[ রা জ নী তি ]

এই অসহিষ্ণু রাজনীতির শেষ কোথায়

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২২
অন্তত: তত্ত্বগতভাবে গণতন্ত্র সকল নাগরিকের সমান অধিকার স্বীকার করে। সকলের মত প্রকাশের অধিকার মেনে নেয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। নাগরিকদের সংগঠিত হওয়ার এবং প্রতিবাদ করার অধিকারকে সাংবিধানিকভাবে অনুমোদন করে। বহু দল-মতের বিকাশ তথা বিরোধী দলের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া হয়। আইনসম্মতভাবে প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ ও সমালোচনা সহ্য করাও গণতন্ত্রেরই অংশ। জনগণের ইচ্ছায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সরকারের নির্বাহী দায়িত্ব লাভ করে থাকে। আবার একইভাবে সেখান থেকে সরে আসতে হয় তাদের। এগুলো হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল স্পিরিট বা মর্মবাণী। একে বলা যায় উদার গণতন্ত্র বা লিবারেল ডেমোক্রেসি। আর এসবের ব্যত্যয় হলে তখন মনে করা যায় রাষ্ট্রে গণতন্ত্র নাই, গণতন্ত্রের আবরণে তা স্বৈরশাসন। বাংলাদেশ একটি নবীন জাতিরাষ্ট্র। এর প্রতিষ্ঠার পিছনে উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা প্রত্যাশা সততঃ বিদ্যমান থেকেছে। দেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের জন্য বহু লড়াই সংগ্রাম করেছে, অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করেছে। অথচ আজকে রাজনীতিকদের অসঙ্গত কার্যকলাপের ফলে গণতন্ত্র বিপন্ন, জাতি হতবিহ্বল। শাসকদের কঠিন হাতে গণতন্ত্রের পত্রপল্লব পুষ্প দলিত মথিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে উঠছে। উদার গণতন্ত্রের চর্চা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অপশাসনের কুিসত রূপটি পরস্ফুিট হয়ে উঠছে। কর্কশ রূঢ় হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের কণ্ঠস্বর। নিত্য উচ্চারিত হচ্ছে নানা হুঙ্কার-হুমকি, শক্তির প্রদর্শনী হচ্ছে রাজপথে। উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির ময়দান। সহিষ্ণুতার শীতল হাওয়া নিরুদ্দেশ। দেশ নিরন্তর সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। ক্ষমতাসীন সরকার ও তাদের দল এখন একাকার, অভিন্ন সত্তা। রাষ্ট্র ও সরকারের যে সম্পর্ক তা যেমন দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে তেমনি দল ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব মুছে গিয়ে এক নৈরাজ্যকর অবস্থার দিকে দেশ ধাবমান। গণতন্ত্র পথ হারিয়ে ফেলছে। ইতোমধ্যে দেশের যেসব অঙ্গ/প্রতিষ্ঠান দেশজনগণের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত যেমন সরকার পুলিশ দুদক নির্বাচন কমিশন আইন আদালত আমলাতন্ত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রভৃতি স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে হারিয়ে ফেলছে। এরা জনগণের কর্তৃত্বাধীন বিষয় না থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ তথা সরকারি দলের নিন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত হচ্ছে, ক্রমাগত কলুষিত বা বিতর্কিত হয়ে পড়ছে তাদের কার্যক্রম। এরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে বিশেষ গোষ্ঠী/লবি বা চক্রের পক্ষে। ফলে দেশে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, অর্থনৈতিক বিশৃংখলা, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব গোষ্ঠী বা দলবিশেষের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। বিঘ্নিত হচ্ছে জনস্বার্থ। আর অন্যদিকে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ কমে যাচ্ছে, শেষ হয়ে আসছে। তার স্থান দখল করছে ব্যক্তিপূজা, নগ্ন আঞ্চলিকতাবাদ, বিশেষ সমপ্রদায়-প্রীতি প্রভৃতি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ অপচয় ও আত্মসাত্করণ এবং জনগণের সম্পদকে বেপরোয়াভাবে লুণ্ঠন ও তা নিয়ে শাসকদের বিভিন্ন মহলে/স্তরে নির্লজ্জ মারামারি-কাড়াকাড়ি সারফেসে উঠে এসেছে। আর এসবের পিছনে রয়েছে সরকারের/সরকারি দলের মদদ ও অংশীদারিত্ব। এর যোগফল হিসেবে সমাজে দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থিক কেলেংকারি, হত্যা খুন গুম ধর্ষণ, দখলদারিত্ব পৌঁছেছে চরমে। নানা চেহারার দলবাজি, সহিংস বিরোধ-বিদ্বেষ, সংঘাত-সংঘর্ষে সর্বব্যাপী নৈরাজ্যের বিস্তার ঘটেছে। গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও তারা দেশে জিঙ্গোইজম প্রতিষ্ঠা করেছে। জিঙ্গোইজম গণতন্ত্র নয়, জঙ্গলতন্ত্র। অন্যদিকে এসব প্রকাশের মাশুল দিতে হচ্ছে অনেক সাংবাদিককে। নানা অজুহাতে টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে গণমাধ্যমের, সত্যিনিষ্ঠ সাংবাদিকরা হচ্ছেন হেনস্থা-হয়রানি, গ্রেফতার, নির্যাতন, এমনকি হত্যার করুণ শিকার। এ অবস্থার মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা যেমন করা যায় না তেমনি গণতন্ত্রের বিকাশ-বিস্তারও হয়ে ওঠে দুরূহ। এতে সমাজ ও দেশ গণতন্ত্রের সোজা পথ থেকে স্বৈরতন্ত্রের বক্রপথে ধাবিত হয়। এসবের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটেছে ক্ষমতাসীনদের আরো বেশিদিন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বহুল উচ্চারিত অশুভ আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দিয়ে। তারা প্রায়ই কথা বলছেন ২০২১ সালকে নিশানা করে। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর কর্মসূচি নিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার গোপন খায়েশের কথা প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। এসব আদৌ গণতান্ত্রিক মনোভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একদলীয় স্বেচ্ছাচারতন্ত্র কায়েমের কারসাজি। আর এরই প্রেক্ষিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিভাবে সম্পন্ন করা হবে সেই জটিল বিতর্কের অবতারণা হয়েছে। ইতোমধ্যেই সংশোধনী আনা হয়েছে সংবিধানে, আবার তার মধ্যেও রেখে দেওয়া হয়েছে দ্ব্যর্থবোধক কতিপয় ইংগিত-এজেন্ডা। ফলে সমাজের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়েছে নানা সংশয়-সন্দেহ, বিরোধ- বির্তক। সমাজে/রাষ্ট্রে বিদ্বেষ-বিভাজন ও আতঙ্ক-উত্কণ্ঠা প্রতিমুহূর্তে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ছে। জনসাধারণ অনুমান করছে পরবর্তী নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হতে পারে, জোর করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে যাবার পাঁয়তারা এখনই শুরু হয়েছে। তাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন পন্থা-পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে, কারা সে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে আর কারা সরকার চালাবে সে সব নিয়ে দেশ জুড়ে চলছে প্রচন্ড বিতর্ক-বিসম্বাদ। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত, চলছে তোলপাড়। এই ইস্যুতে সরকারি মহল ও বিরোধী দলসমূহ এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদম বিপরীত মেরুতে অবস্থান তাদের। এদের মধ্যে সমঝোতা-সম্প্রীতির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ক্রমশ: উভয়পক্ষ আপসহীন ও চূড়ান্ত অনমনীয় অবস্থানে চলে যাচ্ছে। নির্বাচনের কৌশল নিয়ে বিরোধ-বির্তক ইতোমধ্যে আলোচনা-সমালোচনার পর্ব অতিক্রম করে প্রতিহিংসা, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রূপ পরিগ্রহ করছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা দিনরাত বলছেন পরবর্তী নির্বাচন হবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাত্ প্রকারান্তরে তারা নিজেরাই হবেন সেই সরকারের হর্তাকর্তা নিয়ন্তা। অন্যদিকে বিরোধী দল চাইছে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। কেননা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী যদি চেহারা পাল্টিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে তবে তারা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচনের গতিধারা পাল্টিয়ে ফেলবে। বিস্তর প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনের ফলাফল ওলট-পালট করে সেই নির্বাচনে তারা