[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

চীনের নতুন নেতৃত্ব ও একটি মূল্যায়ন

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৯
পঞ্চম প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতীক ঝি জিনপিং গত নভেম্বর চীনের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১৯৪৯ পরবর্তী চীনে তিনিই প্রথম কোন নেতা যিনি চীনের সংস্কৃতি বিপ্লবে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেন। এছাড়া ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম কংগ্রেসে জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। আশা করা হচ্ছে, আগামী মার্চে তিনি প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের স্থলাভিত্তিক হবেন। তার বাবা বিপ্লবের অন্যতম নায়ক ঝি ঝংঝান ঝু এনলাইয়ের উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং মাও সেতুং সরকারের মন্ত্রী হিসাবে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সে হিসাবে ছেলের অগ্রযাত্রায় ও দেশটির সামরিক নেতৃবৃন্দের কাছে গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে বাবার একটি ভূমিকা রয়েছে। তাছাড়া একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসাবে জিনপিং পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যাশা করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে দেয়া নীতি নির্ধারণী বক্তৃতার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেখানে তিনি সকল প্রকার সন্দেহ দূর করে একে অন্যের জাতিগত স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্বাস ও আস্থা বৃদ্ধির আহবান জানান। সেখানে এক চীন নীতির মত বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেখানে তিব্বত ও তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা হয়েছে। এছাড়া এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়েরও প্রতিফলন ঘটেছে। ঝির কন্যা ঝি মিংজি হার্ভার্ডে পড়ালেখা করেছেন। বেশকিছু মার্কিন বিশ্লেষকও মনে করেন, এমন এক প্রেক্ষাপটে তাঁর সঙ্গে একত্রে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ঝির অতীতে সুজিয়ান, ঝিজিয়াং ও সাংহাইয়ের মত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ তিনটি অঞ্চলের নেতৃত্ব দানের অভিজ্ঞতা রয়েছে। চীনের গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আর এসবই তাকে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং চীনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উদারীকরণের মত বিষয়ে নীতি প্রণয়নের জন্য প্রস্তুত করেছে। এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত যে, ২০১৩ সাল নাগাদ চীনও বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতিসমৃদ্ধ দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছবে। এছাড়া এটিও বিশ্বাস করা যায় যে, গত ১০ বছরের দ্রুত প্রবৃদ্ধির হার সেরকম একটি ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দেয়। এখন ঝির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিবে চীনকে রপ্তানি ও বিনিয়োগের নেতৃত্বদানকারী দেশ থেকে অভ্যন্তরীণ ভোক্তাভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে গত এক দশকে ব্যাপক বিনিয়োগ ও রপ্তানি চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এক ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। ২০০২ সালে যা ছিল এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ান মার্কিন ডলার, তা চলতি বছরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক তিন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। এমতাবস্থায় সরকারের নীতি নির্ধারকরা ভবিষ্যত্ বাণী করেছেন যে, আগামী সাত বছরের মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি লোক উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে পরিণত হবে। দেশের শ্রমিকদের অর্ধেকেরও বেশি বর্তমানে শহর এলাকায় বসবাস করছে। এ ছাড়া কর্মসংস্থানের জন্য গ্রাম ছেড়ে এখন অনেকেই শহরে ছুটে আসছেন। আর তখনই ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। যদিও এর পাশাপাশি বৈষম্য ও আয় বিভাজন বাড়ছে। সম্প্রতি চীনের সাউথওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অব ফিন্যান্স এন্ড ইকোনোমিক্সের এক গবেষণায় চীনের শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের মোট আয়ের ৫৭ ভাগ এবং মোট সম্পদের ৮৫ ভাগ সম্পদ এদের হাতে। তবে আশার কথা এই যে, নতুন নেতৃত্ব জানে দেশের এই সামাজিক সমস্যা কিভাবে চিহ্নিত এবং কিভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করতে হবে। অনেকেই মনে করছেন, এজন্য প্রয়োজন নতুন রাস্তা-ঘাট, বিমানবন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো বিনির্মাণ। যা চীনের অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করবে। তবে অধ্যাপক গান লীর মতে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি ব্যয় বড় ধরনের অবকাঠামো বিনির্মাণ থেকে সমাজ কল্যাণমূলক বিনিয়োগে ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং চীনা শ্রমিকরা স্বাস্থ্যসেবা, বেকারত্ব ও অবসর গ্রহণ বিষয়ে চাপমুক্ত হবে। এমনকি তারা তাদের পছন্দমত পণ্য ও সেবা ক্রয়ে অধিকতর সক্ষম হবেন। যদিও গত ১৫ নভেম্বর চীনের নতুন নেতা ঝি জিনপিংয়ের প্রথম প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতাকালে উল্লেখ করা বেশকিছু বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য। সে সময় তিনি চীনের নতুন নেতৃত্বের প্রতি অর্পিত গুরুদায়িত্বের কথা স্বীকার করে উল্লেখ করেন যে, চীনা জনগণের জন্য উন্নত জীবন প্রদানই তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে। এছাড়াও তিনি সামাজিক উত্পাদনশীল খাতের উন্নয়ন এবং দলের সদস্য ও ক্যাডারদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দেন। যা এতদিন ছিল জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসবই তার দৃঢ়তার ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া তিনি তাঁর নেতৃত্বে দলকে আরো সুসংহত এবং চীনা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সমাজতন্ত্রকে আরো এগিয়ে নেয়ারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এখানে একটি জিনিস পরিষ্কার আর তা এই যে, নেতৃত্বের পরিবর্তনের সাথে সাথে চীনও পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। যদিও এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে দ্বিমত হতে পারে, তারপরও আমি বিশ্বাস করি না চীন রাশিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড মত ২৩ বছরের আগের অবস্থানেই আছে। যদিও সেখানে পার্টির প্রবীণ সদস্য ও নবীন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। যা তত্কালীন মস্কো ও লেনিনগ্রাদের মধ্যেও ছিল। কিন্তু বর্তমানে পার্থক্য এই যে, পুরো চীন জুড়ে এর বিস্তৃতি ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের সঙ্গে দ্বীপ নিয়ে বিরোধ ইস্যুতে এর প্রতিফলন ঘটেছে। মূলত চীনের নতুন প্রজন্ম উন্নত দেশগুলোর মত না হলেও তারাও বাক স্বাধীনতায় ও প্রচার-প্রকাশনা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যেমনটি মনে করেন চীনা শিল্পী ও ভিন্ন মতাবলম্বী আই ওয়ে ওয়ে যে, আমি মনে করি চীনে একদিন পরিবর্তন আসবেই, এটি অবশ্যম্ভাবী। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং চীন বিশেষজ্ঞ রুড কেভিন মনে করেন, চীনের কেন্দ্রীয় চ্যালেঞ্জ এবং এর নতুন নেতৃত্বের অধীনে বৃহত্তর বিশ্বের সাথে চীনের সম্পর্ক হতে হবে অপ্রতিরোধ্য। আর এই মত অর্থনৈতিক শক্তি, বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতি থেকে আসা অপরিবর্তিত রাজনৈতিক শক্তি ও নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। ঐ প্রেক্ষাপটে চীন ও বাকী বিশ্বের কঠিন চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা সহজ হবে এবং চীনের এই উত্থান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করবে। এমনকি এর মধ্যে দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও চীনের কৌশলগত সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক হবে। কেননা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুতগতিতে পড়লেও এর সামরিক সামর্থ্য মার্কিনীদের তুলনায় অনেক কম। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার। যদিও মহাসাগরীয় এলাকায় চীন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার নিজের স্বার্থরক্ষায় যথেষ্ট সক্ষম। এর মধ্যে তাইওয়ান এবং চীনের টেরিটোরি ও পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের সমুদ্রসীমা রক্ষার মত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান প্রতিযোগিতামূলক। এছাড়া মিয়ানমারের উপর চীনের প্রভাব প্রমাণিত। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এই প্রভাব দৃশ্যমান। যে কোন বৈদেশিক বিষয়ক বিশ্লেষক জানেন যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীনের অবস্থান অত্যন্ত মর্যাদাকর। এছাড়া বিশ্ব পরাশক্তি হিসাবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনৈতিক স্বার্থেও চীন নমস্য। বৈদেশিক নীতি এমন একটি স্পর্শকাতর জায়গায় দাঁড়িয়ে যেখানে আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের দিকে তাকিয়ে। তাদের অভিযোগ, চীন দামেস্ক, তেহরান ও পিয়ংইয়ংকে রক্ষা ও প্রশয় দিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়া সত্ত্বেও চীন এটি করছে, কারণ তারা অবৈধ হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী নয়। যদিও বিশ্বাস করা হয় যে, নতুন নেতৃত্বের কারণে চীন জাতিসংঘের আওতাধীন সামাজিক, অর্থনীতি, মানবিক ও পরিবেশের মত নানা আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরো বেশি সক্রিয় হতে পারে। এছাড়া এটিও উল্লেখ করার মত যে, চীন ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অবদান রাখতে শুরু করেছে। এমনকি তারা আন্তর্জাতিক সাহায্য নীতিতেও সংস্কার এনেছে। যদিও এই নীতি অন্যান্য উন্নত দেশ থেকে কিছুটা ভিন্ন। আর এর অর্থই হলো উন্নয়নশীল বিশ্বের সাহায্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠছে। আশা করা হচ্ছে, আফ্রিকা পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে। কেননা আফ্রিকার অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতি বিষয়ে চীনের আগ্রহ রয়েছে। কেননা বর্তমান সময়ে চীন চিহ্নিত করেছে যে, আফ্রিকা কাঁচামাল ও জ্বালানির বিকল্প উত্স। যা চীনের অর্থনীতি আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাইতো আফ্রিকায় চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ দিন দিন বাড়ছে। এক্ষেত্রে আফ্রিকা ইউনিয়নের নতুন সদর দফতর নির্মাণে চীনা অর্থায়ন এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। এমনকি চীনের বৈদেশিক নীতিতেও অব্যাহত পরিবর্তন আশা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও ইউরোপয় ইউনিয়নের সম্পর্ক প্রবৃদ্ধিতে এক নতুন ক্ষমতা এনেছে। উচ্চ পর্যায়ের বিনিময়ে এটি আরো সুসংহত হবে এবং যা কৌশলগত রাজনৈতিক আস্থা, বহুমুখী সহযোগিতা ও চীন ইইউ ভবিষ্যত্ সম্পর্ক বিশেষত ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করছে। ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: আশরাফুল ইসলাম লেখক :সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন