নূতন বত্সর আসিয়াছে। সংবিধান অনুযায়ী এই বত্সরেই নির্বাচন। আন্দোলনেরও বত্সর ইহা। বিরোধী দল আন্দোলনের মধ্যেই আছে। তাহারা একটার পর একটা কর্মসূচি দিয়া যাইতেছে। সরকার এবং সরকারি দলও বসিয়া নাই। মঞ্চে ও ময়দানে তাহারাও সক্রিয় যথারীতি। নির্বাচন যত ঘনাইয়া আসে বিরোধী দল ততবেশি সংগ্রামমুখর হইয়া ওঠে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের নূতন নহে। স্বৈর শাসনাবসানের মধ্য দিয়া দেশে গণতন্ত্র পুন:প্রবর্তিত হইবার পর হইতে আমরা এইরূপই দেখিয়া আসিতেছি। নির্বাচনের এক-দেড় বত্সর আগে হইতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হইতে শুরু করে। এইবারও তাহার ব্যতিক্রম ঘটিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। বিরোধী দল জানাইয়া দিয়াছে যে, তাহারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হইতে দিবে না, হইলে তাহারা সেই ইলেকশনে যাইবে না। বর্তমান সরকার মেয়াদ পূর্ণ করুক, তাহাতে কোনো আপত্তি নাই। বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা এমত মন্তব্য করিবার পাশাপাশি পরিষ্কার বলিয়া দিয়াছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে কোনো আপোস নাই। জোটের অন্য নেতাদের কেহ কেহ সরকারের পতন ঘটাইবার মেঠো সংকল্পও ব্যক্ত করিয়া চলিয়াছেন।
পক্ষান্তরে সরকারি দল আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক সংশোধিত শাসনতন্ত্র অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কৃতসংকল্প। অর্থাত্ এই সরকারের অধীনেই ইলেকশন হইবে। সরকারি পক্ষের কেহ কেহ এমনও বলিতেছেন যে, সকল দলকে লইয়াই নির্বাচন হইবে। দেশি-বিদেশি উপদেশকগণও নিশ্চুপ নহেন। তাহারা উদ্বিগ্ন। তাহারা আলোচনা-সংলাপ অনুষ্ঠানের হিতোপদেশ দিয়া যাইতেছেন। নির্বাচন আদৌ হইবে কিনা, হইলে কি প্রকারে হইতে পারে তাহা লইয়াও অনেকে খুবই চিন্তিত। কিন্তু সরকারি পক্ষের এই নিয়া পরোয়া নাই। এই সরকারের অধীনেই ইলেকশন হইবে, উহাতে সকল দলই অংশগ্রহণ করিবে তাহাদের এইরূপ আত্মবিশ্বাসের উত্স কোথায় সে এক বিরাট কৌতূহলের বিষয়।
রাজনৈতিক ধারাক্রমে মঞ্চে ও নেপথ্যে এমন অনেক কিছু ঘটিয়া থাকে যাহা সব সময় ঠিক মত বুঝিয়া উঠিতে পারা যায় না। এই ক্ষেত্রে কাজ করিয়া থাকে ভূ-রাজনৈতিক নানা উপাদান, নানান হিসাব নিকাশ। মঞ্চের পিছনেও থাকিতে পারে অনেক কুশিলব। নিরেট আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে কোনো সরকারের পতন যে ঘটে না, তাহা অস্বীকার করা সহজ নয়। এমনকি আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত হইবার পশ্চাতেও কাজ করিয়া থাকে সেইসব উপাদান। একটু খেয়াল করিলেই দেশে ও বিদেশে অনুরূপ দৃষ্টান্ত খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে অনেক। এমতাবস্থায় বাংলাদেশে এক্ষণে আন্দোলন সংগঠিত করা কিংবা আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের আপাত:সম্ভাবনা নাই বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। তাহা সত্ত্বেও মনে রাখিতে হইবে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের সুনির্দিষ্ট মেয়াদ রহিয়াছে। সেই মেয়াদ শেষ হইবার পর নূতন মেয়াদে নূতন সরকার আসিবার একমাত্র পথ ইলেকশন। ইহার কোনো বিকল্প নাই। কাজেই নির্বাচন হইতে হইবে এবং সেই নির্বাচনটি হইতে হইবে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান কিভাবে সম্ভব করিয়া তোলা যায়, সেই ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা একান্ত প্রয়োজন।
