একসময় জনসংখ্যার অনুপাতে রাজধানীতে পর্যাপ্ত পার্ক ও খেলার মাঠ ছিল। সময়ের ব্যবধানে নগরীতে লোকসংখ্যা বাড়িয়াছে কয়েক গুণ। বাড়তি মানুষের জন্য নূতন পার্ক ও খেলার মাঠ সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল; কিন্তু বাস্তবে ঘটিয়াছে উল্টা। বিভিন্ন এলাকার পুরানা পার্ক ও খেলার মাঠ উধাও হইয়া গিয়াছে। ফলে নগরজীবনের দৈনন্দিন ক্লান্তি ঘুচাইতে নাগরিকদের ছায়াশীতল কোনো স্থানে নিরিবিলি সময় কাটাইবার সুযোগ অপসৃত হইয়াছে, শিশু-কিশোরদের বাড়িয়া উঠিবার অন্যতম অনুষঙ্গ খেলাধুলা করিবার স্থানও দুষপ্রাপ্য হইয়া উঠিয়াছে। এই দুই ঘাটতিতে ঢাকা পরিণত হইয়াছে ধুলা-ধোঁয়া-যটে আক্রান্ত বসবাসের অনুপযোগী এক শহরে। খবরে প্রকাশিত হইয়াছে, রাজউক এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সম্পত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত পার্কের সংখ্যা ৪৭; কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাইবে বড়জোর ১৫টির। একইভাবে ১৯টি খেলার মাঠের মধ্যে ৮টির অস্তিত্ব কোনোমতো টিকিয়া আছে। বাকিগুলি হাওয়া হইয়া গিয়াছে। তালিকায় থাকিলেও, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায়, মগবাজারে, কাওরান বাজার ইত্যাদি নানান স্থানে পার্কের কোনো অস্তিত্ব নাই। যাওবা আছে, তাহাদের মধ্যে মোহাম্মদপুর এবং গুলশান-বনানী এলাকার পার্কগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকিলেও, অন্যসব এলাকার পার্কগুলি ধীরে ধীরে বেদখল হইয়া গিয়াছে।
পার্কের জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হইয়াছে মার্কেট অথবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আবার কোথাওবা পার্ক দখল করিয়া গাড়ি কিংবা রিকশার গ্যারেজ বানানো হইয়াছে। সরকারের দিক হইতে ব্যর্থতা হইলো এইসকল পার্ককে বা খেলার মাঠকে রক্ষা করিতে না পারা। বেদখল হইয়া যাওয়া পার্ক বা মাঠকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রেও সরকারগুলি ব্যর্থ হইয়াছে। যাহারা বেআইনীভাবে মাঠ দখল করিতেছেন তাহাদেরও এই হুঁশ নাই যে, তাহাদের শিশুরা খেলাধুলা না করিয়া কি খাঁচার পাখির মতো গৃহেই অন্তরীণ থাকিয়া বড় হইবে? তাহাদের শেষ বয়সে অসুখে-বিসুখে ধরিলে ডাক্তারের আদেশ মানিতে হাঁটিবেন কোন উদ্যানে?
পুরানা পার্ক ও মাঠের ভাগ্যে যাহা ঘটিয়াছে, তাহা সকলের সামনেই ঘটিয়াছে, কেহই কিছু করেন নাই। লক্ষ্য করিবার বিষয় হইলো, ঢাকা শহর সমপ্রসারিত হইতেছে কিন্তু নূতন আবাসিক এলাকায় প্রয়োজনীয় রাস্তা-ঘাটের মতোই পার্ক ও মাঠের সুব্যবস্থা রাখা হয় নাই। জলাশয় ভরাট করিয়া নূতন প্লট তৈরি করা হইয়াছে, কিন্তু সেই প্লটে যেইসব দালান উঠিতেছে তাহাতে শ্বাস ফেলিবার ন্যূনতম স্থান রাখা হয় নাই। দালানগুলির মাঝখানে ফাঁকা জায়গা হয়তো রাজউক হইতে পাশ হওয়া কাগজপত্রে আছে, বাস্তবে নাই। অর্থাত্ আমরা এই শহরকে বাসযোগ্য রাখিবার কিংবা বাসযোগ্য করিয়া গড়িয়া তুলিবার ব্যাপারে একেবারেই সচেতন নই। নগর পরিকল্পনাবিদ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ সর্বোপরি সাধারণ নাগরিকেরা একত্রিত হইয়া শহরটিকে বাসযোগ্য করিবার উদ্যোগ লইবার পরিবর্তে সকলে মিলিয়া শহরটিকে বিনষ্ট করিতেছি। তাই সচেতন হইবার এখনই সময়, এই শহরটিকে রক্ষা করিবার উদ্যোগ লইবার এখনই সময়।
