সাবেক রাষ্ট্রপতি কি যথার্থ বলিয়াছেন

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৫
সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলিয়াছেন যে, দেশটা কাহারো বাবার কিংবা কাহারো স্বামীর নহে। গত রবিবার সিলেটের এক জনসভায় বক্তব্য রাখিতে গিয়া তিনি এই মন্তব্য করেন। সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি’র বাহিরে জাতীয় ঐক্য গড়িয়া তুলিবার আহ্বানকে সামনে রাখিয়া এই জনসভাটির আয়োজন করা হয়। ইহার প্রধান দুই উদ্যোক্তার একজন হইলেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। অপরজন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। লক্ষণীয় যে, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ইতঃপূর্বে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতাই শুধু ছিলেন না, তিনি দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও বটে। একইভাবে ড. কামাল হোসেন একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্যও হইয়াছিল তাঁহার। কাকতালীয়ভাবে উভয়েই বর্তমানে স্বতন্ত্র দুইটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সমালোচনায় সমভাবে মুখর। এই ঐক্যসূত্রই হয়তো বিপরীত মেরুর এই দুই নেতাকে একমঞ্চে উপনীত করিয়াছে। যাহাই হউক, উভয়েই বয়সে প্রবীণ, সুশিক্ষিত, স্বনামধন্য এবং পেশাগত ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল। তাহাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সর্বোপরি, সুস্থ ধারার রাজনীতির প্রধান প্রবক্তা হিসাবেও তাঁহারা সুপরিচিত। অতএব, দেশের বিদ্যমান রাজনীতির সমালোচনা করিতে গিয়া সাবেক রাষ্ট্রপতি যেই মন্তব্যটি করিয়াছেন তাহাকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। ‘দেশটা কাহারো বাবার কিংবা স্বামীর নহে’— এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কী বুঝাইতে চাহিয়াছেন তাহা তিনিই ভালো বলিতে পারিবেন। তবে আমাদের সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিতে যতোটুকু আমরা হূদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছি তাহাতে মনে সংশয় জাগে যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি কি যথার্থ বলিয়াছেন? দেশে যতো নাগরিক আছে, দেশটি যে তাহাদের কাহারও না কাহারও বাবার কিংবা স্বামীর তাহা আমরা অস্বীকার করিব কিভাবে? সাবেক রাষ্ট্রপতি যদি বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে উদ্দেশ্য করিয়া কথাটি বলিয়া থাকেন সেই ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সাবেক রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী যদি কেহ সত্যি সত্যি দেশটাকে ‘বাবার’ বা ‘স্বামীর’ সম্পত্তি বলিয়া মনে করিতেন, তাহা হইলে দেশের অবস্থা সম্পূর্ণ অন্য রকম হইত বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। সম্পত্তির প্রতি এই দেশের মানুষের ভালোবাসা কতোটা প্রবল তাহা কাহারো অজানা নহে। আর সেই সম্পত্তি বাবার বা স্বামীর হইলে তো কথাই নাই। সেই সম্পত্তি রক্ষার জন্য মানুষ নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। দেশের জন্য সেই ধরনের দরদ কিংবা ত্যাগী মানসিকতা থাকিলে তো আর কোনো সংকটই থাকিত না এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনকেও এই বয়সে রাজনীতির কর্দমাক্ত মাঠে ছোটাছুটি করিতে হইত না। বলা বাহুল্য যে, প্রবল দেশাত্মবোধ ছিল বলিয়াই নিকট-অতীতে আমরা বহু অসাধ্য সাধন করিয়াছি। মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের কঠিন দিনগুলিতে এই দেশাত্মবোধই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিয়াছে। আজ সর্বত্র অনৈক্য ও অসহিষ্ণুতার যে প্রবল দাপট দেখা যাইতেছে, দেশাত্মবোধের অভাবই যে ইহার অন্যতম প্রধান কারণ তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও দেশ আগাইয়া যাইতেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পথে বিপজ্জনক বাধা বা ঝুঁকি হিসাবে কাজ করিতেছে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, স্বাধীনতার চার দশক পরেও আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারি নাই। ফলে অনিশ্চয়তা ও সংঘাত আমাদের পিছু ছাড়িতেছে না। দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থাকিলে এবং দেশের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারিলে সহজেই যে এই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব, তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন