টাকা রোজগারই একমাত্র লক্ষ্য, কিভাবে তা তাদের ভাবনার বিষয় নয়। আমাদের এখন দায়-দায়িত্ব, চিন্তা-চেতনা অন্য খাতে প্রবাহিত করতে হবে। মানুষ হিসেবে ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু ঘরে ঘরে পাওয়ার ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে। সস্তা রাজনীতির পথ যে অতি ভয়ংকর সেই বোধটুকু একটি তরুণ প্রাণে প্রোথিত করতে হবে, লাঠবাজি নয়, অসির চেয়ে মসি বড়-এটাই আসল সত্য। পরিশ্রম করে, গায়ের ঘাম ঝরিয়ে কিছু না কিছু তো পাওয়াই যাবে। শুধু অফিসের দাপ্তরিক কাজ নয়, মাঠে-প্রান্তরে কৃষিকাজ, নদীতে জাল ফেলা জেলের কাজ, তাঁতঘরে তাঁতির কাজ, কুঠার হাতে কর্মকার, সবকিছুর মধ্যেই আছে সম্মান ও উপার্জন। ভিক্ষুকের মতো হাত পেতে নয়, পরিশ্রম করে নিজ উপার্জন যে মহত্ বার্তাটুকু আনে তার সুবাস ফুলের মতো ছড়িয়ে দিতে হবে নবীন হূদয়ে। রাজধানীর পথে পথে অগণিত ভিক্ষুকের ভিড়, পাঁচ বছরের শিশু, বারো বছরের কিশোরী থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধ কার না ঠাঁই নেই সেখানে। কাঁখে ছ’মাসের বাচ্চা নিয়ে ভিখারিণী মা যখন হাতটি বাড়িয়ে দেন, তখন মনে হয় এই শিশুকে কোলে নিয়ে বাড়ি চলে আসি, তার মাকে দিই পুষ্টিকর খাদ্য, রোদ-হাওয়ায় বেড়ে উঠুক শিশুটি। দেখুক এই সুন্দর বসুন্ধরার রূপ। যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে, যারা অল্প বয়সে পিতা-মাতার সঙ্গে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, তারা যখন বহুদিন পর স্বদেশে এসে আপনজনকে পাওয়ার আনন্দ অনুভব করেন, একই সঙ্গে অভাব-অনটন, ভিক্ষা ও না খেতে পাওয়া রুগ্ন মুখকে পথের পাশে দেখে নিদারুণ কষ্ট পান। আমার ভাইয়ের মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে কলেজে পড়ায়, তার সঙ্গে যাওয়া ছোট কিশোরী এখন বড় হয়ে এসেছে নিজের দেশকে চিনে নিতে। খাওয়ার টেবিলে বসে চোখে পানি নিয়ে তোনামি নামক মায়াবী তরুণী বলল, ‘নানু কেন আমাদের দেশে এতো লোক না খেয়ে দিন কাটায়, আর আমাদের প্লেটে কেন শিশুরা মুরগির টুকরো অর্ধেক খেয়ে অর্ধেক না খেয়ে ভাত ছড়িয়ে রেখে উঠে যায়’। এই যে বৈষম্য দিনের পর দিন দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি, হয়ে গেছি পাষাণ হূদয়, এর কি পরিবর্তন প্রয়োজন নেই। মায়ার পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে একদিন চলে যেতে হবে, তার জন্য পাথেয় সঞ্চয়ের দিন তো চলে যাচ্ছে। আসুন না সবাই মিলে যৌথভাবে কিছু পরিকল্পনা নিই দেশকে নতুন করে আগের সোনালী দিনগুলো ফিরিয়ে দেয়ার। দু’মুঠো অন্ন, দু’খানি বস্ত্র, মাথার উপর টিনের চাল এমন কিছু বেশি চাওয়া নয়, একে পূর্ণ করা অসাধ্য নয়। প্রয়োজন শুধু ব্যাংক-ব্যালেন্স না বাড়িয়ে দানের হাতটুকু এগিয়ে দেয়ার। লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন