বিদায় ২০১২। স্বাগতম ২০১৩। আজ ইংরেজি নববর্ষের পহেলা দিন। বর্ষ পরিক্রমার মধ্য দিয়া পুনরায় একটি নূতন বত্সর আজ আমাদের দুয়ারে সমাগত। বিশ্ববাসী নূতন বত্সরের প্রথম এই দিনটিকে বরণ করিতে প্রতি বত্সরের ন্যায় এইবারও বরণডালা সাজাইয়াছে। ইংরেজি নববর্ষের আবেদন ও আবাহন বলিতে গেলে বিশ্বের বৃহত্তর বা বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনের গতিধারার সহিত আজ সম্পৃক্ত। বিশ্বব্যাপী ইংরেজি নববর্ষের এমন আবেদন বা প্রভাব সৃষ্টি হইবার পিছনে ইতিহাস আছে, ইহা একদিনে তৈরি হয় নাই। যিশু খ্রিস্টের জন্মতারিখ হইতে যে দিন-ক্ষণ-মাস-বত্সরের হিসাব শুরু হইয়াছিল উহাই আজ ইংরেজি বর্ষ হিসাবে স্বীকৃত। এক সময় বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যাইতো না। অর্থাত্, বিশ্বের এক বিশাল অংশ ছিল বৃটিশ শাসনাধীনে। ফলে ইংরেজ জাতির উদ্ভাবিত নানান প্রযুক্তি জ্ঞান-শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির প্রভাব উহার অধীনস্থ দেশসমূহের উপর ব্যাপকভাবে পড়িয়াছে ইহাতে সন্দেহ কী। ইহার দরুন অধীনস্থ দেশসমূহের অনেকেরই নিজস্ব পঞ্জিকা বা বর্ষ থাকিলেও ইংরেজ প্রভাবাধীনে কালক্রমে উহা গৌণ হইয়া পড়ে। ইহার দরুন ইংরেজি নববর্ষ ঐসব দেশের মানুষের জীবনের চালচিত্রে ব্যাপক ছাপ রাখিতে সক্ষম হয়। আমরা এই উপমহাদেশের বাঙলা অঞ্চলের বাসিন্দারা বৃটিশদের আগমনের পূর্বে বাংলা সন বা হিজরি সন অনুসরণে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু বৃটিশ শাসনের অধীনস্থ হইবার পর হইতেই সাল গণনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা ইংরেজ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ের আওতাভুক্ত হইয়া পড়িতে থাকি। ইহার ফলে ধীরে ধীরে আমাদের জীবন হইতে বাংলা বা হিজরি সনের আবেদন কিংবা প্রভাব হারাইয়া যাইতে থাকে।
ইংরেজি নববর্ষ আমাদের নিজস্ব সম্পদ নহে। সভ্যতার ক্রমবিকাশ ধারায় আমরাও ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মৌলিকত্বের প্রমাণ রাখিয়া আসিয়াছি। বাংলা সন যদিও মোগল সম্রাট আকবরের সময় চালু হইয়াছিল, তথাপি ইহা বিশেষত আমাদের গ্রামীণ জীবনকে বহুলাংশে প্রভাবিত করিয়াছে। ফসল উত্পাদন আর ঋতুবৈচিত্র্যের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ এ বাংলা সনের আমেজ আজও পল্লী জীবনে অনুভূত হয়, যদিও আমাদের নাগরিক জীবনের পরতে পরতে ইংরেজি সনেরই প্রভাব-প্রতিপত্তি লক্ষণীয়। ইংরেজি শিক্ষা-সংস্কৃতি মূলত: ইংরেজ জাতির বিশ্বময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণেই ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করিয়াছে। ফলে ইংরেজি সন-তারিখকে এখন আর এড়াইয়া যাইবার উপায় নাই। তাই ইংরেজি নববর্ষ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-জাত বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও আমাদের জীবনের সর্বত্রই ইহার প্রভাবকে আজ আর অস্বীকারের পথ খোলা নাই। হিজরি সন, বাংলা সন মুসলিম অধ্যুষিত এই বাংলাদেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উত্সবের সহিত এক সূত্রে গাঁথা রহিয়াছে। ফলে ঈদ, মহরম, রোজা, শবেবরাত ইত্যাদিও বাংলা নববর্ষ কিংবা চৈত্রসংক্রান্তি, ফসল কাটার উত্সব, শারদীয় দুর্গোত্সব, প্রবারণা পূর্ণিমা, দোল উত্সব ইত্যাদি নানান উত্সব পালিত হয় এই বাঙলায় ঐ বাংলা সন ও হিজরি সনকেই কেন্দ্র করিয়া।
এতদসত্ত্বেও, বিজাতীয় হইলেও ইংরেজি নববর্ষই আমাদের জীবনে বোধগম্য কারণেই অধিক প্রাধান্য লাভ করিয়া থাকে। তবে এই নববর্ষকে ঘিরিয়া থার্টি ফার্স্ট নাইট বা পহেলা জানুয়ারিতে যে হুড়াহুড়ি, মাতামাতি দেখা যায় উহা অভিপ্রেত নহে নিশ্চয়ই! বিজাতীয় সংস্কৃতির দ্বারা মোহাবিষ্ট হইয়া যাহারা থার্টি ফার্স্ট নাইটে উচ্ছৃংখলতা বা হুড়াহুড়ি-মাতামাতি করিয়া জনজীবনকে আতংকগ্রস্ত করিয়া তোলে তাহাদের বোঝা উচিত যে, বিদেশি সংস্কৃতির বাহ্যিক রূপ নহে উহার অন্তরতম স্বরূপকে অনুসরণ করিলে নিজের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হইবার অবকাশ পাইবে। ইংরেজি নববর্ষের এই দিনে কামনা করি দেশবাসী সকলের সুখ ও সমৃদ্ধি। নূতন বত্সরের প্রতিটি দিন হউক সুন্দর অনাবিল।
