স্মরণ

চিরঞ্জীব মণিদা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৮
কিংবদন্তির মহানায়ক, সুসং দুর্গাপুরের অহঙ্কার, সমাজ প্রগতির অগ্রদূত, শোষিত-বঞ্চিত মেহনতী মানুষের ভরসাস্থল প্রয়াত কমরেড মণি সিংহের প্রয়াণ দিবস ৩১ ডিসেম্বর। টংক প্রথা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত সুসং দুর্গাপুরের টংক শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের পাদপিঠে প্রতিবারের মত এবারও ‘মণিদার’ প্রয়াণ দিন থেকে সাত দিনব্যাপী কমরেড ‘মণি সিংহ মেলা’ শুরু হচ্ছে। সমগ্র দেশ যখন আজ রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে বিভাজিত তখন ‘মণি মেলা’-কে ঘিরে এদেশের এ প্রত্যন্ত অঞ্চলটি হয়ে উঠে এক জনঐক্যের প্রতীক। দলমত নির্বিশেষে সকলের যৌথ উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় এই মেলা আয়োজিত হয়। ‘মণিদা’ এখানে সকলের উর্ধ্বে। তার আদর্শ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সত্য-নিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান সবকিছুই ‘মণিদা’-কে সংকীর্ণ বিভেদের উর্ধ্বে দাঁড় করিয়েছে। টংক আন্দোলনের ব্যাপক, বিশাল, সশস্ত্র অভ্যুত্থান যারা চাক্ষুষ দেখেছেন এমন লোকের সংখ্যা এই জনপদে খুবই কম। এখনও যারা বেঁচে আছেন তাদের কাছ থেকে জানা যায়, কি বিশাল ঐক্যে সংগঠিত ছিল এই আন্দোলন। আমার সৌভাগ্য যে, আমি কৈশোর বয়সে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সুসং মহারাজাদের ভাগ্নে ছিলেন তিনি। মামাদের বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও পরিবারের বিপরীতে তাকে দাঁড় করাতে পেরেছিল তার ভিতরের শোষণ মুক্তির চিন্তা ও কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি দৃঢ় ও অবিচল অবস্থান। তিনি জানতেন, এর পরিণতিতে তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে এসে ‘মণিদা’ দাঁড়িয়েছিলেন হাজার হাজার শোষিত কৃষকের পক্ষে। যা আজ ইতিহাসের অংশ। ‘মণিদা’র বাসা ও আমাদের বাসা পাশাপাশি ছিল। আন্দোলনের উত্তাল সময়ের নানা ঘটনা আমার চাক্ষুষ দেখার সুযোগ হয়েছিল। দশ বার হাজার নারী-পুরুষের শ্লোগান মুখরিত জঙ্গি মিছিল সুসং দুর্গাপুর প্রদক্ষিণ করতো-তাদের মুখে “জান দিব তবু ধান দিব না”, “টংক প্রথা উচ্ছেদ চাই”, “জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ চাই”। আমার মানসপটে আজও সেই সব দৃশ্য ভেসে উঠে। ‘মণিদা’র বিরল সাংগঠনিক ক্ষমতার কথা মনে হলে শিহরণ তৈরি করে। প্রায় বিছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এমন সু-সংগঠিত আন্দোলনকে সফলতার রূপ দেয়া, যা তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তা মণিদারই বিচক্ষণ নেতৃত্বের প্রকাশ। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সনে উপমহাদেশের ভৌগোলিক বিভাজন, হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে রূপ নেয়া এই ভূখণ্ডে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আন্দোলনগুলো হোঁচট খায়। মানুষজন সাময়িক মহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সামপ্রদায়িক পাকিস্তান সরকারের ব্যাপক নির্যাতন, নিপীড়ন ও পরিশেষে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের মাধ্যমে শেষ হয় এই আন্দোলন। বর্ণনাতীত নির্যাতনের শিকার এর সংগঠক কর্মিগণ, বাধ্য হন দেশান্তরী হতে। তত্কালীন নূরুল আমীন সরকার কি নির্মমভাবে মণিদার বাসা-বাড়িকে বিরান ভূমিতে পরিণত করেছিলেন, উচ্ছেদ হতে হয়েছিল সমস্ত পরিবারকে, মণিদাকে আত্মগোপনে যেতে হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সমগ্র কমিউনিস্ট বিশ্ব, তথা তত্কালীন বৃহত্ পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নকে (বর্তমান রাশিয়া) আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সপক্ষে দাঁড় করাতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী। যা আমাদের স্বাধীনতাকে সফলতার দিকে বেগমান করে তুলেছিল। আমার পরম সৌভাগ্য এই মহাপুরুষটির আমি স্নেহলাভের সুযোগ পেয়েছিলাম। মণিদা ও বউদি ১৯৭২-১৯৮০ যতবারই সুসং দুর্গাপুরে এসেছেন আমি তাদের আতিথ্য দেয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমার কৈশোর বয়সের মানস পটে মণিদার আদর্শ যে আদর্শিক রেখা টেনে ছিল আজও তার অবিচল বিশ্বাস নিয়ে চলেছি। ১৯৯০ -এর স্বৈরাচার মুক্ত দেশে ৩১ ডিসেম্বর মণিদা আমাদের ছেড়ে পরলোক গমন করেন। তার শেষ শবযাত্রার সাথী ছিলাম। কালের চক্রে ৮১টি বছর কেটে গেল, অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা মনে পড়ে। এমন সহজ-সরল নির্লোভ নেতার আজ বড় প্রয়োজন। আমরা ‘মণি মেলা’র মাধ্যমে, সাত দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মণিদার জীবন দর্শন, আদর্শ বর্তমান প্রজন্মের নিকট প্রচারের চেষ্টা করি। আমার ঐকান্তিক বিশ্বাস, মণি মেলার দিন দিন বিশালতায় এই প্রমাণ করে যে, আগামী প্রজন্ম তার অতীত থেকে সত্যকে খুঁজে বের করে ধারণ করতে চায় নিজেদের জীবনে। সূর্যের আলোর মত সমস্ত অপশক্তির কালিমাকে পেছনে রেখে সত্যের উদ্ভাস হবেই, জয়ী হবে মেহনতী মানুষের আকাঙ্ক্ষা, গঠিত হবে শোষণমুক্ত সমাজ এটাই বিজ্ঞান। মেহনতী মানুষের জয় হোক, কমরেড মণি সিংহ লাল সালাম। লেখক :কমরেড মণি সিংহের ঘনিষ্ঠ সহচর ও আহ্বায়ক, কমরেড মণি সিংহ মেলা উদযাপন কমিটি, সুসং দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন