আন্তর্জাতিক

বলাত্কারের শাস্তি ও ভারত প্রসঙ্গ

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৮
ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। একে কেন্দ্র করে এখন ভারতের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড় হয়েছে। রাজনীতিবিদরা গণরোষ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত এমন বক্তব্য প্রদান করছেন ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন তাতে হাসিরও খোরাক হচ্ছেন তারা। সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে চলন্ত বাসে একজন মেডিক্যাল ছাত্রী গণধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। পরে দুর্বৃত্তরা তাকে বাস হতে ফেলে দিলে তিনি মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত পান। তাকে বাঁচানোর সকল চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে গোটা ভারতে এখনও মাতম চলছে। সেই সাথে চলছে বিক্ষোভ ও গণমিছিল। ভারত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই ঘটনা ঝড় তুলেছে। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের মালালা তালেবানদের হাতে নির্যাতিত হয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বড় শিরোনাম হন। এখন তাকে নারী শিক্ষার সাহসী পথিক হিসেবে নোবেল পুরস্কারও দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তানের এই দুই ঘটনা কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে প্রায় একই সময়ে। এতে উদীয়মান অর্থনীতির এই দুই দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জানা মতে, অপরাধীরা ধরা পড়েছে। তারা ধর্ষণ বা বলাত্কারের পাশাপাশি খুনের সাথেও জড়িত। তাই প্রচলিত আইনেই তাদের বিচার চলতে পারে। এতে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রবল জনমতের চাপে সরকার নুতন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। তাতেই কি সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে? ইতোমধ্যে ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও বলাত্কার প্রতিরোধে দোষী ব্যক্তিকে খোজাকরণের পক্ষে মতামত দিয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কী আশ্চর্য মিল! এই মত তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতারও। নারীর নিরাপত্তায় তার ১৩ দফার মধ্যে এটাও অন্তর্ভুক্ত। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্দ এ সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনতে চিঠি ইস্যু করেছেন। চিঠিতে তিনি সকল রাজনৈতিক দলের মতামত চেয়েছেন। এই প্রেক্ষিতেই বিভিন্ন দল মতামত দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জেএস ভার্মার নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি সেই আইনটি পর্যালোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে মতামত দেবে। নতুন আইনে ৩০ বছর পর্যন্ত কারাবাস ও ক্ষেত্রবিশেষে দোষী ব্যক্তির যৌন সংসর্গের ক্ষমতা নষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে রাসায়নিক ওষুধ। এটা সমস্যার কোন স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান কিনা তা গভীর চিন্তার বিষয়। সৌদি আরবে শরিয়া আইন অনুযায়ী চুরির দায়ে হাতকাটাকে অনেকে অমানবিক বলে দাবি করেন। তাহলে এটাকেও কি অমানবিক বলা যাবেন? দিল্লীর ঐ কলংকিত ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে একজনের বয়স ১৮ পেরুতে কয়েক মাস বাকি। এজন্য এই ধরনের অপরাধের বেলায় বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৫ করারও দাবি ওঠেছে। তাই যদি হয়, তাহলে জাতিসংঘকে নতুন করে সাবালকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। ১৯৭৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি প্রথম ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে খোজাকরণের বিষয়টি উল্লেখ করেন। কিন্তু এ ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানীদের মতামত নেয়াও আবশ্যক নয় কি? কেননা খোজা করা হলেই যৌনবোধ দূর হয় না বা হতে পারে না। এতে মানসিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে এবং ঐ ব্যক্তির দ্বারা নারীদের আরো নির্যাতিত হবার আশংকা থেকেই যায়। প্রাকৃতিক মনোবৃত্তিকে বৈরাগ্য সাধনার মাধ্যমে দমন করতে গিয়েও ব্যর্থতার ইতিহাস আছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় একশ্রেণীর পাদ্রীর পদস্খলন নিয়ে কম হৈচৈ হচ্ছে না। আসলে ভারতে পাঠার কদর বেশি, খাসির নয়। তারপরও সেখানকার রাজনীতিকরা কেন এমন আইনের পক্ষে তা বোধগম্য নয়। বিষয়টি ভ্যাসেকটমির পর্যায়েও পড়ে না। স্পর্শকাতর এ বিষয়ে আরো গভীর চিন্তা-ভাবনা করাই শ্রেয়। লেখক : সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন