[ রা জ নী তি ]

গণতান্ত্রিক রাজনীতি ২০১২-এর খতিয়ান

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪১
বাঙালির জীবনাচরণে এখন ইংরেজি বর্ষের হিসেব। ১ জানুয়ারি শুরু হয় ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর পশ্চিমা আধুনিকীকরণের স্পর্শ এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই আজ ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন। বাঙালির রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা, এমনকি অতি সাধারণ দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনের হিসেবের জায়গায়ও ১ জানুয়ারি। তরুন-তরুণীরা মেতে থাকে এই ইংরেজি নববর্ষের হিসেব নিয়েই। কারণে-অকারণে আজ ইংরেজি নববর্ষের জয়জয়কার। ১ জানুয়ারিই বাস্তবতা। জীবনের হিসেব এখান থেকেই শুরু। বাঙালির জীবনাচরণের পরিবর্তিত ধারায় এই লেখাও শুরু করতে হলো ১ জানুয়ারি দিয়েই। ১ জানুয়ারি ২০১২, গত বছর বাঙালির জীবনে ইংরেজি নববর্ষ যেদিন শুরু হয়েছিল সেই একই তারিখে অর্থাত্ ২০১৩ সালে বাঙালির গণতান্ত্রিক অপরাজনীতির এক বছরের খতিয়ান তুলে ধরছি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গত এক বছরের খতিয়ান তৈরি করা যাবে; কিন্তু দেনা-পাওনার হিসেব মিলানো যাবে না। চার বছর আগে বাংলাদেশের জনগণ একবুক আশা নিয়ে বিরাট উচ্ছ্বাসের সাথে মহাজোটকে নির্বাচিত করেছে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দিয়ে। অন্যদিকে চারদলীয় জোটকে ম্যান্ডেট দিয়েছিল বিরোধী দল হিসেবে ছায়া সরকার গঠনের। মহাজোট সরকার গঠন করেছে। চার বছর পার হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট ছায়া সরকার গঠন করেনি এবং সংসদে নয়, রূপসী বাংলা হোটেলে বাজেট বক্তৃতাও দিয়েছে। কিন্তু জনগণের দেনা-পাওনার হিসেব মিলেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচন। রাশি রাশি প্রতিশ্রুতি। প্রতিশ্রুতি প্রদানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মহাজোট ও চারদলীয় জোটের মধ্যে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দলগুলোর একটাই দাবি—ভোট চাই। সব ভোট চাই। মানুষ ভোট তাদের পকেটে যত্ন করে রেখে দেয়নি। সব ভোটই দিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ ভোটই দিয়েছে মহাজোটকে আর সামান্য ভোট দিয়েছে চারদলীয় জোটকে। কিন্তু বছর ঘুরে হালখাতায় পাওনার হিসেব শূন্যই রয়েছে। রাশি রাশি প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতার ভারে মহাজোট নুয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জনগণের কষ্ট লাঘবে খুব সামান্য মনোযোগ দিয়েই নুয়ে পড়া মহাজোটকে দেখে বিরোধীরা অট্টহাসি হাসছে। ২০১৪ সালকে গুনছে। তারা এবার প্রতিশ্রুতি দিবে। রাশি রাশি প্রতিশ্রুতি। জনগণ আবার বোকা হয়ে যাবে। প্রতিশ্রুতির স্রোতে জনতার সকল ভোট ভেসে আসবে চারদলীয় জোটের জালে। তাই তারা কষ্ট করে জনগণের কষ্ট লাঘব করতে যাবেন না। মহাজোটকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন না। বিরোধী জোট ব্যস্ত ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিশ্রুতির তালিকা দীর্ঘ করতে। অন্যদিকে, সরকার ২০১২ সালে ব্যস্ত ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো অবাস্তবায়নের তালিকা দীর্ঘ করতে। রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করা হয় এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তিতে। কেউ কেউ জনগণের দাবি ও সমর্থন এবং সরকারের সাড়া প্রদানের সমীকরণ দিয়েও একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাত্সরিক হিসেব তৈরি করে থাকেন। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জনগণের দাবির যে খতিয়ান ছিল সেই খতিয়ানের প্রতি সরকার কর্তৃক গৃহীত নীতিগুলোর চরিত্র কী ছিল তার মূল্যায়ন করলে সরকারের সাড়া প্রদানের বিষয়টি অবোধগম্য থাকবে না। তাছাড়া, এক বছর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোগুলো জনগণের দাবিগুলো সরকারের কর্ণকুহরে কতটুকু পৌঁছাতে পেরেছে এবং সরকারকে সে দাবি অনুসারে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পেরেছে, তার মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে এক বছরের হিসেবের খতিয়ান বৈজ্ঞানিকভাবে প্রস্তুত করা যাবে। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলো শাসন বিভাগ। এই বিভাগের সাথেই জনগণের দাবি-দাওয়ার বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি জনগণ এই বিভাগের নিকট প্রধানত যা প্রত্যাশা করেছিল তা হলো জন নিরাপত্তা। কিন্তু বছরের শুরুতে সাগর-রুনির হত্যা, ইলিয়াস আলীর গুম ইত্যাদি বিষয় বাংলাদেশের মানুষের জননিরাপত্তার দাবি আরো নাজুক করেছে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের বেপরোয়া তাণ্ডব জনমনকে শঙ্কিত করেছে। জননিরাপত্তার পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনাও শাসন বিভাগের হাতে। কিন্তু সরকারের লোকজনের সহায়তায় হলমার্ক ও ডেসটিনি বছরের শেষদিকে যেভাবে আর্থিক ব্যবস্থার প্রাণ ব্যাংক খাতকে লণ্ডভণ্ড করলো তা দেশবাসীকে হতাশ করেছে। চারদলীয় জোট সরকার আমলের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে ২০১২ সালেও মহাজোট সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি আইএমএফ-এর পরামর্শে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শাসন বিভাগকে জনগণের দাবির বিপরীতে দাঁড় করায়। এক পর্যায়ে মন্ত্রিসভার রদবদল হয়; কিন্তু শাসন বিভাগের ব্যর্থতার রদবদল হয়নি। বছর শেষে রাজপথে গণতান্ত্রিক ছাত্রনেতাদের হাতে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য বিশ্বজিত্ খুন, বিএনপি অফিসের সামনে থেকে হোটেল ম্যানেজার রিপনের আটক হওয়ার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন বিভাগের অগণতান্ত্রিক চরিত্রই ফুটে উঠেছিল। সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল শেয়ার মার্কেট ধস। লাখ লাখ মানুষের চোখের পানি ঝরেছে। সরকার শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের আইনের অধীনও করেনি। আইন বিভাগ সরকারের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই বাঙালি জাতি জাতীয় আইনসভার স্বপ্ন দেখে এসেছে। সেই স্বপ্নের পথে ৭১-এর গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতীয় আইনসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বপ্ন ছিল এমন একটি আইনসভা প্রতিষ্ঠিত হবে যে আইনসভা শাসক নয়, শাসিতের প্রয়োজনে আইন তৈরি করবে। কিন্তু ২০১২ সালেও সেই পূর্বের চিরচেনা আইনসভা। যার মুখে শাসিতের স্বপ্ন নয়, স্বপ্ন শাসকের। শুধু সদস্যপদ রক্ষা করা ছাড়া ২০১২ সালেও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আইনসভা বিরোধী দলের মুখ দেখেনি। সরকারও কম কিসে। বিরোধী দল না আসলেই যেনো ভালো হয় এমন ভাব। নিরুত্তাপ সংসদে নিজেরাই ঝড় তুলেন কখনো অনুপস্থিত বিরোধী দলকে হেয় করতে, আবার কখনো বুঝে না বুঝে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করতে। বছর জুড়েই ছিল সরকারি দলের সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিতর্কের উত্তাপ। সুপ্রিম কোর্ট সংসদের লাগাম টেনে ধরার অনাবশ্যক চেষ্টা করলেও সংসদের ক্ষমতা কম কিসে! ১৯৯৬ সালে গণতন্ত্রকে নিরাপদ করতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালুর দাবিতে বাংলাদেশের মানুষ যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সয়েছে সেই মানুষদের একবারও জিজ্ঞাসা না করে রাবার স্ট্যাম্প সংসদে মুহূর্তের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে উত্খাত করতে সংসদ তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। অন্যদিকে, বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক। সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে বিভক্ত রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগ জাতির দেহে এমনভাবে আঘাত করে যে, ২০১৩ সাল যে এই বিভক্ত জাতির জন্য ভালো যাবে না তা সহজেই অনুমান করা যায়। রাজনৈতিক দলগুলোও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আগের মতোই ২০১২ সালেও দলের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বৈরিতা ও দূরত্ব বেড়েছে। বছর শেষে নেত্রীরা রাজনীতিতে সাপের খেলা দেখাতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নৈরাজ্যের নারকীয় উত্তাপ আরো ভয়াবহ হবে যদি জাতিকে রাজনীতির বিষাক্ত সাপ দংশন করে। ময়লার গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রের প্রতি মায়াকান্না আরো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনের সংলাপ নাটক অসমাপ্ত রেখেই বিরোধী দলের সাথে পরামর্শ না করে নির্বাচন কমিশন গঠন, পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধানে সরকারের ব্যর্থতা, মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন অভিযোগ সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রতি জনগণের অবিশ্বাসের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। গ্রামীণ ব্যাংক ও অধ্যাপক ইউনূস বিষয়ে অহেতুক বিতর্ক, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সংস্কারের ন্যায্য দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর শান্তির মডেল জাতিসংঘে গৃহীত হওয়া আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ অর্জন। যার ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বেশি আগ্রহী হবেন আশা করছি। সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের আমলে কতিপয় দুষ্কৃতকারী কর্তৃক রামুর বৌদ্ধ পল্লীতে আগুন দেয়ার বিষয়টি। এই ঘটনা বাংলাদেশের সকল সাধারণ জনগণকে আঘাত করেছে। সরকারের গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনীর ব্যর্থতা নাগরিকদের হতাশ করেছে। পাশাপাশি যারা এই নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। অবশ্যই সরকারের উচিত হবে সকল অপরাধীকে গ্রেফতার করা এবং আইনের অধীন করা। তবে সরকারের অনেক ব্যর্থতা সত্ত্বেও সড়ক ও জনপথের বিভিন্ন কাজে যোগাযোগমন্ত্রীর সরেজমিন পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে উত্সাহিত করেছে। অনেকে হয়তো বলবেন একজন মন্ত্রীকে এভাবে কাজ করতে হবে কেন? কিন্তু আমরা বলবো, এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ ছিল। যে দেশে দুর্নীতির মহামারী সেদেশে মন্ত্রীদের এই ধরনের পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ দুষ্টু লোকদের আতঙ্কিত করবে। ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ভালো না চললেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ দেশের তাঁতি, শ্রমিক, কৃষকেরা যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এরচেয়ে বেশি খারাপ না হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির উপর পশ্চিমা ও হিন্দী সংস্কৃতির আগ্রাসন পূর্বের দিনগুলোতে যেভাবে বেড়ে চলছিল ২০১২ সালেও তা অব্যাহত ছিল। বছর শেষে পোশাক শ্রমিকদের পোড়া গন্ধ, নির্মাণাধীন উড়াল পথের নিচে পচা লাশ, রাজপথে নিরীহ বিশ্বজিতের রক্ত, রেলক্রসিং-এ সন্তান বুকে গৃহিণীর মৃত্যু গণতন্ত্রের প্রতি বাংলাদেশের মানুষকে হতাশ ও অবিশ্বস্ত করেছে। ২০১৩ সালে প্রথম দিনে তাই বলতে চাই, মহান মুক্তিযোদ্ধারা ৭১ সালে এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেননি। ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা শূন্যই রইলো। তাই আমরা রাজনৈতিক গণতান্ত্রিকভাবে হতাশ। লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন