মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংঘাত বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে জাতিসংঘ। ইহা ছাড়াও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত যে সকল খবরাখবর প্রকাশ হইতেছে সেগুলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিবার জন্যও ইয়াঙ্গুনের প্রতি আহবান জানানো হইয়াছে। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটিকে বক্তব্য প্রদানের গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া ধন্যবাদ পাইবার যোগ্য কাজ করিয়াছে বিশ্ব-সংস্থাটি। তবে মায়ানমারে যেই সকল ঘটনা ঘটিতেছে তাহা লইয়া কেবলমাত্র উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যে দায়িত্ব সমাপন করিয়া ফেলিলে পরিস্থিতির কোন ইতিবাচক পরিবর্তন হইবে বলিয়া মনে হয় না।
জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবটিতে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি লইয়া গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হইয়াছে এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাইবার জন্য আহবানও জানানো হইয়াছে বটে। কিন্তু মায়ানমার যদি জাতিসংঘের আহ্বান আমলে না লয় তাহা হইলে কি হইবে? কিংবা শব্দের মারপ্যাঁচে ফেলিয়া যদি ভিন্নদিকে দৃষ্টি প্রবাহিত করিবার চেষ্টা চলে তাহা হইলেই বা কি হইবে? উদাহরণস্বরূপ, গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবনাটির কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। উক্ত প্রস্তাবনাটিতে মায়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদিগের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়া প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হইয়াছিল। কিন্তু মায়ানমার কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের বক্তব্যের অন্তঃসারের দিকে না যাইয়া ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটির ব্যবহার প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলিয়া প্রসঙ্গটি ভিন্নদিকে লইয়া যাইবার অবকাশ পায়। ইয়াঙ্গুন জাতিসংঘকে জানায় যে, মায়ানমারে রোহিঙ্গা নামের কোন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নাই। উল্লেখ্য, মায়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদিগকে নিজেদের জনগোষ্ঠীর অংশ বলিয়া মনে করে না।
প্রশ্ন হইতেছে, জাতিসংঘের কার্যক্রম কি সুবচন বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিবে নাকি বিশ্বমানবতার সুখ-শান্তি বিধানে এই সংস্থাটি স্থায়ীভাবে কোন অবদান রাখিতে সমর্থ হইবে? মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রমী ঘটনার কথা বাদ দিলে দীর্ঘদিন ধরিয়া বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর হইতে জাতিসংঘের ভূমিকা যেন ম্রিয়মাণ হইতে ম্রিয়মাণতর হইতেছে। বহু মানুষ এমত মনে করেন যে, একমেরুপ্রবণ বিশ্বে সর্বশক্তিমান হিসাবে প্রতিভাত হইতে থাকা রাষ্ট্রটির স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে এখনকার দিনে জাতিসংঘ ব্যবহার হইতেছে। ভাবনাটির মধ্যে যে সারবত্তা নাই তাহা বলা সমীচীন হইবে না। এমন বহু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাইবে যখন প্রধান শক্তিমান রাষ্ট্রের ইচ্ছামাফিক সিদ্ধান্তবলী গৃহীত হইয়াছে জাতিসংঘে। তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণের এই পর্যায়ে আসিয়া একটুখানি স্থির হইবার অবকাশ আছে। কেহ কেহ আছেন জাতিসংঘের ভূমিকাকে ব্যাখ্যা করিবার জন্য পুরাপুরিভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উপরে নির্ভর করেন। এমত চিন্তাচর্চায় কোন কষ্ট নাই; যেকোনভাবেই হউক সাম্রাজ্যবাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দিলেই হইল।
কিন্তু মুশকিল হইতেছে কেবলই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নির্ভর হইয়া বাস্তব পরিস্থিতির সমগ্র চিত্র পাওয়া যায় না। প্রধান শক্তিশালী রাষ্ট্রটি কি সর্বদা দুর্বল রাষ্ট্রগুলিকে হুমকির মুখে জাতিসংঘে তাহার অনুকূলে সিদ্ধান্ত লইতে বাধ্য করে? তাহা কিন্তু নহে। লক্ষ্য করিলেই দেখা যাইবে অনেকক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্রের সরকারগুলি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদিগকে দুর্বল করিবার বাসনাতাড়িত হইয়া অন্য কারণে-অকারণে মুরুব্বী রাষ্ট্রের লোকজনের শরণাপন্ন হয়। জাতিসংঘের আজিকার দুর্বল অবস্থার জন্য দুর্বল জাতিরাষ্ট্রসমূহের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই সমীকরণটিও বুঝিবার অবকাশ আছে।
