স্মরণ

মফস্বল সাংবাদিকতায় নতুনধারার পথিকৃত্ মোনাজাত উদ্দিন

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪১
আজ ২৯ ডিসেম্বর। এদেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের ১৭তম মৃত্যুদিবস। ১৯৯৫ সালের এইদিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মোনাজাত উদ্দিন ছিলেন এ দেশের মফস্বল সাংবাদিকতার নতুনধারার প্রবর্তকরূপী এক উজ্জ্বল নাক্ষত্রিক পথিকৃত্। তার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি, রংপুরে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে তার আগে প্রকৃত অর্থে বাস্তব জীবনভিত্তিক ফিচার এবং সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করে এদেশে আর কেউ গ্রামীণ সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারেননি। এই নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকের সাংবাদিকতা পেশার যাত্রা শুরু হয়েছিল তত্কালীন সান্ধ্য দৈনিক ‘আওয়াজ’ পত্রিকার মাধ্যমে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। আর এখান থেকেই তার হাতে মফস্বল সাংবাদিকতায় নতুনধারা সৃষ্টির মাধ্যমে ঘটে নতুন মাত্রিকতার মেলবন্ধন। দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলাকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরে নিয়ে চলে তার এই বিপুল আয়োজন। তিনি প্রতিটি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ,হাসি-আনন্দ,আশা-আকাঙ্ক্ষা,অভাব-অনটনের প্রাণস্পর্শী আখ্যান তুলে ধরেন স্বপ্রবর্তিত সিরিজ প্রতিবেদন ও ফিচারের মাধ্যমে। এইসব শেকড় সন্ধানী রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশ হতে থাকলে সারা দেশে নতুন মাত্রিকতার মফস্বল সাংবাদিক হিসেবে তার নাম জনপ্রিয়তার শীর্ষদেশ ছুঁয়ে যায়। মোনাজাত উদ্দিনের সিরিজ প্রতিবেদন ও ফিচারের মধ্যে ‘কানসোনার মুখ’, ‘আমার দুখিনী বর্ণমালা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ দলিল’ ইত্যাদি অন্যতম। দীর্ঘ দুই যুগ দৈনিক সংবাদে চাকরি করার পর ১৯৯৪ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক জনকণ্ঠে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবির (বীরপ্রতীক) ওপর চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন। মোনাজাত উদ্দিনের কর্মযজ্ঞ শুধু সাংবাদিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি খবরকেন্দ্রিক বইও লিখেছেন অনেকগুলো। সেসব গ্রন্থের মধ্যে ‘পথ থেকে পথে’, ‘সংবাদ নেপথ্যে’, ‘কানসোনার মুখ’, ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’, ‘নিজস্ব রিপোটর্’, ‘ছোট ছোট গল্প’, ‘শাহ আলম মজিবরের কাহিনী’, ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন—গ্রামীণ পর্যায় থেকে’, ‘চিলমারীর এক যুগ’, ‘নানা মুখ নানা কথা’ ইত্যাদি বহুল আলোচিত। মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতায় অনবদ্য অবদান রাখায় যেসব পুরস্কার লাভ করেন তার মধ্যে জহুর হোসেন চৌধুরী স্বর্ণপদক (১৯৮১), ফিলিপস পুরস্কার (১৯৮৭), ইন্সটিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স পুরস্কার প্রভৃতি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক অমোঘ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন মর্মান্তিকভাবে। তিস্তামুখ ঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ যাবার পথে রেলওয়ে ফেরির ছাদে উঠে ছবি তোলার সময় পা ফসকে নদীতে পড়ে গেলে তার সলিল সমাধি ঘটে ! লেখক:অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক