ঢাকায় শীতের বেলা ডোবার বেলা। তেমন আর শীত কই। তবু শীতের আমেজ আছে ঢাকায়। সেদিনও শীতের শেষ বেলায় রমনা পার্কে হাঁটতে গেলেন বিচারপতি কে. এম. সোবহান। যেমন গেছেন বহু বছর ধরে। সেদিনও তার ভোর হয়েছিল পাখী ডাকা ভোরে। কাজী হাউসের ঢাউস দরজা আর খড়খড়ি আলা জানালা খুলেছিলেন তিনি। আলো ফুটি ফুটি পৌষের সকাল। পুরোপুরি রবিকিরণ ছড়িয়ে পড়ার প্রধান ফটক খুলতেই খবরের কাগজ এসে গেছিল। বিবিসির প্রভাতী বাংলা শোনার আগেই খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে গেছেন। ৩১ ডিসেম্বর বছরের শেষ দিন। কত কত স্মৃতি, ঘটনাপঞ্জি, সংবাদপ্রবাহ ধারাবাহিক ভাবে সাজানো আছে শেষ দিনের সংবাদপত্রে। খবরের কাগজে চোখ বুলানোর পর নিয়ম মতো প্রাত্যহিকি সারলেন। ক্ষৌর কাজের পরই গোসল করে তৈরি হলেন প্রাতঃরাশের জন্য। প্রাতঃরাশ সেরে বাইরের গাড়ি বারান্দায় শীতের কবোষ্ণ রোদে পিঠ দিয়ে পড়লেন সংবাদপত্র। তারপর এসে বসলেন তার পড়ার ঘরে। সেখানও সংবাদপত্র পড়ার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো সরিয়ে রাখলেন টেবিলের এক পাশে। সন্ধ্যা বেলাই বসতে হবে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিভিন্ন কলাম লেখার কাজে। বছরের শেষ দিন তাই লেখার খোরাকও অনেক।
একাধিক সংবাদপত্র তার ঘরে কয়েকটি পড়তে না পড়তেই ১১টা বেজে যায়। উনি উঠে যান খাবার ঘরের দিকে। ১১ টায় নিয়ম করেই আরেকবার চা পান করেন তিনি। সবকিছুই তার ঘড়ির কাঁটায় বাধা। অলসতা করে সময় অপচয় করা তার অভিধানেই ছিল না। নিয়ম আর সময় মেনে চলা ছিল তার জীবনের ভরকেন্দ্র। তাই ঘড়ির কাঁটা ধরে চা পান করেই চলে আসেন পড়ার টেবিলে লেখালেখির পাশাপাশি অবিরাম ফোন আসে তার কাছে। নাহ, কোনদিনই মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেন না তিনি। একাধিক মোবাইল ফোন পড়ে থাকলো তার দেরাজে। তাই বাড়ির ফোন সদা ব্যস্ত। সেদিনও একাধিক ফোনের উত্তর দিয়েছেন। কাউকে কথা দিয়েছেন কোন সভার সভাপতিত্ব করবেন, কাউকে দিয়েছেন কোন জটিল আইনী পরামর্শ, কাউকে দিয়েছেন লেখা দ্রুত পাঠানোর জন্য। এ যাবত্কাল কারোর অনুরোধ উপেক্ষা করেননি তিনি। যেকোন অনুরোধে, কখনও বা আপন তাগিদে ছুটে গেছেন তিনি। কখনো প্রবল বর্ষণে বিনা ছাতায় কোন সভায় বসে থেকেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা, কোথাও প্রখর রৌদ্রে দীর্ঘক্ষণ মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে থেকে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়েও গেছেন। কখনো একাকী দাঁড়িয়ে থেকেছেন মসজিদ বা মন্দির রক্ষার জন্য। বিভিন্ন মিছিলে মিটিং এ অগ্রভাগে থেকে সাহস যুগিয়েছেন অনুগামীদের। নিরাশ করেননি কখনো কোন সংগঠনের সভা সমিতিতে অনেক দেরিতে সেই সভায় পৌঁছে। বরং পৌঁছেছেন সময়ের অনেক আগে। গাড়ি করে গেলে ঢাকার যানজটে আটকে পড়ার ভয়ে হেঁটেই চলে গেছেন সভা সমিতিতে যোগ দেবার জন্য। অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কারোর বারণেই উনি পিছপা হননি আপন কর্তব্য পালনে। ২০০১ পরিবর্তিত সরকারের সময় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন অনেক সময় একাকী, নির্ভয়চিত্তে, শংকাহীন দৃঢ়তায় একের পর এক সেমিনার ও আলোচনায় অংশ নিয়ে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসনে তিনি পুরোভাগে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তেমনিভাবে ২০০১ -এ নির্যাতিতা মেয়েদের পাশে ছুটে গেছেন সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন আমরণ। গণআদালত থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির তাগিদ দিয়ে গেছেন জোরদাররূপে। অজাতশত্রু হতে পারেননি তিনি, তার সত্যভাষণে আর অনাপোষকামী মনোভাবের কারণে প্রিয়পাত্র হতে পারেননি অনেকরই।
হূদরোগে আক্রান্ত হবার পর মালিবাগের বাড়ি থেকে রমনাপার্ক পর্যন্ত হেঁটে যেয়ে আর হাঁটতে পারতেন না তাই গাড়ি করে যেতেন। বছরের সেই শেষ দিনে বিনা ব্যতিক্রমে রমনা পার্কের গেটে নামলেন আর বহুদিনের পুরানো গাড়ি চালক বারেক মিঞাকে ৪টি টাকা দিলেন। কারণ দুপুরে বারেক মিঞা ব্যাটারী এনেছিল, বাকি পড়েছিল টাকা কয়টা। পুরিয়ে দিলেন দেনা। হাঁটতে গেলেন। হেঁটে এসে বসলেন এক বেঞ্চিতে। ঠিক তক্ষুণি এক আলোক চক্র ঘিরে ফেল্লো তাকে। সেই আলোক চক্রের মাঝে তিনি হয়তো বা দেখলেন সেই অতি পুরাতন পথিককে। যে চিরকাল ডাক দিয়ে যায় ওপারের। তিনি হয়তোবা বলেও উঠলেন “নিরুদ্দেশের পথিক আমায় ডাক দিলে কি!” সেই গোধূলি লগ্নে পথিকের হাত ধরে তিনি পার হয়ে গেলেন এপার থেকে পরপারের সেতু। আকাশের অনেক তারার মাঝে স্থান করে নিলেন নিজের ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৭ এ। ফেরা হোল না আর ঘরে। ঘটনার আকস্মিতায় স্তব্ধ হয়ে গেল যেন দীর্ঘজীবনের প্রবাহমান গতি। সেই সন্ধ্যায় আর বসা হলো না তার, লেখা হল না। লেখার কাগজের পাশে কলমটি খাপ খোলা অবস্থায় থেকে গেল। কাগজে লেখা থাকলো কয়েকটি লাইন।
৩১ ডিসেম্বর, ২০০৭, বছরের শেষদিনে চলে গেলেন বিচারপতি কে. এম. সোবহান কাউকে কিছু না বলে। রেখে গেলেন দীর্ঘজীবনের অভিজ্ঞতা, কর্মপ্রবাহ আর মানুষের জন্য ভালবাসা। তারপর বর্ষপরিক্রমায় কেটে গেছে ৫ টি বছর। আর পাখী ডাকা ভোরে শোনেনি কেউ দরজা খোলার শব্দ, চামড়ার চটি পায়ে চটাশ চটাশ শব্দ তুলে এগিয়ে যায়নি কেউ অতিথি অভ্যর্থনায়, বাজেনি কোন ফোন কোন অনুরোধে। ৮৩ বছর আগে কাজী আবু সাঈদের পঞ্চম সন্তান হিসেবে জন্ম নিয়েছিলেন বিচারপতি কাজী মাহবুবুস সোবহান কালক্রমে তিনি আপন গুণে হয়ে উঠেছিলেন দেশ ও দশের একজন। মানবতাবাদী, সাহসী, সত্যভাষী মানুষ হিসেবে তাকে জেনেছে সবাই। কিন্তু প্রচারবিমুখতার কারণে তার জীবনের অনেক কথা, অনেক কর্মকাণ্ড রয়ে গেছে নিভৃতে। কেউ কি আছেন তার পূর্ণাঙ্গ জীবন কাহিনী লিখতে পারেন? অজানা সেই তথ্য জানার জন্য আমি ও আমরা “কান পেতে রই”।
[ মন্ট্রিয়ল থেকে ]
rumana^[email protected]