নিজেরাই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আবার জেঁকে বসবে। পাবলিক পার্সেপশনে তা নির্বাচনের নামে হবে প্রহসন, মহাপ্রতারণা। এভাবে গণতন্ত্রের অবমাননা ও কায়দা-কৌশল করে ক্ষমতা পুনর্দখলের নাটক মঞ্চস্থ হতে দিতে নারাজ বিরোধী দল। তারা বলছেন ষড়যন্ত্রের সেই নির্বাচন হতে দেওয়া যাবে না, মেনে নেওয়া হবে না। একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন নির্বাচন এই দেশের মাটিতে হতে দেয়া হবে না। সরকারকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য করা হবে। এ দিকে সরকারও বটবৃক্ষের মত স্থির স্থানু দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেন তারা কোনরকম তত্ত্বাবধায়ক সরকার বোঝে না, মানেও না। কেননা সংশোধিত সংবিধানে এরকম কোনকিছুর অস্তিত্ব নাই। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোন অবকাশও নাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিন শেষ। এর ঐতিহাসিক প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। তত্ত্বাবধায়ক নামে কোনকিছু নেই, হতেও পারে না। এই দুর্মর বির্তকে জড়িয়ে পড়েছে সরকার ও বিরোধী দল। আর উভয় পক্ষই পর্বতসম অনড় অটল। এ নিয়ে কোন ডায়ালগে তারা যাবেন না। এ বিষয়ে কোন সমঝোতারও সুযোগ নাকি নাই। দুই জোটই পয়েন্ট অব নো রিটার্নে পৌঁছে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তার একটি সামপ্রতিকতম অভিব্যক্তি হচ্ছে বিজয় দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী উভয়ে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কেউ কারও সাথে কথা বলেন নাই, কারো মুখ কেউ দেখেন নাই। অথচ গণতন্ত্রের আরেক নাম হচ্ছে ডায়ালগ। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে ডায়ালগ হওয়া উচিত, এটা জরুরি কর্তব্য। কেননা দেশ কেবল ক্ষমতাসীন মহল বা শাসক দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। অন্যান্য দলও রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদেরও রয়েছে সমান অধিকার। বিশেষভাবে আমাদের দেশে প্রধান বিরোধী দল যথেষ্ট শক্তিশালী এবং তাদের জনভিত্তি ভূমির গভীরে পর্যন্ত প্রথিত। বিরোধী দল বস্তুত: সরকারি দলের ছায়া স্বরূপ। জাতীয় প্রয়োজনে সরকারি দল বিরোধী দলের পরামর্শ চাইতে পারে আবার বিরোধী দলের সমালোচনা থেকেও শিক্ষা বা নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারে। আর এভাবেই গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে। আমাদের সরকারি ও বিরোধী উভয় দলকেই রিপ্রেজেন্ট করেন দুই প্রধান নেত্রী। কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সৌজন্যমূলক বাক্য বিনিময়ও তারা না করেন, তা বড়ই বেমানান ও দুভার্গ্যজনক। বিশেষভাবে ক্ষমতাসীন সরকার/দলের নেত্রী যদি কুণ্ঠিত হন, বিরোধী নেতাকে পাশ কাটিয়ে যান, আমন্ত্রিত বিরোধী দলীয় নেত্রীকে পাত্তা না দেওয়া হয় তা তো অবজ্ঞারই নামান্তর। ক্ষমতাসীনদেরই বেশি গরজ/দায়বোধ থাকার কথা- বিরোধীদেরকে সাথে নিয়ে, সমঝোতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করার স্বার্থে আর তখনই কেবল বিরোধী দলও হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, গঠনমূলক সমালোচনা করতে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে পারে। কিন্তু জাতি বিস্ময়ভরে এবার প্রত্যক্ষ করেছে যে, সরকার প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করেছেন। দেশের চিন্তাশীল মানুষজন এতে হতাশ হয়েছেন। এটা সমগ্র বিরোধী দলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। এ এক অশনি সংকেত, অদূর ভবিষতে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষের আলামত বৈকি। মনে হচ্ছে গণতন্ত্রের শকট সরকার সৃষ্ট খানাখন্দ কাদাপানি ভরা পথে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারবে না, হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে অচিরেই। এহেন প্রতিহিংসা বোধ, অনুদার আচরণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অনীহা অসম্মান উদার গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে বাধ্য। অধিকতর দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে, প্রসারমান ফাটল সৃষ্টি হবে দুই দলের লাখো নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। এই দূরত্ব/ফাটল পরস্পরের প্রতি হিংস্রতা প্রতিরোধ প্রতিশোধ প্রবণতাকে উসকে দিতে বাধ্য। জাতি উত্কটভাবে বিভাজিত হয়ে পড়বে। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ/এজেন্ডা ও প্রতিহিংসাবোধ জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত, জনগণকে খণ্ডিত ও শেষে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। বলা চলে ইতিমধ্যেই জাতি যেন দুটি বিবদমান উপজাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন রুয়ান্ডার হুতু ও তুতসিরা, উত্তর সুদানের আল-শাবাব আর দক্ষিণের ক্রিশ্চিয়ান এ্যাক্টিভিস্টরা, কিংবা লেবাননের ফ্যালানজিস্ট আর দ্রুজ মিলিশিয়া বাহিনী প্রভৃতি। গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাণভোমরা হচ্ছে সহিষ্ণুতা। গণতান্ত্রিক বোধের প্রকাশ হচ্ছে সমঝোতা। একমাত্রিকতা নয়, প্লুরালিজম হচ্ছে গণতন্ত্র টিকে থাকার প্রধান শর্ত। কিন্তু সামপ্রতিক বাংলাদেশ যেন এসব থেকে বহু দূরে, পরিকল্পিতভাবে প্লুরালিজমকে করা হচ্ছে উত্খাত। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা নিঃশেষপ্রায় আর সামাজিক বিভেদ-বৈপরীত্য এখন বাড় বাড়ন্ত। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অসম্মান প্রদর্শনের প্রবণতা ক্রমশ: অনপনেয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। সরকারি পক্ষ থেকে প্রত্যহ উচ্চারিত হচ্ছে রাজপথে প্রতিরোধের হুঙ্কার। আর উভয় দলের নেতারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন গৃহযুদ্ধের। এমনকি দেশের বাইরে কোন কোন মহলও একই রকম ইঙ্গিত প্রদান করছে। এই জাতি মাত্র চারদশক আগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে সমুত্থিত হয়েছে। তাই যুদ্ধ কি জিনিস তা কারও অজানা নয়। সেই যুদ্ধের বিচার নিয়েই চলছে পক্ষে-বিপক্ষে বহু কথা, আলোচনা-সমালোচনা। এর মীমাংসা কবে হবে, কিভাবে হবে তাও ধুয়াশাচ্ছন্ন। তার উপর আবার নতুন করে দেয়া হচ্ছে গৃহযুদ্ধের হুমকি! গৃহযুদ্ধ কী রকম জিনিস হতে পারে তা আজকের সিরিয়ার জনগণ ঠাহর করতে পারছে। এহেন যুদ্ধের পরিণাম যে কী তা লিবিয়ার জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এখন। এসব টাট্কা উদাহরণ রয়েছে আমাদের হাতের কাছে। আজকের দুই জোট বা নেত্রীর পিছনে জাতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে অলক্ষ্যে, দু’টি বিবদমান গোত্র/উপজাতির রূপ পরিগ্রহ করছে। যা গৃহযুদ্ধের মত সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টির অপ্রতিরোধ্য কারণ হতেও পারে। অথচ আমাদের আদি প্রতিজ্ঞা ছিল একটি সুখী শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা। সেই অবস্থান থেকে আমরা বহুদূরে সরে এসেছি। প্রায় বিপরীত অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছি। সরকারের আচরণ গণতন্ত্রকে খেল-তামাশায় পর্যবসিত করেছে। সেই সাথে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি আচ্ছন্ন করছে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে। এই রকম সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনদেরই বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ করার কথা। তাদেরই অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করা উচিত। গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে এবং শান্তি-সমঝোতার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার কাজটি তাদেরই আগবাড়িয়ে করা উচিত। কিন্তু তেমন আলামত মোটেই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং ক্ষমতাসীন নেতানেত্রীদের অধিকতর অনমনীয় ও কঠোর হতে দেখা যাচ্ছে, হিংস্র ও প্রতিশোধ পরায়ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে প্রধান বিরোধী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা। এর মধ্য দিয়ে সরকার অসহিষ্ণুতা ও গণতন্ত্র- বিমুখতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তদুপরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হচ্ছে বিরোধী দলের অন্য নেতৃবৃন্দ যদি বেশি নড়াচড়া করে তবে তাদেরও মির্জার ভাগ্যই বরণ করতে হবে। সরকারি মহল এখানেই থেমে নেই, উপরন্তু হুমকি দিয়েছে প্রয়োজনে তারা বিরোধী দলের নেত্রীকেও গ্রেফতার করবে। রাজনৈতিক ময়দানকে ফাঁকা করতে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রেফতার করে জেলে ভরা হচ্ছে। সরকারের মনোভঙ্গিটি এমন যে, যদি প্রধান বিরোধী দল (১৮ দলীয় জোট) নির্বাচনে নাও আসে তবু নির্বাচন হবে, সরকার ঠিকই গঠিত হবে। ক্ষমতাসীন মহল হয়তো ভাবছে যে, প্রতিপক্ষকে নানা বাহানায় স্তব্ধ করে গ্রেফতার জেল জুলুম হত্যা করে ফাঁকা মাঠে একাকী নির্বাচন করবে, গৃহপালিত বিরোধী দল তৈরি করে পার্লামেন্ট গঠন করবে তেমন দূরাশা পোষণ না করাই উত্তম। এভাবে জাতি ও বিশ্বসমপ্রদায়কে ধোঁকা দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কখনো সফল হবে না। কেননা বিরোধী দলকে ঘরছাড়া করে, দেশছাড়া করে কখনই গণতন্ত্র কায়েম করা যায় না। এসব উদার গণতন্ত্র চর্চার কোন নমুনা নয়, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কোন বহিঃপ্রকাশও নয়। এসব হচ্ছে গণতন্ত্রের লেবাসে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা, ভেড়ার চামড়া গায়ে জড়িয়ে নেকড়ের হামলা করার মত কাণ্ড। এতে নির্ঘাত গণতন্ত্রের উপর আঘাত আসবে, গণতন্ত্র হতে পারে বিপন্ন। ক্ষমতাসীনরা এর দায় কখনোই এড়াতে পারবে না। সংঘাতের দিকে জাতিকে ঠেলে দিয়ে তারা মসনদে বসে হাসবেন তা কখনো হয় না। বরং ব্যাপক নৈরাজ্যের শেষ দৃশ্যে প্রবল গণঅভ্যুত্থানে সবকিছু তছনছ হয়েও যেতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান বহুমাত্রিক রাজনৈতিক কলহ কোন্দল অসহিষ্ণুতা যে কোন সময়ে কোন ‘তৃতীয় শক্তির’ উত্থানে সহায়ক হতে পারে। এই তৃতীয় শক্তি সিভিলিয়ানদের কোন দল/সংগঠন হতে পারে, নাও হতে পারে। অন্য চেহারা-সুরতেরও হতে পারে। বিগত ৫০/৬০ বছরে বহু দেশে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। দীর্ঘদিন তারা ক্ষমতায় থেকেছে, সরকার চালিয়েছে যুগের পর যুগ। এটা সম্ভব হয়েছে এ কারণে যে, সিভিলিয়ান শাসকরা অদক্ষতা, অর্থবতা ও দুর্নীতির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ছেড়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে অসম্মান ও অস্বীকার করেছে। লিপ্ত হয়েছে পরস্পরের প্রতি আক্রোশ- হানাহানিতে, ঝরিয়েছে রক্ত। অপশাসন-দু:শাসনে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শাসক চক্রের লোভ লালসা লুণ্ঠনে দংশনে গণমানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এমন অবস্থায় অনেক দেশে সেনাবাহিনী নিশ্চুপ নিষ্ক্রিয় থাকেনি। তারা বাধ্য হয়ে কিংবা কখনো সুযোগ বুঝে রাষ্ট্র ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করেছে। সিভিলিয়ানরা তখন গর্তে আত্মগোপন করেছে। গণতন্ত্র অবিলম্বে নির্বাসিত হয়েছে। আর উত্পীড়িত-উত্ত্যক্ত জনগণ অন্তত: প্রথম প্রথম এহেন পরিবর্তনকে স্বাগত:ই জানিয়েছে। এরকম অবস্থার সৃষ্টি হোক, তা আমরা কেউ কামনা করি না। শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতায় এরকম নতুন কোন দৃষ্টান্ত আমরা হতে চাই না। বরং সহিষ্ণুতার একটি টেকসই বাতাবরণ তৈরি হোক, দেশে গণতন্ত্র লাভ করুক চমত্কার শক্ত একটা ভিত্তি—এই আমাদের চাওয়া। সরকার ও বিরোধী দল কাছাকাছি পৌঁছাক, আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা স্থাপিত হোক উভয় পক্ষের মধ্যে। জাতির ন্যায়সঙ্গত দাবিকে সরকার গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার স্বার্থে গ্রহণ করুক খোলা মনে। গণতন্ত্রকে এগিয়ে দেয়া হোক তার অভীষ্ট গন্তব্যে— এসবই জনগণের প্রত্যাশা। বিরোধ-বিভেদ নয়, সংঘাত-সংঘর্ষ নয়, শান্তির পথ খুঁজে নেওয়াই আজকে জাতির জন্য জরুরি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসা দরকার ক্ষমতাসীন মহলকে।  লেখক : অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন