এই ঔদ্ধত্য ক্ষমার যোগ্য নহে

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২০
ইহা সর্বজনবিদিত যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকেরই স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করিবার অধিকার রহিয়াছে। তবে কোনো অধিকারই সীমাহীন নহে। অধিকারের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়াইয়া আছে দায়িত্ববোধের বিষয়টিও। ইহার সাদামাটা অর্থ হইল— আমরা যাহা ইচ্ছা তাহা করিতে বা বলিতে পারি না। নিজের অধিকার ভোগ বা প্রয়োগ করিতে গিয়া কোনোভাবেই যাহাতে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় সেইদিকে যেমন সতর্ক নজর রাখিতে হইবে, তেমনি বিরত থাকিতে হইবে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বক্তব্য প্রদান কিংবা আচরণ হইতেও। কিন্তু গত বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে জ্ঞানীগুণী বলিয়া পরিচিত স্বনামখ্যাত কয়েকজন ব্যক্তি যেইসব কথাবার্তা বলিয়াছেন— তাহা দায়িত্বহীন শুধু নহে, চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণও বটে। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে অযোগ্য অক্ষম আখ্যায়িত করিয়াই তাহারা ক্ষান্ত হন নাই, ‘বিশ্ব বেহায়া’ নামে খ্যাত অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী একজন স্বৈরশাসকের সহিত তুলনা করিয়া সাবেক ও বর্তমান দুই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এমন মন্তব্যও করিয়াছেন যে, ‘দুই নেত্রী এরশাদের চাইতেও খারাপ’। সর্বাপেক্ষা দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হইল, দুই নেত্রীর প্রতি বিষোদ্গার করিতে গিয়া আমাদের কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে যেমন হেয় করা হইয়াছে, তেমনি গুণকীর্তন করা হইয়াছে গণধিকৃত স্বৈরশাসনের। এমনকী দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও টানিয়া আনা হইয়াছে অযাচিতভাবে। অতএব, নিকট অতীতের তিক্ততম অভিজ্ঞতার আলোকে ইহা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, ইহা নিছক দুই নেত্রীর প্রতি তাত্ক্ষণিক ক্ষোভ বা বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ মাত্র নহে, বরং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত আক্রমণও বটে। সঙ্গত কারণেই এই ঔদ্ধত্য ক্ষমার যোগ্য নহে। আমরা জানি যে, বিদ্যমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা লইয়া জনমনে হতাশা ও ক্ষোভ আছে। বিশেষ করিয়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন যাবত্ যেই সংঘাত ও অনিশ্চয়তা চলিয়া আসিতেছে— তাহাতে জনগণ বিরক্ত শুধু নয়, উদ্বিগ্নও বটে। কারণ ইহার পরিণাম কতো ভয়াবহ হইতে পারে— সেই অভিজ্ঞতা যেমন তাহাদের আছে, তেমনি ইহা লইয়া বিস্তর কানাঘুষাও যে চলিতেছে তাহাও অস্বীকার করা যাইবে না। এই ক্ষেত্রে যে কোনো দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হইল— শত প্ররোচনার মুখেও গণতন্ত্রের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখা। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বৈরশাসনকে প্ররোচনা দেওয়া বা তাহাদের গুণকীর্তন করা কোনো দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য হইতে পারে না। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, সামরিক স্বৈরশাসন কী জিনিস তাহা আমরা ভালো করিয়াই জানি। সেই আইয়ুবী সামরিক শাসন হইতে ‘বিশ্ব বেহায়া’র শাসন অবধি— বহু সামরিক স্বৈরশাসন আমরা দেখিয়াছি। সর্বশেষ সেনাসমর্থিত কতিপয় তথাকথিত ‘সুশীল’ কর্তৃক প্ররোচিত স্বৈরশাসন দেখার দুর্ভাগ্যও আমাদের হইয়াছে। প্রতিটি স্বৈরশাসনের পতনের পর তাহাদের কী পরিণতি হয়— তাহাও দেশবাসীর অজানা নহে। অধিকারবঞ্চিত জনগণের নজিরবিহীন দুর্ভোগের প্রসঙ্গ নাই বা তুলিলাম। যাহারা নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় বিজ্ঞ বা বিদগ্ধ বলিয়া দাবি করেন— এমন ব্যক্তিরা কিভাবে স্বৈরশাসনের সাথে গণতন্ত্রের তুলনা করিতে পারেন তাহা ভাবিতে অবাক লাগে। শুধু তাহাই নহে, তাহারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরশাসকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইলেন, অথচ জনগণের ভোটে যাহারা দুইবার করিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হইয়াছেন সেই দুই নেত্রীর প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকুও প্রদর্শন করিলেন না। ইহাকে আর যাহাই বলা হউক, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বলা চলে না। সুযোগ পাইলেই যাহারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্বের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন— তাহাদের উচিত সর্বাগ্রে আয়নায় নিজের মুখটি দেখা এবং জনগণের নিকট নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করিয়া নেওয়া।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন