গত ২৮ ডিসেম্বর ছিল বাংলা একাডেমীর বার্ষিক সাধারণ সভা। এদিন একাডেমী চত্বরের আড্ডাটা মিস করতে চাই না। অনেক বন্ধুবান্ধব শুভার্থীদের সাথে দেখা হয়। এবারও অন্যথা হলো না। রোদহীন সকালের কনকনে ঠাণ্ডায় আড্ডা উষ্ণতা ছড়াচ্ছিল। অনেকের সাথে দেখা হচ্ছে—ভাববিনিময় হচ্ছে। আমার এলাকার একজন শ্রদ্ধাভাজন লেখকের সাথে অনেকদিন পর দেখা। ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। নানা কথার পর বললেন তোমার সাথে দেখা না হলেও তোমার কলাম নিয়মিত পড়ি। এরপর যে প্রশ্ন করলেন তেমন প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে প্রায়ই হতে হয়। বললেন, এতসব লিখে কী হবে। কে শোনে তোমাদের কথা। যাদের উদ্দেশ্যে লেখ তারা কি পড়েন? বড় দুই দলের সাপে নেউলে সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তো হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। আমার পাশে দাঁড়ানো আরেক বন্ধু ফোড়ন কাটলেন। বললেন, নেউল পাবেন কোথায়? এখন তো দুপক্ষেই সাপ। বিএনপি নেত্রী আওয়ামী লীগকে সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর বলছেন। সাপকে বিশ্বাস করলেও তিনি আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করেন না। আর আওয়ামী নেত্রী বলছেন বিএনপি নেত্রী নিজেই সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে হাঁটছেন।
আমি রাজনীতির অনন্তহীন সংলাপে জড়িয়ে এই আড্ডার সকালটাকে মাটি করতে চাইলাম না। তাই শ্রদ্ধেয় লেখকের প্রশ্নে সহজ নিষ্পত্তির জন্য বললাম, আমি আসলে মাননীয় রাজনীতিকদের জন্য লিখি না। এসব ছাইপাশ পড়ার সময় ও ধৈর্য তাদের থাকে না। আমি লিখি আমার স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য। ভেতরে গুমরে মরা কথাগুলো বলতে না পারলে হূদযন্ত্রে চাপ পড়ে মহাঅনর্থের সৃষ্টি হতে পারে। তাই এসব লিখে নিজের বুকটাকে হাল্কা করি।
একই দিন বিকেলে গিয়েছিলাম জয়দেবপুরে। এখানে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। নাম সুনজর। সংগঠনটির সাথে আমার কিছুটা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সুনজরের সভাতে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। এখানেও অভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম। আমি কেন কলাম লিখি এর জবাব সকালে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে যেভাবে বলেছিলাম এখন এই পরিবেশে সেভাবে দিলাম না। সকালের উত্তরটি ছিল আড্ডা বাঁচানোর জন্য আরোপিত উক্তি। এখন বলছি উপলব্ধির কথা। রাজনীতিবিদরা পড়ে মূল্যায়ন করবেন তেমন ভাবনা আমার মাথায় থাকে না। আমার ধারণা কোনো কলাম লেখকেরই থাকে না। আমি লিখি সাধারণ পাঠকের জন্য। তাদের মধ্যে যদি নতুন ভাবনার সৃষ্টি হয়। এভাবে জনমত গঠনে সামান্য ভূমিকা রাখা সম্ভব হলেই স্বস্তি পাবো। তবে এদেশের গরল উগরে দেয়া সর্পিল রাজনীতি নিয়ে উপস্থিত সকলের মধ্যেই এক ধরনের উত্কণ্ঠা লক্ষ্য করলাম।
আমাদের দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা যাওয়া করা দলগুলোর চরিত্র সাধারণ মানুষকে নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। নেতা-নেত্রীদের গত্বাধা বক্তৃতার ভাষা দলীয় নেতা-কর্মী দু’চারজনকে প্রভাবিত বা আলোড়িত করলেও সাধারণ মানুষদের খুব কম অংশই এসব মনোযোগ দিয়ে শোনেন। সকল পক্ষেরই দাবি তারা জনগণের রাজনীতি করেন। বাস্তবে সাধারণ মানুষ তা দেখতে পায় না। তাই নেতা-নেত্রীদের ভাঙ্গা রেকর্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন ভাবান্তর নেই।
বিএনপির এখনকার মুখপাত্র জনাব তরিকুল ইসলাম গত বুধবার বেগম খালেদা জিয়ার ঢাকা শহরের জনসংযোগ নিয়ে বেশ উত্ফুল্ল। তিনি সাধারণ মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ অংশগ্রহণ দেখে আপ্লুত। আর আমার বন্ধু জানালো ওর কাজের ছেলেটি সেদিন ছুটি নিয়ে ভালো কামিয়েছে। ওদের পাড়া থেকে এক ট্রাক ‘জনতা’ ভাড়া করা হয়েছিল। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর জনসভায় এভাবে ভাড়াটে লোক সমাগমের সাধারণ চিত্র সকলের জানা। বিএনপি নেতারা জনগণকে ধন্যবাদ জানালেও দলীয় কর্মী-সমর্থক ছাড়া বাকী সাধারণ মানুষ জানে কতটা বিরক্ত ছিলেন তারা। হাজার দরকার থাকলেও গাড়ি রাস্তায় বের করেননি নিরাপত্তার অভাবে। জরুরী কাজ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করতে হয়েছে। পথচলা যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছে। তাও যদি জনস্বার্থ ইস্যু সামনে থাকতো। মুখে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু। তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে হরতালের হুমকিও ছিল। আবার ঠাকুর ঘরে কে রে-এর মত করে ‘আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য আন্দোলন করছি না’ ধরনের বক্তব্যও ছিল। কিন্তু আঠারো দলের এই কর্মসূচিতে ঢাকা শহরে যূথবদ্ধ মিছিল নিয়ে মাঠ গরম রেখেছে জামায়াত ও ছাত্রশিবির। তাদের প্ল্যাকার্ডে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের প্রতিফলন ছিল না। যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করার কথাই ছিল। শ্লোগানের ভাষাও ছিল তেমনই। অর্থাত্ সেদিনের আঠারো দলীয় কর্মসূচি বিশ্লেষণ করলে কারো খুব বুঝতে অসুবিধা নেই যে, এই জোটের বিজয়ের মাসে নেয়া নানা কর্মসূচির মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। নির্বাচন অতি আসন্ন নয় যে, মাঠ গরম করতে বিজয়ের মাসটিকে রেহাই দেয়া যাবে না। তবে এ মাসটি জামায়াতের জন্য জরুরি। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য চাপ প্রয়োগ করার সময় বয়ে যাচ্ছে। তাই জামায়াতের ইচ্ছেকে মূল্য দিতে গিয়ে আঠারো দলের ছদ্মাবরণে বিএনপিকে মাঠে নামতে হয়েছে। এতে জামায়াত বুঝতে পেরেছে বিএনপি তাদের প্রকৃত বন্ধু। কারণ নিজ দলীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এভাবে বন্ধুর আবদার রক্ষা করতে গণবিরোধী একটি ইস্যুকে ধারণ করে দলের ক্ষতি করার ইতিহাস সম্ভবত খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বিএনপি যে বেকায়দায় আছে তা স্পষ্ট বোঝা যায় দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া সরকারের নানা দিক থেকে ব্যর্থতা থাকার পরও সেসব ইস্যু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার মত তেমন কর্মসূচি শানাতে পারছে না দেখে। কারণ কিছুকাল আগেই মানুষ বিএনপি সরকারের দুর্নীতির দগদগে ঘা প্রত্যক্ষ করেছে। মানুষের মন থেকে এত দ্রুত তা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। ফলে বিএনপির পক্ষে দুর্নীতি নিয়ে গলা চড়িয়ে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। জামায়াত ছাড়া আঠারো দলে উল্লেখ করার মত বড় বা মাঝারি কোনো দল নেই। কোনো কোনো ছোট দলের নেতারা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় জামায়াত প্রাধান্যে অনেকটা কোণঠাসা। জ্বালাময়ী বক্তৃতা করার ভাষা তাদের থাকার কথা নয়। সুতরাং গড্ডালিকা প্রবাহে চলা আমাদের সর্পিল রাজনীতি তার বিমূর্ত ধারা থেকে অনেকটা মূর্ত ধারায় নেমে এলো।
রাজনীতি সর্পিল বলে এর বিমূর্ত রূপ থাকায় তা অনুভব করা গেলেও প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা সহজ ছিল না। বেগম জিয়া নানা ধরনের বেকায়দা ও বৈরি অবস্থায় পরে বিমূর্ত রূপটিকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। সর্পিল ধারাকে মূর্ত রূপে আনতে গিয়ে সাপের রূপায়ণেই হাজির করলেন। তাই সাপের সাথে তুলনা করে বললেন সাপকে তবু বিশ্বাস করা যায় কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না। অবশ্য এসময়ের আওয়ামী লীগের পরিচালক ও তাঁদের পরিচালনার ধরনে দলীয় রক্ষণশীলতা থাকলেও গণমানুষের মূল্যায়ন সাধারণ মানুষের চোখে স্পষ্ট নয়। ফলে দল হিসেবে এসময়ের আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন রয়েই গেছে। কিন্তু বক্তা যখন বিএনপি নেত্রী তখন সর্প সংক্রান্ত বিশ্লেষণে নানা উপাদান মানুষ দেখতে পাচ্ছে। সাপ যখন প্রতীক হিসেবে ব্যবহূত হয় তখন তা ভয়ঙ্কর এবং নিঃশব্দ ঘাতকের ধারণাই দেয়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদরদের সাথে সাপের তুলনা অনেক দিন থেকেই মানুষ দিয়ে আসছে। এই যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে যৌথ পরিবার হয়েছে বিএনপি। ফলে সাপকে কাছে থেকে দেখেছে। বলা হয়ে থাকে বিষে বিষে নাকি বিষক্ষয় হয়। তাই কি বেগম জিয়া সর্পরূপী জামায়াতকে বিশ্বাস করতে পারছেন? আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং দুশমন জ্ঞান করা আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করতে পারছেন না?
আমাদের দেশের অতীত রাজনীতিতে সাপের আরো স্থূল ব্যবহার ছিল। খন্দকার মোশতাকের জনসভায় জ্যান্ত সাপ ছেড়ে আতঙ্ক সৃষ্টির কাজ খন্দকার সাহেব নিজেই করতেন বলে এক সময় প্রচারিত ছিল। সাপ শব্দের সাথে ষড়যন্ত্রেরও একটি প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে? তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর এতসব তোড়জোড়ের সাথে কোনো ষড়যন্ত্রের বেফাঁস ইঙ্গিত কি দিয়ে ফেললেন বেগম জিয়া?—যাই হোক, সর্প বিষয়ে এখানে ইতি টানতে পারলে এক রকম স্বস্তি খোঁজা যেতে পারতো। কিন্তু তা তো হবার নয়। জনগণের রাজনীতি নির্বাসিত হওয়ার পর এখনতো রাজনীতি আওয়ামী লীগ আর বিএনপির ঝগড়ার বলয়ে বন্দি হয়ে গেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের উদ্দেশ্যে শব্দবাণ ছুঁড়ে দিলে প্রতিপক্ষের আশু দরকার পড়ে উপযুক্ত জবাব দেয়া। না হলে যেন ঘুম হারাম। তাই যথারীতি ইট ছুঁড়ে দিয়ে পাটকেল খাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয় খালেদা জিয়াকে। আর অসহায়ের মত পরবর্তী বাণী শোনার জন্য উন্মুখ হতে হয় সাধারণ মানুষকে। পরদিনই আওয়ামী লীগের সভা ছিল সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে। শেখ হাসিনা তাই কালবিলম্ব করলেন না। তিনি জানিয়ে দিলেন খালেদা জিয়ার পক্ষে অমন কথা মানায় না, কারণ তিনি নিজেই সাপের ঝাঁপি নিয়ে হাঁটছেন। এই সাপ সাপুড়েকেও কাটে। তেমন হলে বিষ ছাড়াতে বিএনপি নেত্রী ওঝাও পাবেন না। পাল্টা জবাবটি কিছুটা রসালোই হয়েছে। মনে হয় আওয়ামী লীগ নেত্রীর এবারের জবাব তেমন অবান্তর হয়নি। কিছুটা হলেও যৌক্তিকতা পাওয়া যাবে। অতএব এখানেই সর্পবিষয়ক জটিলতার অবসান ঘটতে পারতো। কিন্তু হলো না। এই লেখাটি মুসাবিদা করা পর্যন্ত আরো দুদিন অতিক্রান্ত হয়েছে। এই দুদিন দুই পক্ষ সর্প বিষয়ে বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে নিরলসভাবে।
এসব বালখিল্যসুলভ আচরণে কৌতুকের আনন্দ আর জাতির আত্মমর্যাদার স্খলন ছাড়া আর কিছু প্রাপ্তি নেই। আমরা বহুবার অরণ্যে রোদন করেছি এদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা নেত্রীদের বাক সংযমের জন্য। গণতন্ত্র চর্চায় ফিরে এসে শোভন সুন্দর তাত্পর্যপূর্ণ শব্দ চয়ন করতে। জনগণের কথা আমাদের ভাগ্য বিধাতারা শুনতে পান বলে মনে হয় না। এরপরও আমরা আশাবাদী হতে চাই। বারবারই প্রত্যাশা নিয়ে ফিরতে চাই যে, রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসবে। ইতিহাসের নিয়মে এ প্রত্যাশার পূরণ একদিন নিশ্চয়ই হবে। তবে কখন আর কার হাতে তা বলা কঠিন।
++লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
