জীবন চলে না চলে না রে...

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২০
শহরের মানুষের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন। একসময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের নিশ্চয়তা ছিল। এখন তাদের অর্ধেকেরও সেই সুযোগ নেই। বেসরকারি খাতের ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে ঢাকায় যে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হয়েছে, নিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে তাদের জন্যও আবাসনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে শ্রমিক-কর্মচারী থেকে শুরু করে পদস্থ কর্মকর্তা পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সর্বস্তরের চাকুরের নিজের থাকার ব্যবস্থা নিজেরই করতে হয়। উচ্চ আয়ের মানুষজন যেখানে প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার চেষ্টা করছে, মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষজন তেমনি সাধ্যের মধ্যে ভাড়া বাসা খুঁজছে। চাহিদা বাড়ার কারণে বল্গাহীনভাবে বেড়ে চলেছে বাসাভাড়া, জমি ও ফ্ল্যাটের দাম। আবাসনের তীব্র সংকটের কারণে মানুষের আয়ের অর্ধেকই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়া, জমি বা ফ্ল্যাটের কিস্তি পরিশোধ বা এ বাবদ নেওয়া উচ্চ সুদে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে। আবাসন সুবিধা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির শর্তের মধ্যেই রয়েছে। তবে অপ্রতুল জোগানের কারণে সবাই এ সুযোগ পান না। ব্রিটিশ আমলে নতুন একটি থানা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে পুলিশদের থাকার ব্যবস্থা করা হতো। থানার লাগোয়া কোয়ার্টার থাকত। আগে ঢাকা শহরে থানা ছিল ৯টি, এখন ৪৭। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা নেই। ঢাকায় সব শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ফ্ল্যাট রয়েছে ১২ হাজার ৪৫০টি, যা চাহিদার মাত্র ৭ শতাংশ। ৯৭ ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীকেই নিজেদের উদ্যোগে থাকার ব্যবস্থা করতে হয়। তাদের বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া যা দেওয়া হয় সে টাকায় ঢাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ১৭ টাকা, তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বেড়ে ইউনিটপ্রতি ১৬ টাকা থেকে ৩০ টাকা হয়েছে। পাঁচ দফা বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এক বছরেই ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ক্যাবের মতে গত দুই বছরে পারিবারিক বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। বাস ভাড়া বেড়েছে ২৯ শতাংশ। এর বিপরীতে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সরকার। বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া কার্যকর করা যায়নি কখনো। দ্রব্যমূল্য সীমিত রাখার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো পূরণ করতে পারেনি সরকার। দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সমপ্রসারিত হয়েছে, কম দামের সরকারি চাল ও আটা কিনতে পারছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে রেশন পাচ্ছেন। কিন্তু কোনো রকম সুবিধাহীন ঢাকার মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট শুধুই বেড়েছে। গ্রামে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় না থাকায় যানজট, পানিহীনতা, জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট, লোডশেডিং, ভেজাল খাবারসহ নানা কষ্টের মধ্যেও ঢাকায় পড়ে আছেন তারা। প্রথম শ্রেণীর সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তার চাকরি যে বেকারদের কাছে ব্যাপক আকর্ষণীয় তা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু বেতনটা মোটেও আকর্ষণীয় নয়। কারণ, বর্তমান আক্রার বাজারে মাসশেষে বেতনের ১৬ হাজার টাকায় অন্তত ঢাকায় সংসার চালানো সম্ভব নয়। তার ওপর বছরশেষে যেখানে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হয় মাত্র সাড়ে সাত শ টাকার মতো। শতকরা হিসাব করলে দেখা যায়, বছরশেষে প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন পাঁচ শতাংশেরও কম বাড়ে। কিন্তু কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০১১ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ভালো বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সুনাম আছে। এমনই একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. তানসেন জানান, বছরশেষে তাদের মূল বেতন ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এর সঙ্গে অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়। ফলে মোট বেতনও প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ে। বেসরকারি খাতেও যে হারে বেতন বাড়ে তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের চেয়ে কম। পরিবারপ্রতি গড় মাসিক খরচ ২০০৫ সালের তুলনায় বেড়েছে ৮৪.৫ শতাংশ। ৫ বছর আগে মাসিক আয় পাঁচ হাজার ৯৬৪ টাকা হলে একটি পরিবারের চলে যেত। এখন সেখানে লাগছে ১১ হাজার ৩ টাকা। শহরে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ১৬ হাজার ৪৭৫ টাকা, আর ব্যয় ১৫ হাজার ২৭৬ টাকা। সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছেন মধ্য আয়ের শহুরে মানুষ, যাদের পারিবারিক বাজেটের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিত্সার পেছনে। সংবিধানে নাগরিকদের যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার সরকারের নিশ্চিত করার কথা তার মধ্যে এ চারটিও রয়েছে। অথচ এ খাতগুলোর কোনোটিতে সরকারের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। কোনোটি থেকে সরকার হাত গুটিয়ে নিচ্ছে, কোনোটিতে অংশগ্রহণ থাকলেও তদারকি নেই। কর্মজীবী মানুষের একদিকে বাসস্থান সমস্যা প্রকট, অন্যদিকে পারিবারিক ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাওয়ায় মহা সংকটে পড়েছে। তাদের কথা মাথায় রেখে পণ্যমূল্যসহ অন্যান্য ব্যয় যাতে কমে সেদিকে সরকারের নজরদারির বিকল্প নেই। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপই পারে এ ক্ষেত্রে সফলতা এনে দিতে। কঠিনভাবে বাজার তদারকি, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রনসহ সকল ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সদাই সজাগ থাকতে হবে। কর্মজীবী মানুষের জীবনের চাকা সহজভাবে সচল রাখতে তাদের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আয় যেন বাড়ে সেদিকে নজর নিতে হবে সরকারকে। লেখক :সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন