হার্ডিঞ্জ ব্রিজের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ইত্তেফাকের মফস্বল পাতায় গত মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন ছাপা হইয়াছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ব্রিজটির একটি গার্ডার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ইহা মেরামত করা হইলেও বর্তমানে এই গার্ডারটি কিছুটা দাবিয়া গিয়াছে। ফলে সেতু দিয়া ট্রেন চলিতেছে খুবই ধীরগতিতে। তাহাছাড়া ব্র্রিজটির একশত বত্সরের গ্যারান্টিকাল উত্তীর্ণ হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই ব্রিজটি সংস্কার করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজই নহে, অন্য অনেক ব্রিজের অবস্থাও শোচনীয়। বিশেষত মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় দেশের অসংখ্য বেইলি ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। এ ধরনের ব্রিজ নির্মাণই করা হয় অস্থায়ীভাবে। সাধারণত ৩-৫ বত্সর পরপর ইহার সংস্কার করা দরকার হইয়া পড়ে। কিন্তু অনেক ব্রিজের বয়স ২৫-৩০ বত্সর পার হইয়া গেলেও তাহা স্থায়ী ব্রিজে রূপান্তরের কোন উদ্যোগ নাই। ব্রিজগুলি আরও নানা কারণে ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। প্রথমত জনগণের অসচেতনতার কারণে অনেক ব্রিজের পাত ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ খুলিয়া নিয়া গিয়াছে দুর্বৃত্তরা। দ্বিতীয়ত মাত্রাতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচল করায় ইহা আরও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী বেইলি ব্রিজের উপর দিয়া পাঁচ টনের বেশি মালামাল বহন করা যায় না। তবে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেক সময় ২০ টন মালামাল নিয়াও যানবাহন চলাচল করিতেছে। ফলে পত্র-পত্রিকায় প্রায়শ বেইলি ব্রিজ ভাঙ্গিয়া বাস, ট্রাক প্রভৃতি যানবাহন দুর্ঘটনায় কবলিত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হইতেছে। ওভারলোডেড যানবাহন চলাচলের কারণে বেইলি ব্রিজগুলি অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। মটরযান আইনের ১৫৪ ধারা অনুযায়ী অনুমোদিত ওজন অতিক্রমপূর্বক গাড়ি চালাইলে ৫০০ টাকা জরিমানা দেওয়ার বিধান রহিয়াছে। ব্রিজগুলি রক্ষায় এই আইনও যুগোপযোগী করিয়া সংশোধন করা দরকার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে বেইলি ব্রিজের প্রচলন হয়। ইহার মডেল তৈরি করেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ডোনাল্ড বেইলি ও তাহার নামেই এই ধরনের ব্রিজের নামকরণ হয়। ১৯৪২ সালে উত্তর আফ্রিকায় ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম এই ধরনের ব্রিজ তৈরি করে। ইহার পরে আমেরিকান সামরিক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটও ইহার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। সাধারণত বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হয় যুদ্ধকালীন বা বিশেষ পরিস্থিতিতে। ইহার সুবিধা হইল, এই ব্রিজ নির্মাণের জন্য বিশেষ বা ভারি কোন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। যাহা হউক, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারা বাংলাদেশে ব্রিজের সংখ্যা ৪৬৫৯টি। তন্মধ্যে স্টিল ও টিম্বার ডেকের বেইলি ব্রিজের সংখ্যা যথাক্রমে ১০০৫ ও ৮২টি। ইহাছাড়া এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনেও বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে। ব্রিটিশ আমল হইতেই বাংলাদেশে ইহার নির্মাণ চলিয়া আসিতেছে। একসময় বেইলি ব্রিজের জন্য অনুদান দেওয়া শুরু করে জাপান। তাহার পর চীন ও ভারত হইতে বেইলি ব্রিজের যন্ত্রাংশ কেনা শুরু হয়। কিন্তু মান ভাল না হওয়ায় অনেক সময় রাত্রে ব্রিজের শব্দে স্থানীয় লোকজনের ঘুম হারাম হইয়া যায়। এইসব ব্রিজের ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে যে ভিত্তি দেওয়া হয় তাহা মজবুত যাহা স্থায়ী ব্রিজে রূপান্তরের সহায়ক। সেইভাবেই পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তীতে তেমন কোন কাজ হয় না বলিলেই চলে। মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজগুলি শনাক্ত করিয়া অবিলম্বে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক।
বেইলি ব্রিজের হতদশার জন্য জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতাও দায়ী। এমপিরা ঠিকমত খোঁজ-খবর নেন বলিয়া মনে হয় না। আবার সরকারি ইঞ্জিনিয়াররাও যথাযথভাবে দেখভাল করিতেছেন না। তাহারা সরেজমিন নিয়মিত পরিদর্শনে যান না। আবার কালেভদ্রে পরিদর্শনে গেলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না বলিয়া অভিযোগ আছে। এইদিকে রাজনৈতিক সরকারের ব্যস্ততার যেন শেষ নাই। তাহারাও এইসব ভগ্নপ্রায় ব্রিজের ব্যাপারে কোন সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছেন না। অন্যদিকে, বেইলি ব্রিজগুলি তৈরি হইয়া থাকে অস্থায়ীভাবে। ক্রমান্বয়ে এইগুলি স্থায়ী ব্রিজে পরিণত করিবার বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাই সময় থাকিতেই বেইলি ব্রিজের ব্যাপারে সরকারের যথা প্রয়োজন ভূমিকা পালন করা আবশ্যক।
